ইজরায়েলে সরকার গড়বে কে?
Israel election results: নির্বাচনে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নেতানিয়াহুর টিকে থাকা ও আইজেনকটের ক্ষমতায় আসা অনিশ্চিত; এমতাবস্থায় আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করবে?
ইজরায়েলের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তেমনই বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকটের পক্ষেও সরকার গঠন সহজ হচ্ছে না। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, ১২০ আসনের ইজরায়েলি সংসদ নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো শিবিরের হাতেই নেই। এই পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইজরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব রাজনৈতিক দলগুলি। কিন্তু তাদের সমর্থন নিতে রাজনৈতিক নেতাদের একাংশের আপত্তি রয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরেও দেশটির রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটেনি। বরং সরকার গঠনের প্রশ্নে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল ৭৭.৯ শতাংশ। চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। বাকি ১৯টি আসন পেয়েছে দুটি প্রধান আরব রাজনৈতিক জোট—ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা'আম এবং জয়েন্ট লিস্ট। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের তুলনায় কোনো পক্ষই যথেষ্ট সংখ্যক আসন পায়নি। ফলে এই মুহূর্তে আরব দলগুলির সমর্থন ছাড়া বিরোধী শিবিরের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে ইজরায়েলের সামনে কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, বিরোধী শিবির আরব দলগুলির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, নেতানিয়াহু এবং আইজেনকটের নেতৃত্বে একটি ঐক্য সরকার তৈরি হতে পারে। তৃতীয়ত, নেতানিয়াহু বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দলকে নিজেদের দিকে টেনে এনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন। এই সমস্ত সম্ভাবনা ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবার নির্বাচন হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরব দলগুলির অবস্থান। ইজরায়েলের নির্বাচনে এই দলগুলি মোট ১৯টি আসন পেয়েছে। ফলে তাদের সমর্থন পেলে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির ৬১ আসনের প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, আইজেনকট এবং তাঁর জোটের একাধিক নেতা নির্বাচনের আগে আরব দলগুলির সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুও আরব দলগুলির সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার বিরোধিতা করেছেন। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আরব দলগুলিকে নিয়ে সরকার গঠন করা নিষিদ্ধ। তাঁর দল লিকুদ আবার অভিযোগ করেছে, আরব দলগুলি নির্বাচনে কারচুপি করে ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এই অভিযোগের ফলে আরব দলগুলির রাজনৈতিক অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ, নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক আসন পাওয়ার পরেও তাদের সরকার গঠনের আলোচনায় গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel elections: আরব ইজরায়েলি কারা? বৈষম্য ও অপরাধের প্রতিবাদে তাঁদের রেকর্ড ভোট আরব দলগুলোকে ইজরায়েলের নেসেটে সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি বানিয়ে দিল?
তবে আরব দলগুলির অবস্থান একেবারে একরকম নয়। জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিন নেতানিয়াহু সরকারের অবসানের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, আধিপত্যবাদ, বর্ণবিদ্বেষ এবং রাজনৈতিকভাবে একাংশের মানুষকে বাদ দেওয়ার রাজনীতির বিরুদ্ধে ইহুদি ও আরব নাগরিকদের সমান অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিকল্প তৈরি করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, রা'আম আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সরকারে সরাসরি অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খোলা রেখেছে। জয়েন্ট লিস্ট আবার বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন করার কথা বিবেচনা করতে পারে। তবে তাদের সমর্থনের বিনিময়ে আরব অধ্যুষিত এলাকায় বিনিয়োগ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, বাড়ি ভাঙার নীতি বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিন সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের মতো বিষয়গুলিতে প্রতিশ্রুতি চাওয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের একাধিক পথ রয়েছে। তারা সরাসরি মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে পারে, মন্ত্রিসভায় অংশ না নিয়েও জোটের সদস্য হতে পারে অথবা বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন করতে পারে। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের সরকারে রা'আম যোগ দিয়েছিল। ইজরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে সেই সরকারও মাত্র ১৮ মাস টিকেছিল।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো নেতানিয়াহু এবং আইজেনকটের নেতৃত্বে একটি ঐক্য সরকার গঠন। এই দুই শিবিরের কয়েকটি দল একসঙ্গে এলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এই সমঝোতা অত্যন্ত কঠিন। কারণ, আইজেনকট নির্বাচনের সময় নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বর্তমান রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশ নির্ভর করে অতি-দক্ষিণপন্থী এবং অতি-ধর্মীয় দলগুলির উপর। ঐক্য সরকার গড়তে হলে তাঁকে এই রাজনৈতিক সহযোগীদের ছেড়ে আসতে হতে পারে।
আইজেনকটের বিরোধিতার কারণ নেতানিয়াহুর শাসনকালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং দুর্নীতি সংক্রান্ত বিতর্ক। ফলে নির্বাচনের আগে যে রাজনৈতিক অবস্থান তাঁরা নিয়েছিলেন, সরকার গঠনের জন্য তা থেকে সরে আসা দুই নেতার পক্ষেই সহজ হবে না।
দীর্ঘদিন ধরে ইজরায়েলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা নেতানিয়াহুর সামনে আরেকটি পথ খোলা রয়েছে। তিনি বিরোধী শিবিরের কয়েকজন সাংসদকে নিজের দিকে টেনে আনার চেষ্টা করতে পারেন। বিশেষ করে নাফতালি বেনেট এবং আভিগদর লিবারম্যানের মতো নেতাদের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে তাঁদের সঙ্গে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে অতি-ধর্মীয় দলগুলির বিভিন্ন দাবি নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গের মতে, নেতানিয়াহু নতুন করে নির্বাচন চাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে পারেন। তাঁর হিসাব হতে পারে, পরবর্তী নির্বাচনে আরব ভোটারদের উপস্থিতি কমলে এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে হতাশা তৈরি হলে তাঁর জোট আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। তবে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
ইজরায়েলের সংবিধান অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য প্রথমে রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তার পরে তিনি সেই নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। নির্বাচিত নেতা সাধারণত ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। তিনি ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রপতি অন্য কোনও নেতাকে একই দায়িত্ব দিতে পারেন। সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেটের ৬১ জন সদস্য কোনও একজন সাংসদের নাম প্রস্তাব করে তাঁকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানাতে পারেন। শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াও ব্যর্থ হলে নতুন করে নির্বাচন করতে হবে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, ইজরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। আরব দলগুলি ১৯টি আসন পাওয়ায় তাদের সমর্থন এখন সরকার গঠনের অঙ্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সমর্থন গ্রহণ করতে ইজরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির অনীহা দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে, তাঁরা সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেন। অথচ সেই প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করার প্রশ্নে আপত্তি উঠছে।
তবে ফিলিস্তিনের গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমের মানুষের কাছে এই নির্বাচনকে সরাসরি শান্তি ও স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, ইজরায়েলে কে সরকার গঠন করবে, তার উপরেই শুধু ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে না। দখলদারি, বসতি সম্প্রসারণ, উচ্ছেদ এবং বৈষম্যের মতো বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার গঠিত হলেও এই নীতিগুলির পরিবর্তন হবে কি না, সেটাই তাঁদের কাছে বড় প্রশ্ন।






