জেলায় জেলায় বিপর্যয়, ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি তৃণমূল?
২০২১ সালে যেখানে বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন এবং তৃণমূল ২১৫। ২০২৬-এ দেখা যাচ্ছে বিজেপি জয়লাভ করেছে ২০৭ আসনে এবং তৃণমূল ধরে রাখতে পেরেছে মাত্র ৮০টি আসন।
২০২১ সালে যে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করছিল তৃণমূল, ২০২৬-এ সেই রাজনীতির ছবিই আমূল বদলে গেল। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ভোটের ফল শুধু পাল্টায়নি, বদলে গিয়েছে জেলার পর জেলা, অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণও। কার্যত, জেলায় জেলায় বিপর্যয়, ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি তৃণমূল?
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২০০-র বেশি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। বিপরীতে ভারতীয় জনতা পার্টি প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এলেও সরকার গঠনের থেকে অনেক দূরে ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই ফলাফল কার্যত উল্টে গেছে, বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতার দোরগোড়ায়, আর তৃণমূল ঠিক বিজেপির অবস্থানে দাঁড়িয়ে। ২০২১ সালে যেখানে বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন এবং তৃণমূল ২১৫। ২০২৬-এ দেখা যাচ্ছে বিজেপি জয়লাভ করেছে ২০৭ আসনে এবং তৃণমূল ধরে রাখতে পেরেছে মাত্র ৮০টি আসন।

এই বদলের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র দেখা যায় অঞ্চল ও জেলাভিত্তিকবিশ্লেষণে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mamata Banerjee: সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের নেত্রী থেকে বাংলার ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ১৫ বছর পর কেন ভেঙে গেল সেই আস্থা? দুর্নীতি, চাকরি কেলেঙ্কারি, কর্মসংস্থানের অভাব, নারী নিরাপত্তা, জঙ্গলমহলের ধস—কোন কোন ইস্যু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করল তৃণমূলের?
উত্তরবঙ্গে ২০২১-এই বিজেপি নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছিল। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার কিংবা দার্জিলিং— এই জেলাগুলিতে তাদের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। ২০২৬-এ সেই শক্তি আরও মজবুত হয়েছে। এই অঞ্চল কার্যত বিজেপির নির্ভরযোগ্য ভোটব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে জঙ্গলমহল— পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম পশ্চিম মেদিনীপুর এই বেল্টেও ২০২১-এ বিজেপির উত্থান দেখা গিয়েছিল। তবে ২০২৬-এ সেই উত্থান পূর্ণ দখলে রূপ নিয়েছে। তৃণমূল এখানে প্রায় অস্তিত্ব সংকটে। জঙ্গলমহলের রাজনৈতিক ছবিতে পাঁচ বছরে চোখে পড়ার মতো বদল এসেছে। ২০২১ সালে ঝাড়গ্রামের চারটি আসনই ছিল তৃণমূলের দখলে, বিজেপির কোনও উপস্থিতিই ছিল না। কিন্তু ২০২৬-এ সেই ছবি পুরো উল্টে গিয়ে চারটির চারটিই বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে।
পশ্চিম মেদিনীপুরেও একই প্রবণতা। ২০২১ সালে ১৫টির মধ্যে ১৩টি আসন তৃণমূল জিতেছিল, বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ২টি। অথচ ২০২৬-এ এসে তৃণমূল সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ আসনে, আর বিজেপি বেড়ে ১৩টি আসন দখল করেছে।
পুরুলিয়ায় ২০২১ সালে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও তৃণমূলের উপস্থিতি ছিল—৩টি আসন তাদের দখলে ছিল, বিজেপি পেয়েছিল ৬টি। কিন্তু ২০২৬-এ এসে পুরুলিয়ার সবকটি ৯টি আসনই বিজেপির দখলে চলে গিয়েছে, তৃণমূল শূন্য।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
BJP Government in West Bengal: ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে বিজেপি এল বাংলার ক্ষমতায়। এই পরিবর্তনে কি সত্যিই দুর্নীতি, বেকারত্ব, কাটমানির রাজনীতি শেষ হবে? নাকি শুধু শাসকের মুখ বদলাবে, মানুষের ভাগ্য নয়?
বাঁকুড়াতেও একই রকম চিত্র। ২০২১ সালে ১২টির মধ্যে ৮টি আসন বিজেপি এবং ৪টি তৃণমূল পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এ বিজেপি সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ১১-তে নিয়ে গেছে, তৃণমূল নেমে এসেছে মাত্র ১ আসনে।
এমনকী, শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত বর্ধমান অঞ্চলেও একই প্রবণতা। ২০২১-এ তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও, ২০২৬-এ বিজেপি এখানে বড় সংখ্যায় আসন দখল করেছে। পূর্ব বর্ধমানে ২০২১ সালে ১৬টির সবকটি আসনই তৃণমূলের দখলে ছিল, বিজেপির কোনও উপস্থিতি ছিল না। কিন্তু ২০২৬-এ সেই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। তৃণমূল নেমে আসে মাত্র ২টি আসনে, আর বিজেপি ১৪টি আসন দখল করে নেয়।
পশ্চিম বর্ধমানেও একই প্রবণতা। ২০২১ সালে ৯টির মধ্যে ৬টি আসন তৃণমূল এবং ৩টি বিজেপির দখলে ছিল। কিন্তু ২০২৬-এ এসে তৃণমূল সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায়, সবকটি ৯টি আসনই বিজেপির ঝুলিতে যায়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে দক্ষিণবঙ্গ ও শহরাঞ্চলে। ২০২১ সালে হাওড়া, হুগলি, কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলি তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি ছিল। কিন্তু ২০২৬-এ এই অঞ্চলে বিজেপির বড় অগ্রগতি হয়েছে। শিল্পাঞ্চল ও শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটের একটি বড় অংশ পদ্ম শিবিরে গিয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন বাংলার মানুষের প্রিয় ‘দিদি’র দল আজ মানুষের মন থেকে দূরে সরে গেল? কেন মা-মাটি-মানুষের শ্লোগান আর আগের মতো কাজ করল না? এর পিছনে রয়েছে মূলত ১১টি কারণ।
প্রেসিডেন্সি ডিভিশন অর্থাৎ কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূলের একচেটিয়া দাপট ছিল। কিন্তু এবারে সেখানে উল্লেখযোগ্য ভাঙন দেখা গিয়েছে। বিজেপি একাধিক আসনে জয় পেয়েছে, যা তৃণমূলের দুর্গের অন্যতম ভিত ছিল।
রাজ্যের রাজধানী কলকাতাতে তৃণমূলের একতরফা আধিপত্যে ভাঙন দেখা গিয়েছে। ২০২১ সালে ১১টির সবকটি আসনই তৃণমূল জিতেছিল। কিন্তু ২০২৬-এ এসে তৃণমূল ৫টিতে নেমে এসেছে, আর বিজেপি ৬টি আসন জিতে শহরে নিজেদের বিস্তারের জানান দিচ্ছে।
উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা— এই দুই গুরুত্বপূর্ণ জেলাতেও ২০২১ থেকে ২০২৬-এর মধ্যে বড়সড় ভোলবদল দেখা গিয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনায় ২০২১ সালে ৩৩টির মধ্যে ২৮টি আসন ছিল তৃণমূলের দখলে, বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৫টি। কিন্তু ২০২৬-এ এসে চিত্র অনেকটাই বদলে যায়। তৃণমূল নেমে আসে ১১টি আসনে, আর বিজেপি বেড়ে ২২টি আসন দখল করে নেয়।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ২০২১ সালে তৃণমূলের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল— ৩১টির মধ্যে ৩০টি আসন তাদের দখলে ছিল, আর ১টি আসন পায় আইএসএফ। বিজেপির কোনও উপস্থিতি ছিল না। তবে ২০২৬-এ সেই ছবিতে পরিবর্তন আসে। তৃণমূল ২০টি আসনে সীমাবদ্ধ থাকে, বিজেপি উঠে আসে ১০টি আসনে, আর আইএসএফ তাদের ১টি আসন ধরে রাখে। এই দুই জেলার ফলাফলই দেখাচ্ছে, একসময় তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত এলাকাগুলিতেও এবার উল্লেখযোগ্য ভাঙন ঘটেছে।
মুর্শিদাবাদ ও মালদার মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলিতেও চিত্র বদলেছে। ২০২১ সালে যেখানে তৃণমূল প্রায় একাই প্রভাবশালী ছিল, ২০২৬-এ সেখানে কংগ্রেস, আইএসএফ, আঞ্চলিক দলগুলির প্রবেশে ভোট ভাগ হয়েছে। তার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ফলাফলে। মালদহের ১২টি আসনের ৬টি তৃণমূল ৬টি বিজেপি জিতেছে। অন্যদিকে মুর্শিদাবাদে মোট ২২ আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছে ৯টি আসনে, বিজেপি পেয়েছে ৮টি আসন। বামফ্রন্ট জোটের সিপিআই(এম) পেয়েছে ১টি আসন (ডোমকল) এবং কংগ্রেসের ঝুলিতে গেছে দুটি আসন, যথাক্রমে ফারাক্কা ও রানিনগর। এছাড়া রেজিনগর ও নওদা দুটি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেছেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ— প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা হাওয়া, তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, আদর্শিক অবস্থানের অস্পষ্টতা, নরম হিন্দুত্ব বনাম চরম হিন্দুত্বের রাজনীতি ইত্যাদি। ২০২৬-এর ফলাফল তাই শুধু ক্ষমতার বদল নয়, বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত; যার প্রভাব আগামী দিনেও রাজ্যের রাজনীতিতে স্পষ্টভাবে পড়বে।






