‘দিল্লিতে রক্ত ঝরলে কলকাতাও আঘাত পায়’: যাদবপুরে নেহা বোরার কণ্ঠে প্রতিরোধের ঐক্যের বার্তা
Neha Bora Jadavpur University: নেহার কথায়, “আমার গলার অবস্থা, আমার শরীরের অবস্থা যা—ঠিক একই পরিস্থিতি আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (SRFTI)। আর এই যন্ত্রণা যদি কেউ বুঝতে পারে, তবে দিল্লির রাজপথে যাদের রক্ত ঝরেছে, যাদবপুরে যাদের উপর হামলা হয়েছে, এসআরএফটিআই-তে যাদের উপর আক্রমণ হয়েছে—আমরাই একে অপরের ব্যথা সবচেয়ে ভালো বুঝি।”
দিল্লির যন্তর মন্তরে তখন টানা তিন দিনের পুলিশি ধরপাকড়, ব্যারিকেড আর ধস্তাধস্তির চিহ্ন। নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR)-এর মাধ্যমে কোটি কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে ২ অক্টোবর থেকে চলা উত্তাল আন্দোলনের সরাসরি প্রভাব এসে পৌঁছল কলকাতায়। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন, একটানা স্লোগানে বসে যাওয়া ভাঙা গলা—সেই শারীরিক ক্লান্তি আর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নকে সঙ্গী করেই ৫ অক্টোবর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কে পি বসু মেমোরিয়াল হলে আয়োজিত কনভেনশনে হাজির হলেন ‘আইসা’র (AISA) সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা।
বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কনভেনশনের মূল সুর ছিল ‘জেন জি আন্দোলন: প্রজন্ম ও প্রতিরোধের ঐক্য’। নয়া শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, এনটিএ বাতিল এবং এসআইআর খারিজের দাবিতে আয়োজিত মঞ্চে নেহা যখন মাইকের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তখন সেখানে নিছক বক্তৃতা নয়, তৈরি হলো এক যৌথ লড়াইয়ের শপথ।
ভাষণের শুরুতেই নিজের শারীরিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, টানা তিন দিন দিল্লির রাস্তায় লড়াইয়ের পর তাঁর শরীরের প্রতিটি অংশ যেমন অবসন্ন, তেমনই যেন আক্রান্ত দেশের ছাত্রসমাজ। তবে এই আঘাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নেহার কথায়, “আমার গলার অবস্থা, আমার শরীরের অবস্থা যা—ঠিক একই পরিস্থিতি আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (SRFTI)। আর এই যন্ত্রণা যদি কেউ বুঝতে পারে, তবে দিল্লির রাজপথে যাদের রক্ত ঝরেছে, যাদবপুরে যাদের উপর হামলা হয়েছে, এসআরএফটিআই-তে যাদের উপর আক্রমণ হয়েছে—আমরাই একে অপরের ব্যথা সবচেয়ে ভালো বুঝি।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Delhi Protest: দিল্লির যন্তর মন্তরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের খবর করতে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন তিন মহিলা সাংবাদিক। তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে দিল্লি পুলিশ। অভিযোগগুলি নিউ দিল্লি জেলা পুলিশ থেকে ক্রাইম ব্রাঞ্চের কামলা মার্কেট শাখায় পাঠানো হয়েছে।
শাসকদলের অহংকার ও আগ্রাসনকে সরাসরি নিশানা করে নেহা সাফ জানান, ক্ষমতার দম্ভে শাসকরা ভাবছে তারা মারধর করে মানুষকে নতজানু করে ফেলবে। জেএনইউ কিংবা যাদবপুর বা এসআরএফটিআই—হামলা চালিয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দাবিয়ে রাখা যায় না। তাঁর তীব্র মন্তব্য, “ওরা বোঝে না, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র আন্দোলন আর গণআন্দোলন গড়ে তোলা মানুষগুলোর শিকড় আসলে বামপন্থার ঐতিহ্যে গাঁথা। আমাদের মেরে পায়ের তলায় নামিয়ে আনা যায় না। ইতিহাসে যখনই কেউ আমাদের বশে আনার চেষ্টা করেছে, মানুষ তাদের মানুষের ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়েছে।” ভিয়েতনামের প্রতিরোধ, কিউবা, লাতিন আমেরিকা কিংবা ইরানের উদাহরণ টেনে তিনি মনে করিয়ে দেন, স্বৈরাচারীদের মসনদ থেকে টেনে নামানোর ইতিহাস নতুন নয়।
বক্তব্যের একটি বড় অংশে নেহা তুলে ধরেন ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গণতন্ত্র কোনো কাগুজে তত্ত্ব নয়; এটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের ফসল। কিন্তু ছলে-বলে ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে গণতন্ত্রের আত্মাকেই হত্যা করা হচ্ছে। তাঁর তোপ, “যাঁরা এই সংবিধানকে আজ ছিন্নভিন্ন করছেন, তাঁদের পূর্বপুরুষরা এই দেশ বা গণতন্ত্র গড়ার জন্য কোনো রক্ত দেননি। রক্ত ঝরেছিল সাধারণ মানুষের পূর্বপুরুষদের।”
বাংলার ভূমিতে ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রবেশের চেষ্টাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে তিনি অভিযোগ করেন, বাংলায় ক্ষমতার লোভ ও আস্ফালন তৈরি করতে এসআইআর-এর মতো ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। ক্ষমতার কাছাকাছি এসেই এখানে শুরু হয়েছে মব লিঞ্চিং, একের পর এক বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। স্কুল মেরামতের দাবিতে গিয়ে এক সাধারণ মানুষের পিতাকে খুন হতে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের উপর প্রাণঘাতী আক্রমণ চলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gandhi Jayanti 2026: সত্যাগ্রহ, অহিংসা, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের যে রাজনৈতিক ভাষা গান্ধী তৈরি করেছিলেন, তা স্বাধীনতার পরও ভারতের প্রতিবাদ রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। এসআইআর-বিরোধী আন্দোলন কীভাবে সেই উত্তরাধিকারকেই নতুন ভাবে সামনে আনল?
এসআরএফটিআই-এর মতো সৃষ্টিশীল জায়গায় রাজনৈতিক আগ্রাসন ঢুকিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু নেহার স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, ফ্যাসিবাদের মোকাবিলায় দেশ যখনই সংকটে পড়েছে, বাংলা সবসময় বুক চিতিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। এবারও প্রগতিশীল চিন্তাকে রক্ষা করার লড়াই বাংলাকে লড়তে হবে।
শাসনব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মিডিয়া, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ-প্রশাসন—সবকিছু যখন শাসকদলের পকেটে, তখন তারা ভাবে সবাই ভয়ে কাঁপছে কিংবা বিক্রি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু নেহার প্রত্যয়ী ঘোষণা, “গোটা বাংলা, গোটা ভারত তথা বিশ্বে এমন এক মানবগোষ্ঠী রয়েছে, যারা না ডরায়, না নিজেদের বিক্রি করে। সেই সত্তাটির নাম বামপন্থা। ফ্যাসিবাদের ঔদ্ধত্য যত দিন থাকবে, শেষ কণ্ঠস্বরটুকু বেঁচে থাকা পর্যন্ত এই আদর্শ লড়াই চালিয়ে যাবে।”
উত্তরাখণ্ডের পটভূমি থেকে উঠে আসা নেহা তাঁর বক্তব্যের শেষভাগে উদ্ধৃত করেন ভিয়েতনামের লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে লেখা বিখ্যাত উর্দু পঙ্ক্তি:
“ছোটি সি এক কওম নে হিম্মত হি তোড় দি,
এক দস্ত-এ-নাতওয়াঁ নে তো কলাই মরোড় দি।”
অর্থাৎ, আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র বা দুর্বল হাতের প্রতিরোধই এক প্রবল শত্রুর দম্ভ গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি মনে করিয়ে দেন, বামপন্থা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি বা ভাষার সূক্ষ্মতাতেই সীমাবদ্ধ নয়; রাজপথের লড়াইয়ে স্বৈরাচারের হাত কীভাবে মচকে দিতে হয়, ইতিহাস তা বারবার প্রমাণ করেছে।
দিল্লি এবং কলকাতার এই অবিচ্ছেদ্য সংগ্রামের সেতুবন্ধন রচনা করে নেহা জানান, এই ঐক্যের জোরেই ফ্যাসিবাদের দিন গণনা শুরু হয়ে গিয়েছে। তাঁর সমাপনী বার্তা, “দিল্লিতে রক্ত ঝরলে কলকাতা যেমন আঘাত অনুভব করে, তেমনই কলকাতায় রক্ত ঝরলে দিল্লি রুখে দাঁড়াবেই—এই প্রতিজ্ঞার উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠবে নয়া প্রতিরোধ।” আর সেই গণপ্রতিরোধের জোয়ারেই ফ্যাসিবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে একদিন ইতিহাসের ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হতে হবে।






