রাজ্য বাজেট ২০২৬: দৃষ্টিভঙ্গির বদল নাকি এক ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনৈতিক পরীক্ষা?
West Bengal Budget 2026: পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’, বেকার ভাতা ও কৃষি সংস্কারের পাশাপাশি বিনিয়োগ টানার উদ্যোগও রয়েছে। তবে বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা, আর্থিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
২২ জুন পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বিধানসভায় যে প্রথম বাজেট পেশ করলেন, তা রাজ্যের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ধারায় একটা বদল আনার চেষ্টা। ৪.৩৯ লক্ষ কোটি টাকার এই বাজেটে একদিকে যেমন সামাজিক কল্যাণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই জোর দেওয়া হয়েছে পরিকাঠামো ও শিল্পায়নে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি রাজ্যের অর্থনীতিতে এক ধরনের 'কাঠামোগত বদল’। বিগত দেড় দশক ধরে রাজ্যে মূলত ‘ভাতা ও অনুদান-নির্ভর’ এক অর্থনীতি চলছিল, যেখানে মানুষের হাতে সরাসরি টাকা পৌঁছে দিয়ে বাজারের চাহিদা ধরে রাখার চেষ্টা হতো। এবারের বাজেট সেই সামাজিক সুরক্ষাকে বজায় রেখেই রাজ্যকে ‘উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ-ভিত্তিক’ অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
আর এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হিসেবে অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর সুবিধার প্রসঙ্গ। তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি রাজ্যের আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে কিছু তীব্র আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। আশা ও আশঙ্কার এই দড়ি-টানাটানিই বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটের মূল ভিত্তি, যা রাজ্যের ১০ কোটিরও বেশি মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা ও সামাজিক সুরক্ষা
একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রাজ্য সরকারকে প্রতি বছর বাজেটের মধ্য দিয়ে জনগণের মুখোমুখি হতে হয়। সাধারণ মানুষ জটিল অর্থনৈতিক সূচক দেখে বাজেট বিচার করেন না; তাঁরা খোঁজেন তাঁদের নিজস্ব খাতের জন্য কী দেওয়া হলো। রাজ্যে নতুন সরকারের এটি প্রথম বাজেট, স্বাভাবিকভাবেই এখানে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের এক তীব্র বাধ্যবাধকতা ছিল।
বাজেটেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা প্রকট; ফলে শিল্প ও কৃষির উপর জোর দিলেও নতুন সরকার সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করেনি, বরং ভাতার রাজনীতিতে চমক দিয়েছে। এই লক্ষ্যেই পূর্বতন সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পকে বদলে চালু করা হয়েছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। এর অধীনে যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে সরাসরি ৩,০০০ টাকা দেওয়া হবে, যা সমগ্র ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ ডাইরেক্ট ক্যাশ ট্রান্সফার (ডিবিটি)। এই একটি খাতেই সরকার রেকর্ড ৩৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।
অন্যান্য ঘোষণা:
• ভরসা কর্মসাথী: চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত বেকার যুবকদের পাশে দাঁড়াতে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা বেকার ভাতার সংস্থান রাখা হয়েছে।
• ছাত্রী স্কলারশিপ ও পিঙ্ক কার্ড: ছাত্রীদের জন্য ৫০,০০০ টাকার স্কলারশিপ এবং মহিলাদের নিখরচায় বাস পরিষেবার (Pink Card) জন্য সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
• ডিএ ঘোষণা: রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমনে এক ধাক্কায় অতিরিক্ত ২০% মহার্ঘ ভাতা (DA) ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রযুক্তি-নির্ভর কৃষি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Budget 2026-27: দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে নবগঠিত ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন প্রথম 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত বাজেট পেশ করেছেন। কিন্তু এই দেড় দশকের শাসক তৃণমূল সরকারের পূর্বতন ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেটের সঙ্গে রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটের পার্থক্য ঠিক কী কী?
সামাজিক সুরক্ষার এই বিপুল খরচের জোগান দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে প্রয়োজন এক মজবুত ও উৎপাদনশীল অর্থনীতি। সে কারণেই পশ্চিমবঙ্গের মতো কৃষিনির্ভর রাজ্যের জন্য এই বাজেটে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং চাষের ঝুঁকি কমানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। তাই বেছে নেওয়া হয়েছে কৃষির ডিজিটালাইজেশনকে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের (খরা বা বন্যা) হাত থেকে কৃষকদের বাঁচাতে ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা’ (PMFBY) এবার পুরোদমে কার্যকর করা হচ্ছে। এখানে উপগ্রহ চিত্রের (Satellite Imaging) সাহায্যে ফসলের ক্ষতি নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্ষতিপূরণের টাকা সরাসরি কৃষকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়া হবে। এখন থেকে রাজ্যের কৃষকরা একই সঙ্গে কেন্দ্রের ‘PM-KISAN’ এবং রাজ্যের নিজস্ব আর্থিক সহায়তা দুটোই পাবেন।
অর্থ দফতরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, বিগত সরকার এই ধরনের কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি রাজ্যে চালু না করে নিজেদের তহবিল থেকে নিজস্ব প্রকল্প চালাত। এখন বর্তমান সরকার পিএম-কিষাণের পাশাপাশি পিএমএওয়াই-জি (প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-গ্রামীণ) এবং গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পের মতো সব কেন্দ্রীয় স্কিমের টাকা সরাসরি এবং দ্রুত পেয়ে যাবে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ টাকার জোগান বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
কৃষি ক্ষেত্রের বাইরেও গ্রামীণ ও ও আধা-শহুরে স্তরে ব্যাপক কাজের সুযোগ তৈরি করতে MSME, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে চাঙ্গা করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে:
• ODOP নীতি: প্রতিটি জেলার ঐতিহ্যবাহী ও নিজস্ব কোনো একটি বিশেষ পণ্যকে চিহ্নিত করে সেটির আধুনিক ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং এবং ই-কমার্সের সুযোগ বাড়াতে ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট’ (ODOP) নীতি নেওয়া হয়েছে।
• VB-G RAM G মিশন: গত ৫ বছর ধরে রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ বন্ধ থাকায় যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, তা কাটাতে কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাত মিটিয়ে বাজেটে আত্মপ্রকাশ করেছে নতুন বিকল্প প্রকল্প ‘Viksit Bharat–Guarantee for Rozgar and Ajeevika Mission Gramin’। এই প্রকল্পে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের জন্য এককালীন ১৪,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা শ্রমিকদের বছরে ১০০ দিনের বদলে ১২৫ দিন কাজ পাওয়ার আইনি নিশ্চয়তা দেবে।
• মহিলা সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থান: চলতি অর্থবর্ষেই বিভিন্ন দফতরের শূন্য পদে ১ লক্ষ সরকারি চাকরি দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে একা রাজ্য পুলিশ বাহিনীতেই নিয়োগ করা হবে ২০,০০০ কর্মী। সবচেয়ে বড় সামাজিক সংস্কার হিসেবে এই সমস্ত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৩৩% আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
মূলধনী খরচ ও প্রশাসনিক সংস্কার
এই সমস্ত কর্মসংস্থান ও সামাজিক অনুদানকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে গতি আনতে স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি—এই বাজেটে মূলধনী খরচে জোর দেওয়া হয়েছে। এখানেই বিগত সরকারের সঙ্গে নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে গ্রহণ করা হয়েছে একাধিক প্রকল্প। কল্যাণীতে একটি নতুন গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির জন্য ১,০০০ থেকে ১,৫০০ একর জমি বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি, পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর (Deep Sea Port) নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটকে যুক্ত করবে।
সরকারি এই পরিকাঠামোর হাত ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ টানার জন্য ৫,০০০ কোটি টাকার এক বিশেষ ইনসেনটিভ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। বিনিয়োগ টানতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সরকার ১৯৭৬ সালের ‘আর্বান ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্ট’ (ULCRA) পুনর্বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এর ফলে, আইনি জটে আটকে থাকা রাজ্যের বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত জমি মুক্ত করে নতুন শিল্পের কাজে লাগানো সহজ হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Budget 2026: অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাজ্যের আগের সমস্ত সামাজিক প্রকল্পগুলি অব্যাহত বা চালু থাকবে, তবে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া এবং দুর্বল শ্রেণি যাতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায়, এই বাজেটে সেদিকেই বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ‘সিন্ডিকেট রাজ’ এবং লাইসেন্স সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে ঘোষণা করা হয়েছে, এখন থেকে ১০০ কোটি টাকার উপর যেকোনো বিনিয়োগে স্থানীয় স্তরে আর কোনো আলাদা অনুমতির প্রয়োজনই হবে না; বিনিয়োগকারীরা সরাসরি ‘সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স’ পাবেন।
এছাড়া শিল্পায়নে বাড়তি গতি জোগাতে বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ নীতি চালু করা হয়েছে, যার ফলে শিল্প সংস্থাগুলি মুক্ত বাজার থেকে সস্তায় বিদ্যুৎ কিনতে পারবে।
বাজেটে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)-কে পুনরুজ্জীবিত করার, যাতে বিনিয়োগকারীরা এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে সরাসরি বাজার থেকে বড় অঙ্কের পুঁজি সংগ্রহ করতে পারেন।
কেন্দ্রের ফান্ড বনাম আর্থিক সূচক
তবে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চমক, সমষ্টিগত অর্থনীতির (Macro Economics) প্রধান তিনটি আর্থিক সূচক (Fiscal Ratios) একযোগে কমতির দিকে। রাজ্য সরকারের দাবি অনুযায়ী, বহু বছরের মধ্যে এই প্রথম তাদের হাত ধরে এটা সম্ভব হলো:
• রাজস্ব ঘাটতি (Revenue Deficit) হ্রাস: গত বছর যেখানে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪১,১৬৪ কোটি টাকা (GSDP-র ২.০৭%), এবার তা প্রায় ১৯,০০০ কোটি টাকা কমিয়ে ২১,৯৮৪ কোটি টাকায় (GSDP-র ১.০২%) আনার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।
• রাজকোষ ঘাটতি (Fiscal Deficit) নিয়ন্ত্রণ: রাজ্যের সামগ্রিক রাজকোষ ঘাটতি GSDP-র ৩.৪০% থেকে কমিয়ে ২.৯১%-এ নামিয়ে আনা হচ্ছে, যা এফআরবিএম অ্যাক্টের ৩% সীমার অনেকটাই নিচে।
• ঋণের অনুপাত (Debt-to-GSDP) কমানো: বহু বছর পর রাজ্যের মোট ঋণ ও জিএসডিপি-র অনুপাত সামান্য হলেও কমেছে। এটি ৩৮.২৯% থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৯৮%-এ।
এই ঘাটতি হ্রাসের আসল উৎস, কেন্দ্রীয় অনুদানের ব্যাপক বৃদ্ধি। মূলত রাজ্যে 'ডাবল ইঞ্জিন সরকার' আসার ফলে দিল্লি থেকে রাজ্যে কেন্দ্রীয় তহবিলের জোগানে এক নজিরবিহীন গতি এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের সংশোধিত হিসাবে যেখানে কেন্দ্রীয় অনুদানের (Grants-in-aid) পরিমাণ ছিল মাত্র ২২,০৬৮.৮৫ কোটি টাকা, বর্তমান বাজেটে তা এক ধাক্কায় প্রায় ৪৯,৩২৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৭১,৩৯৩.১৯ কোটি টাকা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সরকারের দাবি, কেন্দ্র থেকে নিয়মিত টাকা আসা এবং রাজ্যের খরচাপাতি কাটছাঁট করে সঠিক জায়গায় ব্যবহারের ফলে এই ঘাটতি কমানোর হিসাবটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তাহলে কি এখন খাদের কিনারে অর্থনীতি?
উন্নয়নের এই খতিয়ানের ঠিক উল্টো পিঠেই লুকিয়ে আছে এক বড় আর্থিক সংকটের আশঙ্কা। অর্থমন্ত্রীর পেশ করা এই বাজেটের সুন্দর সুন্দর ভাবনার পাশাপাশি রাজ্যের অর্থনীতিতে এমন কিছু দুর্বলতা রয়ে গিয়েছে, যা আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক ভারসাম্যকে বিপন্ন করে তুলতে পারে:
• ‘ফিসকাল ট্র্যাপ’ বা ঋণের ফাঁদ: নতুন সরকার আগের সরকারের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ৮,১৫,৮৯১ কোটি টাকার বিশাল ‘লেগেসি ডেট’ বা দেনা পেয়েছে। এই ঋণের জন্য বার্ষিক প্রায় ৪৯,০০০ কোটি টাকা সুদ দিতেই চলে যায়। এর উপর বর্তমান অর্থবর্ষে সরকার বাজার থেকে আরও ৮০,৪৪৪.৫৫ কোটি টাকা নতুন ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব রেখেছে, যা রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণকে প্রায় ৯ লক্ষ কোটি টাকার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে। কেন্দ্রের কাছে আটকে থাকা বকেয়া বাবদ যে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা নতুন রাজ্য সরকার আদায় করেছে, তা কেবল এই বছরের জন্যই এককালীন আর্থিক স্বস্তি। কিন্তু ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ বা বেকার ভাতার মতো সামাজিক প্রকল্পগুলির স্থায়ী খরচ রাজ্যকে প্রতি বছরই নিয়ম করে টানতে হবে। আগামী বছরগুলিতে এই এককালীন কেন্দ্রীয় সাহায্য ফুরিয়ে গেলে এই বিপুল খরচ মেটাতে রাজ্যকে আরও ভয়ঙ্কর ঋণের জালে জড়াতে হবে।
• পরিবেশ ও খাদ্য সুরক্ষার ঝুঁকি: শিল্পের জন্য জমি পাওয়ার নিয়ম সহজ করা (ULCRA বদল) এবং ১০০ কোটি টাকার উপর বিনিয়োগে স্থানীয় স্তরের প্রশাসনিক ছাড়পত্রের কড়াকড়ি তুলে দেওয়ার একটি মারাত্মক নেতিবাচক দিক রয়েছে। এর ফলে কারখানার জন্য পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব যাচাই কিংবা স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়ার মতো আইনি ও গণতান্ত্রিক ধাপগুলি বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সুরক্ষা ও পরিবেশকে বিপন্ন করবে।
• ডিজিটাল বিভাজন ও গ্রামীণ বৈষম্য: কৃষিতে ড্রোন, স্যাটেলাইট ইমেজিং এবং ‘ODOP’ নীতির মাধ্যমে হাই-টেক পরিকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ শুনতে ভালো লাগলেও, প্রত্যন্ত গ্রামের নিরক্ষর ও প্রান্তিক চাষীদের এই জটিল ডিজিটাল সিস্টেমের আওতায় এনে দ্রুত বিমার টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা কি রাজ্য প্রশাসনের রয়েছে? যদি না থাকে, তবে এই সুবিধার সিংহভাগ বড় কর্পোরেট ও ক্লাস্টাররাই লুফে নেবে, যা গ্রামীণ বৈষম্য বাড়াবে।
• ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ নিয়ে অলীক ভাবনা: যেখানে মুম্বাইয়ের বিএসই (BSE) আর এনএসই (NSE) আজ সারা ভারতের শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, সেখানে কলকাতায় বহু বছর ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা একটি আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জকে হঠাৎ জাগিয়ে তুলে কোটি কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনাটি অর্থনৈতিকভাবে এক অলীক কল্পনা বলে মনে হয়। দেশের বড় বিনিয়োগকারীরা কেন মুম্বাই ছেড়ে এই ছোট আঞ্চলিক এক্সচেঞ্জে টাকা খাটাতে আসবেন, তার কোনো বাস্তব যৌক্তিকতা বাজেটে নেই।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বাজেটটি আসলে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনৈতিক পরীক্ষা। সরকার একদিকে পুঁজিবাদী সংস্কার (ULCRA পুনর্বিবেচনা, বেসরকারি বন্দর) এবং অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক অনুদানের রাজনীতি (অন্নপূর্ণা যোজনা, বেকার ভাতা)—দুই বিপরীত মেরুকে মেলাতে চেয়েছে।
কিন্তু অর্থনৈতিক ইতিহাস বলে, মূলধনী প্রকল্প (যেমন বিমানবন্দর বা বন্দর) তখনই সফল হয় যখন সরকারের দৈনন্দিন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই বাজেটে নিয়মিত খরচ যেভাবে আকাশছোঁয়া করা হয়েছে, তা সামাল দিয়ে মূলধনী খরচ বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে মূলধনী খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে এর হাত ধরে যদি বিপুল পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ রাজ্যে টানা না যায়, তবে সব আশার আলো ম্লান হয়ে যাবে। রাজ্য এক গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়বে। আশা ও আশঙ্কার এই দোলাচলেই ঝুলে রইল পশ্চিমবঙ্গবাসীর আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)






