এসআইআর বিক্ষোভ: ২ অক্টোবর গান্ধী যেভাবে ফিরে এলেন
Gandhi Jayanti 2026: সত্যাগ্রহ, অহিংসা, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের যে রাজনৈতিক ভাষা গান্ধী তৈরি করেছিলেন, তা স্বাধীনতার পরও ভারতের প্রতিবাদ রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। এসআইআর-বিরোধী আন্দোলন কীভাবে সেই উত্তরাধিকারকেই নতুন ভাবে সামনে আনল?
২ অক্টোবর ভারতে মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন, গান্ধী জয়ন্তী। প্রতি বছরই এই দিনটি সরকারি ভাবে পালিত হয়। গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়, তাঁর অহিংসার দর্শন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর দিনটি আরও একটি কারণে রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আবারও ফিরে এল গান্ধীর নাম, ছবি এবং তাঁর আন্দোলনের পদ্ধতির উল্লেখ।
দিল্লিতে ছাত্র সংগঠন, কর্মী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। তাঁদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও তোলেন। প্রস্তাবিত জমায়েতের জন্য দিল্লি পুলিশ অনুমতি দেয়নি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন ৭০০-র বেশি প্রতিবাদীকে আটক করা হয়।
মুম্বইয়েও গান্ধী জয়ন্তীতে প্রতিবাদ হয়। ককরোচ জনতা পার্টি শিবাজি পার্কে একটি বড় কর্মসূচির আয়োজন করে। সেখানেও নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে প্রশ্ন তুলে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানানো হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই প্রতিবাদ পরবর্তী সময়ে দেশের অন্য শহরেও ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
তবে গান্ধী জয়ন্তীতে কোনো প্রতিবাদ হলেই সেটিকে গান্ধীবাদী প্রতিবাদ বলা যায় না। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গান্ধী প্রতিবাদ আবিষ্কার করেননি। ভারতের ইতিহাসে তাঁর আগে থেকেই নানা ধরনের প্রতিরোধের ইতিহাস ছিল। গান্ধী মূলত প্রতিবাদকে একটি নতুন রাজনৈতিক পদ্ধতি ও বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ দিয়েছিলেন।
গান্ধীর রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল সত্যাগ্রহ, অহিংসা, অসহযোগ এবং আইন অমান্য আন্দোলন। ১৯১৭ সালের চম্পারণ সত্যাগ্রহ ছিল ভারতে তাঁর প্রথম বড় সত্যাগ্রহ আন্দোলন। নীলচাষিদের সমস্যার কথা জানতে চম্পারণে গিয়েছিলেন গান্ধী। ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁকে সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও তিনি সেই নির্দেশ মানেননি এবং কৃষকদের অভিযোগের তদন্ত চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং তদন্ত চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়।
এর পরে ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহ গান্ধীর আন্দোলনের পদ্ধতিকে আরও বড় আকারে সামনে নিয়ে আসে। ৭৮ জন সঙ্গীকে নিয়ে সাবরমতী আশ্রম থেকে দান্ডির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন তিনি। প্রায় ২৪০ মাইলের সেই পদযাত্রার শেষে সমুদ্রের জল থেকে লবণ তৈরি করে ব্রিটিশ লবণ আইনের বিরুদ্ধে আইন অমান্য করেন। একটি সাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল বড় রাজনৈতিক আন্দোলন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gyanesh Kumar resignation: ২ অক্টোবর গান্ধীজয়ন্তীতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়ল প্রতিবাদ?
এই ঘটনাগুলির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—রাজনৈতিক প্রতিবাদ সব সময় অস্ত্র, হিংসা বা প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে হতে হবে এমন নয়। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত কোনো বিষয়ও বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হতে পারে, যদি মানুষ সম্মিলিত ভাবে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
এই ধারণাই গান্ধীর মৃত্যুর পরেও ভারতের প্রতিবাদ রাজনীতিতে বারবার ফিরে এসেছে।
তবে পরবর্তী কোনো আন্দোলনই গান্ধীর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন অনুসরণ করেছে—এমন বলা ঠিক হবে না। বরং বিভিন্ন আন্দোলন গান্ধীর রাজনৈতিক ভাষা থেকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু বিষয় গ্রহণ করেছে। কোথাও সত্যাগ্রহের কথা এসেছে, কোথাও অনশন, কোথাও পদযাত্রা বা অসহযোগের কথা বলা হয়েছে। আবার কোথাও গান্ধীর ছবি, চরকা, খাদি বা ২ অক্টোবরের মতো প্রতীকী বিষয় ব্যবহার করা হয়েছে।
২০১১ সালের অন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। অনশন এবং সত্যাগ্রহের ভাষা সেই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে আন্দোলনটি গান্ধীর স্বাধীনতা আন্দোলনের হুবহু পুনরাবৃত্তি ছিল। বরং এর মাধ্যমে বোঝা যায়, গান্ধীর তৈরি রাজনৈতিক প্রতীক ও পদ্ধতিগুলি পরবর্তী প্রজন্ম নতুন পরিস্থিতিতে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে।
গান্ধী কেন এখনও এত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতীক, তার একটি কারণ তাঁর উত্তরাধিকার বহুস্তরীয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম, অহিংসা, অসহযোগ, আইন অমান্য, স্বদেশি, সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ—এই সবকিছুর সঙ্গেই তাঁর নাম যুক্ত। ফলে কোনো প্রতিবাদে গান্ধীর ছবি ব্যবহার করলেই সেই প্রতিবাদে অংশ নেওয়া প্রত্যেকে তাঁর সম্পূর্ণ দর্শনের সমর্থক, এমন ধরে নেওয়া যায় না।
কেউ হয়তো শুধু অহিংস প্রতিরোধের ধারণাটিকে সামনে আনছেন। কেউ রাষ্ট্র বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে নাগরিকের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার বোঝাতে গান্ধীর নাম ব্যবহার করছেন। আবার কেউ ২ অক্টোবরের ঐতিহাসিক গুরুত্বকেই কাজে লাগাচ্ছেন।
দিল্লির প্রতিবাদের মূল বিষয় ছিল নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বেগ। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, এই প্রক্রিয়ায় যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়তে পারে। অন্য দিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এসআইআর-এর উদ্দেশ্য হলো যোগ্য নাগরিকদের ভোটার তালিকায় রাখা এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া।
মুম্বইয়ে সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে গান্ধীর কথা উল্লেখ করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বলেন এবং ভবিষ্যতের কর্মসূচিকে গান্ধীর দেখানো পথ অনুসরণ করার সঙ্গে যুক্ত করেন।
২০০৭ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদ ২ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। দিনটি একই সঙ্গে ভারতের জাতীয় স্মৃতির অংশ এবং আন্তর্জাতিক ভাবে অহিংসার সঙ্গে যুক্ত একটি দিন।
সময় বদলেছে, প্রতিবাদের বিষয় বদলেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ভাবে দাঁড়ানোর ধারণাটি যখনই সামনে এসেছে, তখনই কোনো না কোনো ভাবে গান্ধী আবার ফিরে এসেছেন ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে।






