গৃহযুদ্ধ শুরু করা নেতাই এখন রাষ্ট্রপতি, মিন আং হ্লাইং কে?
Myanmar President Min Aung Hlaing: মায়ানমারের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন। সেনাপ্রধান মিন আং হ্লাইং এখন রাষ্ট্রপতি। কেন এই নেতার উত্থান নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে?
মায়ানমারের রাজনীতিতে আবারও এক বড় মোড়। বহু বিতর্ক, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অবশেষে রাষ্ট্রপতি হিসেবে হলেন সেনাপ্রধান মিন আং হ্লাইং। যে মানুষটির নাম আজ মায়ানমারের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, গণতন্ত্রের পতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গিয়েছে, তিনিই এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে।
এই ঘটনাকে অনেকেই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না, এটিকে মায়ানমারের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কারণ, মিন আং হ্লাইং-এর নেতৃত্বেই ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই অভ্যুত্থানই দেশে এক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যা আজও থামেনি।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মায়ানমারের নির্বাচিত নেত্রী আং সান সু চি-এর সরকারকে সরিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। সেই সময় থেকেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। সাধারণ মানুষ, ছাত্র, শ্রমিক—সবাই রাস্তায় নেমে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের জবাবে সেনাবাহিনী যে দমননীতি গ্রহণ করে, তা অত্যন্ত নির্মম ছিল। গুলি, গ্রেফতার, নির্যাতন—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Hungary: ট্রাম্প-সমর্থিত ও পুতিনঘনিষ্ঠ ভিক্টর অরবান কি চাপের মুখেও হাঙ্গেরির নির্বাচন জিততে পারবেন? দুর্নীতি, রুশযোগ, ইইউ সংঘাত এবং বিরোধী পিটার ম্যাগিয়ারের উত্থান—এই সব ইস্যু কি অরবানের ‘ম্যাজিক’ ভেঙে দেবে, নাকি আবারও ক্ষমতা ধরে রাখবেন তিনি?
এই দমনপীড়নের ফলেই ধীরে ধীরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন রূপ নেয় সশস্ত্র প্রতিরোধে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠে ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স’ (PDF), যারা সরাসরি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। পাশাপাশি, বহু জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে মায়ানমার কার্যত একটি পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে মিন আং হ্লাইং-এর রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়া অনেকের কাছেই উদ্বেগজনক। কারণ, তিনি শুধু একজন প্রশাসনিক নেতা নন, সেই সংঘাতের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবেই পরিচিত। তাঁর শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের সময় সেনাবাহিনীর ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ মনে করে, মিন আং হ্লাইং-এর নেতৃত্বে মায়ানমারে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যেই বহু দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা তাঁর সরকারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু তাতে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel Palestine conflict: ইজরায়েলের নেসেটে পাস হওয়া মৃত্যুদণ্ড বিল কেন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক দমননীতি? গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটি কি ‘গণসংহার’ কৌশলের অংশ? আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতা কি এই বিতর্কিত আইনের পথ আরও সহজ করে দিচ্ছে?
অন্যদিকে, সেনাবাহিনী দাবি করছে, তারা দেশকে স্থিতিশীল করার জন্যই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের মতে, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই তারা ক্ষমতা নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই দাবিকে বিরোধীরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছে। তাদের বক্তব্য, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ক্ষমতা দখল, যার ফলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
বর্তমানে মায়ানমারের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। একদিকে সামরিক সরকার, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠী—এই সংঘাতের মাঝে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিপর্যস্ত।
এই অবস্থায় মিন আং হ্লাইং-এর রাষ্ট্রপতি হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, এতে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা আরও সুসংহত হবে এবং রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আরও কমে যেতে পারে।
তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এই পরিবর্তন একটি কৌশলগত পদক্ষেপও হতে পারে। আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করার জন্য এবং নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করার জন্যই সেনাবাহিনী এই পথ বেছে নিয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে বসে তারা হয়তো নিজেদের শাসনকে আরও গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এতে কি সত্যিই মায়ানমারের সমস্যার সমাধান হবে? নাকি এটি কেবলমাত্র ক্ষমতা ধরে রাখার একটি নতুন কৌশল?
বর্তমান পরিস্থিতি দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কারণ, প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত এবং শক্তিশালী। তারা সহজে পিছু হটবে না। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীও তাদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
ফলে, মায়ানমার যেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং শান্তির প্রশ্নগুলি ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে।






