কালীর ধূমপান! কেন বারবার ধ‍র্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে দানা বাঁধছে বিতর্ক?

'কালী’ নামক একটি তথ্যচিত্রের পোস্টার নিয়ে তুমুল বিতর্ক। চলচ্চিত্রকার লীনা মনিমেকলেই ২ জুলাই ট‍্যুইটারে এই পোস্টার শেয়ার করেন। তারপর এই নিয়ে উত্তাল হয় দেশ। কী আছে এতে?

tiasa gupta
৪ মিনিট
কালীর ধূমপান! কেন বারবার ধ‍র্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে দানা বাঁধছে বিতর্ক?

কখনও হিন্দু, কখনও মুসলিম। কখনও পয়গম্বর, কখনও মা কালী। দেশের হাওয়া বারবার গরম হচ্ছে ধর্মকে কেন্দ্র করে। কিছুদিন আগেই নুপুর শর্মার পয়গম্বর মন্তব্য নিয়ে দেশে আগুন জ্বলেছে, শিরশ্ছেদ হয়েছে এক দর্জির। সেই সময় বারবার প্রশ্ন উঠেছে, মুসলমানদের ভাবাবেগে আঘাত করা নিয়ে। এবার আবার হিন্দুদের ভাবাবেগের প্রশ্ন। মা কালীকে নিয়ে হিন্দু ভাবাবেগে আঘাত করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা লীনা মনিমেকলেই, এমনই অভিযোগ। মা কালীর মুখে সিগারেট, এমন একটি ছবি তিনি দিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। আবার এই বিতর্কে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। এফআইআর হয়েছে পরিচালকের বিরুদ্ধে।

কেন বিতর্ক

'কালী’ নামক একটি তথ্যচিত্রের পোস্টার নিয়ে তুমুল বিতর্ক। চলচ্চিত্রকার লীনা মনিমেকলেই ২ জুলাই ট‍্যুইটারে এই পোস্টার শেয়ার করেন। তারপর এই নিয়ে উত্তাল হয় দেশ। কী আছে এতে?

'কালী' ছবির পোস্টারে মা কালীর মুখে সিগারেট দেখা যাচ্ছে। পিছনে এলজিবিটিকিউ, অর্থাৎ সমপ্রেম ও রূপান্তরকামীদের আত্মাভিমানের পতাকা। ইতিমধ্যে পরিচালকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ ও উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। গো মহাসভার অজয় গৌতম আলাদা করে অভিযোগ দায়ের করেছেন। ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবিও উঠেছে।

এফআইআর-এর স্ক্রিনশট শেয়ার করে এক সংবাদ সংস্থা ট‍্যুইট করে, এফআইআর হয়েছে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, ধর্মকে অসম্মান, ধর্মীয় ভাবাবেগে ইচ্ছা করে আঘাত দেওয়া, শান্তি ভঙ্গ করার চেষ্টার অভিযোগ এনে।

লীনা মাদুরাইয়ের মেয়ে, যদিও থাকেন কানাডার টরেন্টোতে। কানাডা ফিল্ম ফেস্টেভ্যালে মুক্তি পায় তাঁর ডকুমেন্টারি `কালী’। আর সেই পোস্টার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে লীনা লিখেছিলেন, আমি উচ্ছসিত। নর্থ আমেরিকায় থাকা ভারতীয় হাই কমিশন ইতিমধ্যেই কানাডা সরকারকে অনুরোধ করেছে, যাতে টরেন্টো বেস আগা খান মিউজিয়াম থেকে পোস্টারটি সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এসবে ভীত নয় বলে জানিয়েছেন লীনা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ধূমধাম করে প্রথম সমকামী পুরুষের বিয়ে, কলকাতা সাবালক হল?

কলকাতায় সমলিঙ্গের এই বিবাহ কি নিজেকে স্বীকার করার সাহস জোগাবে সত্যিই? তথাকথিত আলোকপ্রাপ্ত শ্রেণির মধ্যে যাঁরা পড়েন না, যেখানে ভালবাসা ও যৌনতা দুইয়ের স্বাধীনতাই অলীক, সেইখানে কি পৌঁছবে অভিষেক-চৈতন্যের সাহসের আলো?

কে লীনা

লীনা হলেন মাদুরাইয়ের মহারাজাপুরমের বাসিন্দা। বাবা অধ্যাপক। অল্প বয়সে তাঁর বিয়ের পরিকল্পনা করে পরিবার। সেই সময় বাড়ি ছেড়ে চেন্নাইয়ে চলে যান তিনি। তখনই তাঁর আপসহীন চেহারা সামনে আসে। একটি তামিল ম্যাগাজিনে কাজে যোগ দেন। ওই ম্যাগাজিনের মালিক অবশ্য লীনার ঘটনা জেনে তাঁকে পরিবারের হাতে তুলে দেন। কিন্তু এরপরও তাঁর লড়াই থামে না। এবারও তিনি বিয়ে রুখে দেন। ভর্তি হন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে। এই সময় তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। পরিবারে নেমে আসে ঝড়। হাল ধরতে আইটি ফার্মে যোগ দেন লীনা। পরে সেই কাজ ছেড়ে নিজের মনের মতো কাজে যোগ দেন। শুরু হয় সিনেমা বানানো। ২০০২ সালে ছবি তৈরি করার স্বপ্ন সফল হয়। মুক্তি পায় তাঁর ছবি `মহাত্মা’।

এই তথ্যচিত্রে সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা তুলে ধরেন লীনা। ছবিটি উচ্চ-প্রশংসিত হয়। আর তাঁকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অন্ত‍্যজ শ্রেণির জন্য কাজ করায় একাধিক ফেলোশিপ পান। তাঁর ছবি বহু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়। তবে বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। কারণ তিনি লড়াইয়ের নামান্তর। ২০০৪ সালে পরবর্তী ছবি 'পারাই'। একজন দলিত মহিলার জীবন নিয়ে সেই ছবি। এই ছবি নিয়েও বিতর্ক হয়। ২০১১ সালে ধনুশকোডির জেলেদের দুর্দশা নিয়ে তাঁর প্রথম কাহিনিচিত্র `সেনগাদল’ তৈরি করেন। এই ছবির শীর্ষ চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি। সেই ছবি নিয়েও বিতর্ক হয়। কেন্দ্রীয় সেন্সর বোর্ড আপত্তি তোলে। পরে অবশ্য মুক্তি পায় ছবিটি। এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়।

তাহলে একথা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে, বিতর্ককে তিনি বারবার চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। `কালী’ ছবি নিয়েও লড়াকু মেজাজের পরিচালক নির্ভয়ে প্রতিক্রিয়া দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন, মৃত্যুকেও তিনি ভয় পান না। তাঁর কথায়, "আমার হারাবার কিছু নেই। আমি নির্ভয়ে কণ্ঠ ছাড়তে ভয় পাই না। যদি জীবন দিতে হয়, তখনও ভয় পাব না।‘’

মহুয়ার যুক্তি

মা কালীর পোস্টার বিতর্ক নিয়ে একাধিকবার মুখ খুললেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। পরিচালকের পক্ষেই ব্যাটন ধরেন মহুয়া। বলেন, "আমার কাছে মা কালী আমিষ ভক্ষণকারী এবং সুরাপানকারী এক দেবী। কে কীভাবে তাঁর আরাধ্য দেবতার ছবি আঁকবেন, এটা একেবারে তাঁর নিজস্ব বিষয়। ভারতের এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে দেবীকে হুইস্কি অর্পণ করে পুজো দেওয়া হয়। কিন্তু বেশ কিছু জায়গায় ওই রীতিকে ধর্মীয় অনুশাসন-বিরোধী বলে মনে করা হয়।‘’

তাঁর মন্তব্য নিয়ে জলঘোলা হওয়ার পর আবার নিজের মন্তব্যের পক্ষে সাফাই দেন সাংসদ। বলেন, তিনি কখনও কোনও পোস্টার সমর্থন করেননি বা ধূমপান শব্দকেও সমর্থন করেননি। তিনি শুধু বলেছেন, তারাপীঠে মা কালীর মন্দিরে যান, দেখুন কীভাবে দেবীকে ভোগ এবং পানীয়র মাধ্যমে পুজো উৎসর্গ করা হয়।

বারবার কেন ধর্ম

বিতর্কের কেন্দ্রে যখন ধর্ম, তাতে যে অনেক রংচং চড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

পয়গম্বর নিয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগ দেখেছে দেশ। এমনকী, এই মন্তব্য সমর্থন করে এক দর্জির শিরশ্ছেদের মতো পাশবিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছে দেশ। এবার ধর্ম পাল্টেছে। পাল্টায়নি বিতর্কের চরিত্র। প্রশ্ন হল, বারবার ধর্মই কেন? ধর্ম নিয়ে দেশ উত্তেজনায় ফুটলে যে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্বের মতো আরও অনেক জ্বলন্ত বিষয় থেকে দেশবাসীকে ভুলিয়ে রাখা যায়, এ আর কী এমন আশ্চর্যের! ফলে এর পিছনে অন্য কোনও অভিসন্ধি কাজ করছে না তো? এই নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ধর্মের অন্ধকূপে মুখ লুকোচ্ছে না তো এই সমাজ?

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।