গৃহযুদ্ধ শুরু করা নেতাই এখন রাষ্ট্রপতি, মিন আং হ্লাইং কে?

Myanmar President Min Aung Hlaing: মায়ানমারের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন। সেনাপ্রধান মিন আং হ্লাইং এখন রাষ্ট্রপতি। কেন এই নেতার উত্থান নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে?

inscript
৩ মিনিট
গৃহযুদ্ধ শুরু করা নেতাই এখন রাষ্ট্রপতি,  মিন আং হ্লাইং কে?

মায়ানমারের রাজনীতিতে আবারও এক বড় মোড়। বহু বিতর্ক, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অবশেষে রাষ্ট্রপতি হিসেবে হলেন সেনাপ্রধান মিন আং হ্লাইং। যে মানুষটির নাম আজ মায়ানমারের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, গণতন্ত্রের পতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গিয়েছে, তিনিই এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে।

এই ঘটনাকে অনেকেই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না, এটিকে মায়ানমারের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কারণ, মিন আং হ্লাইং-এর নেতৃত্বেই ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই অভ্যুত্থানই দেশে এক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যা আজও থামেনি।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মায়ানমারের নির্বাচিত নেত্রী আং সান সু চি-এর সরকারকে সরিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। সেই সময় থেকেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। সাধারণ মানুষ, ছাত্র, শ্রমিক—সবাই রাস্তায় নেমে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের জবাবে সেনাবাহিনী যে দমননীতি গ্রহণ করে, তা অত্যন্ত নির্মম ছিল। গুলি, গ্রেফতার, নির্যাতন—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাঙ্গেরির সাধারণ নির্বাচন: টিকবে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ, পুতিনমিত্র ভিক্টর অরবানের ‘ম্যাজিক’?

Hungary: ট্রাম্প-সমর্থিত ও পুতিনঘনিষ্ঠ ভিক্টর অরবান কি চাপের মুখেও হাঙ্গেরির নির্বাচন জিততে পারবেন? দুর্নীতি, রুশযোগ, ইইউ সংঘাত এবং বিরোধী পিটার ম্যাগিয়ারের উত্থান—এই সব ইস্যু কি অরবানের ‘ম্যাজিক’ ভেঙে দেবে, নাকি আবারও ক্ষমতা ধরে রাখবেন তিনি?

এই দমনপীড়নের ফলেই ধীরে ধীরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন রূপ নেয় সশস্ত্র প্রতিরোধে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠে ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স’ (PDF), যারা সরাসরি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। পাশাপাশি, বহু জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে মায়ানমার কার্যত একটি পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে মিন আং হ্লাইং-এর রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়া অনেকের কাছেই উদ্বেগজনক। কারণ, তিনি শুধু একজন প্রশাসনিক নেতা নন, সেই সংঘাতের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবেই পরিচিত। তাঁর শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের সময় সেনাবাহিনীর ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচিত হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ মনে করে, মিন আং হ্লাইং-এর নেতৃত্বে মায়ানমারে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যেই বহু দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা তাঁর সরকারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু তাতে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড বিল: পরিকল্পিত নরসংহার

Israel Palestine conflict: ইজরায়েলের নেসেটে পাস হওয়া মৃত্যুদণ্ড বিল কেন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক দমননীতি? গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটি কি ‘গণসংহার’ কৌশলের অংশ? আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতা কি এই বিতর্কিত আইনের পথ আরও সহজ করে দিচ্ছে?

অন্যদিকে, সেনাবাহিনী দাবি করছে, তারা দেশকে স্থিতিশীল করার জন্যই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের মতে, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই তারা ক্ষমতা নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই দাবিকে বিরোধীরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছে। তাদের বক্তব্য, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ক্ষমতা দখল, যার ফলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।

বর্তমানে মায়ানমারের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। একদিকে সামরিক সরকার, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠী—এই সংঘাতের মাঝে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিপর্যস্ত।

এই অবস্থায় মিন আং হ্লাইং-এর রাষ্ট্রপতি হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, এতে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা আরও সুসংহত হবে এবং রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আরও কমে যেতে পারে।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এই পরিবর্তন একটি কৌশলগত পদক্ষেপও হতে পারে। আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করার জন্য এবং নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করার জন্যই সেনাবাহিনী এই পথ বেছে নিয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে বসে তারা হয়তো নিজেদের শাসনকে আরও গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এতে কি সত্যিই মায়ানমারের সমস্যার সমাধান হবে? নাকি এটি কেবলমাত্র ক্ষমতা ধরে রাখার একটি নতুন কৌশল?

বর্তমান পরিস্থিতি দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কারণ, প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত এবং শক্তিশালী। তারা সহজে পিছু হটবে না। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীও তাদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

ফলে, মায়ানমার যেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং শান্তির প্রশ্নগুলি ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।