ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড বিল: পরিকল্পিত নরসংহার

Israel Palestine conflict: ইজরায়েলের নেসেটে পাস হওয়া মৃত্যুদণ্ড বিল কেন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক দমননীতি? গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটি কি ‘গণসংহার’ কৌশলের অংশ? আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতা কি এই বিতর্কিত আইনের পথ আরও সহজ করে দিচ্ছে?

Asish Gupta
৩ মিনিট
ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড বিল: পরিকল্পিত নরসংহার

সম্প্রতি ইজরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ফিলিস্তিনিদের জন্য বিশেষ মৃত্যুদণ্ড বিল পাস হওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি আইনি পরিবর্তন নয়, এটি ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের বর্ণবাদী (Apartheid) নীতি এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত পরিকল্পিত নরসংহারের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। এই আইনটি এমন এক সময়ে আনা হয়েছে যখন গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযানকে আন্তর্জাতিক মহল ‘গণসংহার’ হিসেবে অভিহিত করছে। ইজরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ৬২-৪৮ ভোটে পাস হওয়া মৃত্যুদণ্ড বিলটি আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো সেইসব ফিলিস্তিনি, যারা ইজরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে এই আইনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এর একতরফা প্রয়োগ। এটি শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, কোনো ইহুদি ইজরায়েলি যদি কোনো ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে, তবে সে এই আইনের আওতায় আসবে না। এটি সরাসরি একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনি বৈষম্য বা ‘লিগ্যাল অ্যাপার্থাইড’-এর নগ্ন উদাহরণ।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো বিশ্বখ্যাত সংস্থাগুলি দীর্ঘকাল ধরে ইজরায়েলের শাসনব্যবস্থাকে ‘বর্ণবাদ’ বা ‘অ্যাপার্থাইড’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। দক্ষিণ আফ্রিকার একসময়ের কুখ্যাত বর্ণবাদের মতোই ইজরায়েল ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা আইন, আলাদা রাস্তা এবং কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে। পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা যখন সাধারণ নাগরিক আইনের সুবিধা ভোগ করে, তখন ফিলিস্তিনিদের বিচার হয় সামরিক আদালতে, যেখানে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার ৯৬ শতাংশেরও বেশি। নতুন এই মৃত্যুদণ্ড আইন সেই ত্রুটিপূর্ণ এবং নিপীড়নমূলক বিচারব্যবস্থাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইরান সংকট: হুথিরা যেভাবে বদলে দিল যুদ্ধের মানচিত্র

Iran proxy groups Houthis Hezbollah: হুথি বিদ্রোহীদের সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশে কি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে? ইরান-ইজরায়েল উত্তেজনার মাঝে তেলপথ ও বাণিজ্য কি বড় সংকটে? এই বহুমুখী যুদ্ধ কি বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে?

বর্তমান গাজা যুদ্ধ ইজরায়েলের ‘গণসংহার’ নীতির এক চরম রূপ। নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা, খাদ্য ও ওষুধের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া এবং পুরো শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার ঘটনাকে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ICJ) ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। আদালত এই অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। মৃত্যুদণ্ড বিলটি এমন এক সময়ে কার্যকর হচ্ছে যখন ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে। সমালোচকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন আইন নয়, একটি জাতিকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া এবং তাদের অস্তিত্ব নির্মূল করার একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইরান সংকটে কেন গুরুত্বপূর্ণ গালিবাফ ও আরাঘচি?

Iran Israel conflict: ইরান সংকটে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ গালিবাফ ও আরাঘচি? এই দুই ব্যাক্তিই কি ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছেন?

ইতিহাসের পরিহাস, যে জাতি একসময় নাৎসি জার্মানির হাতে হলোকাস্ট বা ভয়াবহ নিধনযজ্ঞের শিকার হয়েছিল, আজ তাদেরই একটি কট্টরপন্থী সরকার অন্য একটি জনগোষ্ঠীর উপর প্রায় একই ধরনের বা ভিন্নতর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালাচ্ছে। যদিও নাৎসিদের গ্যাস চেম্বারের সঙ্গে বর্তমানের পরিস্থিতির সরাসরি তুলনা নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে ফিলিস্তিনিদের যেভাবে ‘উন্মুক্ত কারাগারে’ (Open-air prison) বন্দি করে রাখা হয়েছে এবং এখন আইনিভাবে হত্যার পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে, তা চরম ফ্যাসিবাদেরই নামান্তর। বেলফোর ডিক্লারেশনের মাধ্যমে যে আবাসের স্বপ্ন শুরু হয়েছিল, তা আজ একটি দখলদার ও বর্ণবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

ইজরায়েলের নেসেটে এই মানবতা বিরোধী আইন পাশ হওয়ায় বেন-গভিরের মতো উগ্রপন্থী নেতাদের উল্লাস বিশ্ববাসীকে এক অশুভ বার্তা দিচ্ছে। এই আইনটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের পরিপন্থী এবং চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। মৃত্যুদণ্ডকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এবং শক্তিশালী দেশগুলির সমর্থন ইজরায়েলকে এই ধরনের অমানবিক আইন পাসে সাহস দিচ্ছে। যদি এখনই এই বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো না যায়, তবে বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচারের ধারণাটিই অর্থহীন হয়ে পড়বে এবং ফিলিস্তিনিদের রক্তে ভেজা মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকা ইজরায়েলি গণতন্ত্র কেবল এক নির্মম প্রহসনে পরিণত হবে।

লিখেছেন
Asish Gupta
Asish Gupta
3 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।