লক্ষ্য ইন্ডিয়া জোটের পুনরুজ্জীবন, কী ভাবে ঘুঁটি সাজাচ্ছেন মমতা
Mamata Banerjee: বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরতে চাইছেন? বসিরহাট থেকে লোকসভায় লড়াবেন তিনি? ইন্ডিয়া জোটকে সক্রিয় করতে তাঁর নতুন কৌশল কী?
বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চাইছেন। দলীয় সূত্রের দাবি, এবার তাঁর লক্ষ্য শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নয়, জাতীয় স্তরে বিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠা। সেই কারণেই বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR), ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নকে সামনে রেখে ইন্ডিয়া জোটকে আরও সক্রিয় করতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস।
১৪ মে কালীঘাটে তৃণমূলের লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মহুয়া মৈত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ দলের শীর্ষ সাংসদরা। সেখানে আগামী সংসদ অধিবেশনে দলের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। ভোট প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগকে শুধু আদালতে নয়, সংসদের ভেতরেও জোরালোভাবে তুলতে চাইছেন তাঁরা।
দলের নেতাদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে যা ঘটেছে, তা শুধু রাজ্যের বিষয় নয়। বিরোধী দলগুলির অনেকেরই অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধন, বুথ পরিচালনা এবং ইভিএমের তথ্য নিয়ে নানা অসঙ্গতি দেখা গিয়েছে। তৃণমূল এই বিষয়গুলিকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। মমতার পাশে আছেন রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদব-সহ ইন্ডিয়া জোটের অন্যান্য নেতারাও।
এদিকে ১৪ মে কলকাতা হাই কোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। আইনজীবীর পোশাকে আদালতে হাজির হওয়ার পর বেরোনোর সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ‘চোর’ স্লোগান ওঠে। মমতা সাংবাদিকদের বলেন, তাঁকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপমান। দলের সাংসদরা মনে করছেন, এই ঘটনাকে গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের উপর আঘাত হিসেবে তুলে ধরা উচিত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০২১ সালে যেখানে বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন এবং তৃণমূল ২১৫। ২০২৬-এ দেখা যাচ্ছে বিজেপি জয়লাভ করেছে ২০৭ আসনে এবং তৃণমূল ধরে রাখতে পেরেছে মাত্র ৮০টি আসন।
দলের নেতাদের মতে, এই ঘটনাকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে না দেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাই সংসদে বিষয়টি জোরালোভাবে তোলা হবে। তৃণমূলের মতে, যদি দেশের অন্যতম প্রবীণ রাজনৈতিক নেত্রী আদালত চত্বরে এভাবে হেনস্তার শিকার হন, তবে সাধারণ বিরোধী কর্মীদের পরিস্থিতি কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ফের লোকসভায় দলের চিফ হুইপ করা হয়েছে। সংসদে তৃণমূলের অবস্থান আরও আক্রমণাত্মক করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে। বর্তমানে তিনি কোনো সাংবিধানিক পদে নেই। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ফলে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছে, এবং তিনি এখন শুধু দলের সর্বোচ্চ নেতা। তৃণমূলের একাংশ মনে করছে, জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে হলে তাঁকে সরাসরি সংসদে নিয়ে আসা দরকার।
সেই কারণেই সূত্রের দাবি, তাঁকে বসিরহাট আসন থেকে লোকসভা নির্বাচনে লড়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বসিরহাট সীমান্তবর্তী এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই আসন থেকে জয়ী হলে মমতা শুধু সংসদে প্রবেশ করবেন না, বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবেও নতুন করে আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন।
দলের একাংশের মতে, সংসদে মমতার উপস্থিতি তৃণমূলের রাজনৈতিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। লোকসভায় তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা এখনও উল্লেখযোগ্য। সেই শক্তিকে ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আরও ধারালো অবস্থান নেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি, ইন্ডিয়া জোটের অভ্যন্তরেও মমতার গুরুত্ব বাড়বে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, চারবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং তিনবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা বিরোধী রাজনীতিতে বড় সম্পদ। তৃণমূল সেই অভিজ্ঞতাকে এখন জাতীয় স্তরে কাজে লাগাতে চাইছে।
এখনও বসিরহাট থেকে তাঁর প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। তবে কালীঘাটের এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজয়ের পর রাজনৈতিকভাবে পিছু হটছেন না। তিনি আবারও নতুন করে রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।






