নানা পাটেকর: ফিরে দেখা অনন্য জীবন

Nana Patekar: ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বোম্বে রাজ্যের রায়গড় জেলার মুরুদ-জানজিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্মেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। পরে সিনেমার দুনিয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘নানা পাটেকর’।

inscript
৩ মিনিট
নানা পাটেকর: ফিরে দেখা অনন্য জীবন

আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখনে...

‘ক্রান্তিবীর’-এর সেই সংলাপ আজ যেন অন্য এক অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। পর্দায় মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে যে অভিনেতা নিজের সংলাপে দর্শকদের শিউরে দিয়েছিলেন, সেই নানা পাটেকরই আজ আর নেই। ৮ অক্টোবর ভোরে গোয়ার ডোনা পাওলার বাড়িতে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বলিউডের এই কিংবদন্তি অভিনেতা। মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বোম্বে রাজ্যের রায়গড় জেলার মুরুদ-জানজিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্মেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। পরে সিনেমার দুনিয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘নানা পাটেকর’। তাঁর বাবা দিনকর পাটেকর ছিলেন টেক্সটাইল পেইন্টার ও ছোট ব্যবসায়ী। মা সঞ্জনাবাই পাটেকর। ছোটবেলা থেকেই সংসারে ছিল প্রবল আর্থিক টানাপোড়েন। সেই অভাব তাঁকে খুব অল্প বয়সেই বুঝিয়ে দিয়েছিল, জীবনে নিজের জায়গা তৈরি করতে গেলে লড়াই করতেই হবে।

মুম্বইয়ের দাদর ওয়েস্টের সমর্থ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা। স্কুলে পড়ার সময়, নবম শ্রেণিতে থাকতেই অর্থের অভাবে সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজ শুরু করতে হয়েছিল তাঁকে। মাসে আয় করতেন মাত্র ৩৫ টাকা। দিনের একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে পোস্টার আঁকার কাজ, এইভাবেই কেটেছে তাঁর কৈশোর। পরে ছবির প্রতি আগ্রহ তাঁকে নিয়ে যায় বান্দ্রা স্কুল অব আর্টসে। এরপর স্যার জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড আর্ট থেকে কমার্শিয়াল আর্টে শিক্ষা নেন।

তবে ছবি আঁকা তাঁর জীবনের শেষ ঠিকানা ছিল না। মঞ্চ আর অভিনয়ের প্রতি টান তাঁকে ধীরে ধীরে নিয়ে আসে অভিনয়ের জগতে। ১৯৭৮ সালে মুজাফফর আলি পরিচালিত ‘গমন’ ছবিতে ‘বাসু’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় তাঁর অভিষেক। একই বছর ‘গদড ঝালী’ ছবির মাধ্যমে মারাঠি সিনেমাতেও পা রাখেন তিনি।

স্টার হয়ে জন্মাননি তিনি। কিন্তু তাঁর অভিনয়ে এমন একটা তীব্রতা ছিল, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিত। সেই অভিনয়ের জোরেই ১৯৮৯ সালে ‘পরিন্দা’ ছবিতে ‘আন্না’ চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি নজরে চলে আসেন তিনি। গ্যাংস্টারের চরিত্রে তাঁর ভয়ঙ্কর অভিনয় দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। এই ছবির জন্যই তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

এরপর এল ১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’। প্রতাপ নারায়ণ তিলকের চরিত্রে নানা পাটেকরের অভিনয় তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম সেরা অধ্যায় হয়ে ওঠে। এক জুয়াড়ি ও মদ্যপ যুবক কীভাবে অন্যায়, দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়—সেই গল্পে তিনি যেন চরিত্রটিতে শুধু অভিনয় করেননি, নিজের শরীরের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। ছবির জন্য ১৯৯৫ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।

আর সেই ছবির শেষ দৃশ্য! ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই সংলাপ আজও হিন্দি সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। তাঁর চোখ, কণ্ঠস্বর আর এক্সপ্রেশন মিলিয়ে সেই দৃশ্য ভোলার নয়।

এরপর ১৯৯৬ সালের ‘অগ্নিসাক্ষী’। এখানে সম্পূর্ণ অন্য রূপে দেখা গেল তাঁকে। বিশ্বনাথ নামে এক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, সন্দেহপ্রবণ ও অত্যাচারী স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন তিনি। মণীষা কৈরালার বিপরীতে তাঁর এই নেতিবাচক চরিত্র এতটাই শক্তিশালী হয়েছিল, ১৯৯৭ সালে শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।

তবে নানা শুধু গম্ভীর চরিত্রের অভিনেতা ছিলেন না। ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠি চরিত্রে তাঁর হাস্যরসও নতুন প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছিল। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর ছিলেন অভিনেতা, পরিচালক, লেখক এবং মঞ্চশিল্পী। ২০১৩ সালে পদ্মশ্রী সম্মানেও ভূষিত হন তিনি।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও তিনি ছিলেন নিজের মতোই। কিন্তু ৮ অক্টোবর ভোরে আচমকাই সব শেষ। বুধবার রাত থেকে শরীর খারাপ লাগার কথা জানিয়ে বন্ধুকে মেসেজ করেছিলেন তিনি। রাত আড়াইটে নাগাদ সেই মেসেজ পাঠানো হলেও বন্ধু তা দেখতে পান পরে। ভোরের দিকে বন্ধুটি তাঁর গোয়ার বাড়িতে পৌঁছে দেখেন, নানা প্রচণ্ড ঘামছেন এবং ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে পড়ছেন। দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরাও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আর ফেরানো গেল না তাঁকে।

পর্দায় তিনি বহুবার মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েছেন। কখনও বিপ্লবীর ভূমিকায়, কখনও খলনায়কের চরিত্রে, কখনও বা এক অসহায় মানুষের মুখে। আজ বাস্তবের জীবনেই সেই পর্দার মানুষটি চলে গেলেন। রেখে গেলেন অসংখ্য চরিত্র, অসংখ্য সংলাপ আর কয়েক প্রজন্মের দর্শকের মনে অমলিন এক ছাপ।

হাম সব সিস্টেম কা হিসসা হ্যায়, সিস্টেম ডিসাইড করতা হ্যায়, আপুন ফলো কারতা হ্যায়

'আব তক ছাপ্পান' সিনেমায় অন্যভাবে সংলাপটি বলা হলেও জীবনের সিস্টেম অনুযায়ী একদিন সবাইকেই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে। নানা পাটেকর পর্দা থেকে বিদায় নিলেও, দর্শকদের মন থেকে কখনও হারিয়ে যাবেন না।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ভারতীয় সিঙ্গল মল্টের উত্থান: যেভাবে বিশ্ববাজারে বাড়ছে দেশি হুইস্কির কদর

Indian single malt whisky: CIABC এবং বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি রিপোর্টের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে ২০২৫ সালে ভারতীয় ‘Made in India’ সিঙ্গেল মল্টের ডোমেস্টিক বিক্রি প্রায় ৫ লাখ কেস ছুঁয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।

ফ্লিপকার্টের চারটি অর্ডারেই এক মাসের নেটফ্লিক্স, নতুন অফারে কতটা লাভ সংস্থার?

Netflix Flipkart partnership: ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই যৌথ পথচলার কথা জানানো হয়। এর ফলে যোগ্য ফ্লিপকার্ট প্লাস সদস্যরা প্রতি মাসে ২৯৯ টাকা বা তার বেশি দামের চারটি নির্দিষ্ট অর্ডার করলে এক মাসের নেটফ্লিক্স মোবাইল সাবস্ক্রিপশন পেতে পারেন। এই সুবিধা ফ্লিপকার্ট, ফ্লিপকার্ট গ্রোসারি ও ফ্লিপকার্ট মিনিটস-এর কেনাকাটায় প্রযোজ্য।

মানুষের শরীরে ইতিহাসের দাগ এঁকেছিলেন যোগেন চৌধুরী

Jogen Chowdhury artist: কিছু শিল্পীর মৃত্যু হয়, অথচ তাঁদের শিল্পের ভিতর দিয়ে সময় কথা বলে যায়। যোগেন চৌধুরী সেই বিরল শিল্পীদেরই একজন।

‘ইতিহাসকে হিন্দু রাষ্ট্রের হাতিয়ার বানানো হচ্ছে’: রোমিলা থাপারের জরুরি সতর্কবার্তা

Sitaram yechury memorial lecture by romila thapar: ৯৪ বছর বয়সি ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার, দ্বিতীয় সীতারাম ইয়েচুরি স্মারক বক্তৃতায় দেখালেন, হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চা আসলে ঔপনিবেশিক মিথের উত্তরাধিকার। জেমস মিলের যুগবিভাজন থেকে ‘আর্য’ তত্ত্ব, হলদিঘাটের যুদ্ধের প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চরিত্র থেকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসবোধ, সবই তাঁর বক্তৃতায়, প্রমাণসহ উপস্থিত হলো।

মেষ নয়, হায়াডিস? ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ নিয়ে কী বলছে নতুন গবেষণা?

The Starry Night mystery: এর আগে দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে ভ্যান গগের আঁকা ছবিটির উপরের অংশটি মেষ রাশির কোনো তারামণ্ডল। তবে, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত 'দ্য অ্যাকচুয়াল স্কাই অফ ভ্যান গগস স্টারি নাইট: এ মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিঅকনস্ট্রাকশন' নামক গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ভ্যান গগের ছবির কেন্দ্রীয় পাঁচ তারার বিন্যাস মেষ রাশির সঙ্গে নয়, বরং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মেলে।

যে স্বাধীনতা মঞ্চে খুঁজেছিলেন তৃপ্তি মিত্র, সমাজ কি তা দিতে পেরেছে?

Tripti Mitra theatre philosophy: বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে তৃপ্তি মিত্রকে সাধারণত এক কিংবদন্তি অভিনেত্রী হিসেবেই উদ্‌যাপন করা হয়। কিন্তু তাঁর নিজস্ব রচনাগুলির নিবিড় পাঠ আমাদের সামনে এক অন্য তৃপ্তি মিত্রকে হাজির করে—যিনি কেবল অন্যের লেখা সংলাপ আওড়ান না, বরং মঞ্চের ‘স্পেস’ বা পরিসরকে মানুষের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা, নারী-পরিচয় এবং ঐতিহাসিক ট্রমার এক গভীর দার্শনিক পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করেন।

ছোটবেলায় যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে বন-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকতাম: হিরণ মিত্র

Jogen Chowdhury memoir: আমাদের পাশে বেশ কিছু আদিবাসী গ্রাম ছিল তখন, এখনও আছে, তাদের ওখানে গিয়ে ওঁরা ছবি আঁকতেন, বন-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে। যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে তখন আমিও ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকতাম। সকাল থেকে আমরা, বিশেষত আমি যোগেন চৌধুরীর পিছনে পিছনে ঘুরতাম।

থামল রেখার জাদু, প্রয়াত আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম শিল্পী যোগেন চৌধুরী

Jogen Chowdhury: ১৯৩৯ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার দহরপাড়া গ্রামে জন্ম নেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন একজন জমিদার, যিনি শিল্প ও পুরাণের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর মা ইন্দুদেবী আলপনা আঁকায় দক্ষ ছিলেন।