বঙ্গেও ধর্মীয় পর্যটনে জোর: শাক্ত-ভক্ত দু'দিকেই নজর
Religious Tourism Bengal: উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা-কাশী মডেলের পথেই কি হাঁটছে পশ্চিমবঙ্গ? শক্তিপীঠ সার্কিট, চৈতন্য মহাপ্রভু তীর্থযাত্রা প্রকল্প এবং মায়াপুরে ১,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ কি বাংলাকে ধর্মীয় পর্যটনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা?
পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বার্তা এসেছে পর্যটন খাত থেকে। শুধু পর্যটন নয়, আরও নির্দিষ্ট করে বললে ধর্মীয় পর্যটনকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে বাজেটে। উত্তরপ্রদেশে গত এক দশকে অযোধ্যা, কাশী ও মথুরাকে কেন্দ্র করে যে ধরনের ধর্মীয় পর্যটনের মডেল তৈরি হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গেও তারই একটি সংস্করণ গড়ে তোলার রূপরেখা দেখা যাচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বাজেট বক্তৃতায় ঘোষণা করেছেন ‘বেঙ্গল শক্তিপীঠ সার্কিট’ এবং ‘চৈতন্য মহাপ্রভু তীর্থযাত্রা সার্কিট’-এর। আগামী তিন বছরে এই প্রকল্পগুলির জন্য এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি মায়াপুরকে আন্তর্জাতিক মানের তীর্থ ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট ধারণা—বিক্ষিপ্ত ধর্মীয় স্থানগুলিকে একটি সুসংহত পর্যটন নেটওয়ার্কে যুক্ত করা। অর্থাৎ শুধু একটি মন্দির বা তীর্থস্থানকে উন্নত করা নয়, বরং একাধিক ধর্মীয় কেন্দ্রকে একটি নির্দিষ্ট যাত্রাপথের মধ্যে আনা হবে। সরকার যাকে বলছে ‘ক্লাস্টার্ড হাব অ্যান্ড স্পোক মডেল’। এর অর্থ, একটি প্রধান শহর বা কেন্দ্রকে ঘিরে আশপাশের একাধিক তীর্থস্থানকে যুক্ত করা হবে, যাতে পর্যটক এক সফরে বহু জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ISKCON Mid Day Meal: কলকাতার স্কুলে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব ইসকনকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কি শুধুই প্রশাসনিক পরিবর্তন, নাকি এর পিছনে রয়েছে খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতি বদলের বৃহত্তর পরিকল্পনা? শিশুদের পুষ্টি, টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং মিড-ডে মিল কর্মীদের কর্মসংস্থান নিয়ে কেন উঠছে এত প্রশ্ন?
শক্তিপীঠ সার্কিটের ক্ষেত্রে এই পরিকল্পনার কেন্দ্র কলকাতা। কালীঘাটকে মূল কেন্দ্র ধরে বীরভূমের ভ্রামরী দেবী, নন্দীকেশ্বরী, তারাপীঠ, বক্রেশ্বর, ফুল্লরা ও কঙ্কালীতলার মতো গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠকে একটি পর্যটন রুটে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই মন্দিরগুলিতে ভক্তদের ভিড় থাকে, কিন্তু পর্যটন পরিকাঠামো, যোগাযোগ, আবাসন এবং সমন্বিত প্রচারের অভাব ছিল। নতুন পরিকল্পনা সেই অভাব পূরণের চেষ্টা করবে।
একইভাবে চৈতন্য মহাপ্রভু তীর্থযাত্রা সার্কিটের কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে নদিয়ার মায়াপুর। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকনের কারণে মায়াপুর এমনিতেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত। প্রতিবছর হাজার হাজার বিদেশি ভক্ত সেখানে আসেন। সরকার এখন সেই আকর্ষণকে আরও বড় পর্যটন অর্থনীতিতে রূপ দিতে চাইছে। শুধু মায়াপুর নয়, শ্রীচৈতন্যের জীবনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্থানকে একত্রে একটি ধর্মীয় পর্যটন করিডরে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এখানেই উত্তরপ্রদেশের মডেলের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা। যোগী আদিত্যনাথ সরকারের আমলে অযোধ্যা, কাশী ও মথুরাকে বৃহৎ পর্যটন ও বিনিয়োগ প্রকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। বিমানবন্দর, রাস্তা, হোটেল, নদীঘাট, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব কিছু মিলিয়ে ধর্মীয় পর্যটনকে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক প্রকল্পে পরিণত করা হয়েছে। বিজেপির যুক্তি, ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে পর্যটক এলে স্থানীয় ব্যবসা, হোটেল, পরিবহণ, হস্তশিল্প এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগেরও উন্নতি হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Budget 2026: পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’, বেকার ভাতা ও কৃষি সংস্কারের পাশাপাশি বিনিয়োগ টানার উদ্যোগও রয়েছে। তবে বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা, আর্থিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পশ্চিমবঙ্গের বাজেটেও সেই একই অর্থনৈতিক যুক্তি দেখা যাচ্ছে। কারণ ধর্মীয় সার্কিটের পাশাপাশি পর্যটনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ব্যাপক বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। দার্জিলিংয়ে হেরিটেজ ট্যুরিজম হাব, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম সম্প্রসারণ, সুন্দরবনের জন্য পৃথক মাস্টার প্ল্যান, ডুয়ার্সে ইকো-ট্যুরিজম এবং পুরুলিয়া-ঝাড়গ্রাম অঞ্চলে নতুন পর্যটন পরিকাঠামোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ঝাড়গ্রামে ১৬০ একর জমিতে টাইগার সাফারির পরিকল্পনাও তার অংশ।
জোড়াসাঁকোর মতো ঐতিহ্যবাহী স্থানের পুনরুদ্ধারের জন্য হেরিটেজ কমিশন পুনর্গঠনের কথাও বলা হয়েছে। দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্র্যান্ড হিসেবে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। গঙ্গাসাগর মেলা, বারুণী মেলা এবং রাস উৎসবের মতো অনুষ্ঠানকে জাতীয় স্তরে প্রচারের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে এসেছে বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি বড় অংশ হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, কিন্তু সেই দিকটি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। শক্তিপীঠ, চৈতন্য, গঙ্গাসাগর বা দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে নতুন পর্যটন প্রকল্পগুলি সেই রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অবশ্য এই পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের উপর। উত্তরপ্রদেশে ধর্মীয় পর্যটনের সাফল্যের পিছনে কয়েক হাজার কোটি টাকার পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ ছিল। পশ্চিমবঙ্গে ঘোষিত এক হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। এছাড়া রাস্তা, পরিবহণ, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, আবাসন এবং ডিজিটাল পরিষেবার উন্নয়ন না হলে শুধুমাত্র সার্কিট ঘোষণা করে পর্যটক টানা কঠিন।
তবু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে এই বাজেট একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। নতুন সরকার পর্যটনকে শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে না; বরং ধর্মীয় ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং আঞ্চলিক পরিচয়কে একসূত্রে বেঁধে একটি বৃহত্তর উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলতে চাইছে। সেই অর্থে ‘বেঙ্গল শক্তিপীঠ সার্কিট’ এবং ‘চৈতন্য মহাপ্রভু তীর্থযাত্রা সার্কিট’ কেবল পর্যটন প্রকল্প নয়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক রূপরেখারও একটি অংশ।







