১৫০ বছরের পুরনো বাংলো, এখানেই সুস্থ হয়েছিলেন নেতাজি

Netaji Dalhousie Bungalow: নেতাজির ডালহৌসি জীবনের সেই দিনগুলি নিয়ে আজও অনেক রহস্যে মোড়া। কিন্তু একটা তথ্য একেবারে খাঁটি। পাহাড়ের এক কোণে লুকিয়ে থাকা প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এক বাংলোতেই সে সময় পা রেখেছিলেন তিনি। কালের নিয়মে সেই বাংলোর চেহারা বদলেছে, কিন্তু তার ভিতরের ইতিহাসটা হারিয়ে যায়নি।

inscript
৪ মিনিট
১৫০ বছরের পুরনো বাংলো, এখানেই সুস্থ হয়েছিলেন নেতাজি

১৯৩৭-এর গ্রীষ্ম। ব্রিটিশদের গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়েই শরীর সারাতে ডালহৌসির মেঘ-কুয়াশায় ঘেরা ধৌলাধার পাহাড়ের কোলে চলে এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত শরীর আর ক্লান্ত মন নিয়ে প্রায় ছয় মাস তিনি কাটিয়েছিলেন এই পাহাড়ি শহরের নিস্তব্ধতায়। শোনা যায়, এখানকার ‘সুভাষ বাওলি’ ঝরনার ঔষধি জল আর পাহাড়ের হাওয়া নাকি সে যাত্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন নেতাজি।

নেতাজির ডালহৌসি জীবনের সেই দিনগুলি নিয়ে আজও অনেক রহস্যে মোড়া। কিন্তু একটা তথ্য একেবারে খাঁটি। পাহাড়ের এক কোণে লুকিয়ে থাকা প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এক বাংলোতেই সে সময় পা রেখেছিলেন তিনি। কালের নিয়মে সেই বাংলোর চেহারা বদলেছে, কিন্তু তার ভিতরের ইতিহাসটা হারিয়ে যায়নি।

১৯৭২ সাল। মনমোহন সিং বাওয়া নামের এক অদ্ভুত গুণী মানুষ নেতাজির স্মৃতিবিজড়িত এই বাংলো কিনে নেন। মনমোহন সিং বাওয়া একাধারে লেখক, চিত্রশিল্পী, ট্রেকার ও মানচিত্রকার। পাহাড়ি এই বাংলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তিনি মন থেকে অনুধাবন করেছিলেন। তাই এটিকে তিনি বদলে ফেলেন একটি চমৎকার বুটিক রিসর্টে। পরের ৫০ বছর ধরে পরম যত্নে তিনি এটি চালিয়েছেন।

চিত্রঋণ: inclined studio

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স বেড়েছে মনমোহন বাবুর। ৯৩ বছর বয়সে পৌঁছে এই বিশাল প্রপার্টির দেখভাল করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে উঠছিল। তখন তিনি এই বাংলোর দায়িত্ব তুলে দেন তাঁর দুই মেয়ে—অনুরাধা বাওয়া সিং এবং সীমা বাওয়ার হাতে। দুজনেই দিল্লির নামী অধ্যাপক (যথাক্রমে ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাসের)।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দমদমের ‘বুড়ো কোঠি’: ক্লাইভের বাড়ি নাকি ২৯০০ বছরের হারানো নগরীর ধ্বংসাবশেষ!

খননকার্যে প্রমাণিত হয়েছে, আজ থেকে প্রায় ২৯০০ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ অব্দে) এই স্থানে মানুষের নিয়মিত বসবাস ছিল। অর্থাৎ, জব চার্নক কলকাতা শহর আবিষ্কার করার অনেক অনেক আগে থেকেই এখানে এক উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।

তবে ততদিনে যত্নের অভাবে এই ইতিহাসবিজড়িত বাড়িটির অবস্থা বেশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু বাবার তৈরি করা এই স্বপ্ন আর নেতাজির স্মৃতিকে তো এভাবে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না! তাই দুই বোন এবং তাঁদের স্বামীরা মিলে এক মস্ত বড় সিদ্ধান্ত নিলেন—তাঁরা এই বাংলোর ভোল বদলে ফেলবেন, ফিরিয়ে দেবেন তার পুরনো গৌরব।

যখন বাড়ি নিজেই হয়ে উঠল পথপ্রদর্শক

বাংলোটি নতুন করে সাজিয়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হলো পাঠানকোটের এক নামী আর্কিটেক্ট ফার্ম ‘ডিজাইন লিজেন্ডস’-কে। এর দুই কর্ণধার মধুর গুপ্ত এবং নিতিকা মহাজন যখন প্রথম এই প্রপার্টিতে পা রাখেন, তাঁরা অবাক হয়ে যান। বাড়িটির নাম দেওয়া হলো ‘টেরা হিলস’ (Terrah Hills)।

এমনিতে খাতা-কলমে পুরনো বাড়ি মেরামতের কাজ সহজ মনে হলেও, বাস্তবে তা ছিল দারুণ চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু কাজ শুরু করতেই যেন ম্যাজিক হতে লাগল। কারণ এই বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে অনেক গল্প লুকিয়ে। মেরামতের জন্য যখন দেওয়ালের উপরের প্লাস্টারের স্তরগুলি সরানো হলো, তখন ভিতর থেকে বেরিয়ে এল আসল পাথরের দেওয়াল। পাহাড়ি জাঁকালো দেবদারু কাঠের তৈরি ছাদ আর বিমগুলি কয়েক দশক ধরে পাহাড়ের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া সহ্য করেও অক্ষত রয়ে গিয়েছিল। ডিজাইনার নিতিকা মহাজন তখন বুঝলেন, পুরনো জিনিস ফেলে দিয়ে নতুন করার চেয়ে যা আছে, তাকে বাঁচিয়ে রাখাই আসল কাজ। এই বাড়িটির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর নিজস্ব ইতিহাস।

চিত্রঋণ: inclined studio

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৭৭৭ থেকে ২০২৬, যেভাবে বদলেছে রাইটার্স বিল্ডিং

১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেসলি এই ভবনে ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ স্থাপন করেন। ব্রিটেন থেকে যে সমস্ত নতুন রাইটার্স বা ক্লার্করা ভারতে আসতেন, তাঁদের এ দেশের ভাষা (যেমন বাংলা, হিন্দি, ফার্সি ইত্যাদি) এবং সংস্কৃতি শেখানোর জন্য এই কলেজটি ব্যবহার করা শুরু হয়।

১৮০০-র দশকের সেই চেনা আমেজ

পুরো বাংলোটাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন মনে হবে আপনি টাইম মেশিনে চড়ে সোজা ১৮০০-র দশকে চলে গিয়েছেন। কাঠের মেঝে, পুরনো কায়দার হাতে তৈরি কাঠের সিঁড়ি আর সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি ছাদ—সবকিছুকে নিখুঁতভাবে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

বড় বড় ফ্রেঞ্চ জানালা, রাজকীয় খিলান আর বাইরে বেরিয়ে থাকা বে-উইন্ডোর কারুকাজ ধরে রাখা হয়েছে যত্নে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অ্যান্টিক ঝাড়বাতি, ভিন্টেজ আসবাবপত্র এবং ব্রিটিশ আমলের সেই হালকা, শান্ত রঙের ছোঁয়া। পাহাড়ের পরিবেশের সঙ্গে যা একেবারেই মিলেমিশে যায়।

পুরনো খোলসে আধুনিক আরাম

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি পাহাড়ের সেই আদি ও অকৃত্রিম ঔপনিবেশিক বাংলো। কাঠের চমৎকার কাজ, উপরের দিকে ছাদ থেকে বেরিয়ে থাকা ছোট ছোট দরমার জানালা আর কাঠের স্তম্ভগুলি এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। নিচতলার ঘরগুলিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে প্রতিটি ঘরের আলাদা প্রবেশপথ থাকে এবং একটা চমৎকার কটেজের ফিল পাওয়া যায়। আর যেসব অন্ধকার কোণে বছরের পর বছর আলো পৌঁছয়নি, সেখানে ছাদ কেটে বসানো হয়েছে কাচের স্কাইলাইট, যা দিয়ে ঘরের ভিতর সরাসরি সূর্যের আলো এসে পড়ে।

অবশ্য এই রূপান্তরের পথটা সহজ ছিল না। পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী কাদা-মাটির মিশ্রণ দিয়ে তৈরি পাথরের দেওয়ালগুলি ছিল বেশ নরম ও দুর্বল। সেগুলির প্রাচীন রূপ ঠিক রেখে মজবুত করাটা ছিল মস্ত চ্যালেঞ্জ। একইভাবে দেড়শ বছরের পুরনো দেবদারু কাঠের তক্তা ও বিমগুলিকে বাড়তি শক্তি দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়েছে।

তার উপর পাহাড়ের আবহাওয়া আর দুর্গম পাহাড়ের বুকে এই দেড়শ বছরের বুড়ো কাঠামোকে নতুন রূপ দেওয়া ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা।

আজ ‘টেরা হিলস’ শুধু একটি থাকার জায়গা বা রিসর্ট নয়। এখানে আধুনিক যুগের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা যেমন আছে (যেমন এটাচড বাথরুম বা সুন্দর আলোর ব্যবস্থা), তেমনই এর প্রতিটি কোণায় জড়িয়ে আছে ইতিহাস।

ব্যক্তিগত বসার জায়গায় (sit-out) আরাম কেদারায় বসে যখন দূরের ধৌলাধার পাহাড়ের বরফ ঢাকা চূড়া আর সবুজ উপত্যকার দিকে চোখ যায়, তখন মনে হয় যেন সময় থমকে গিয়েছে। এককালে যেখানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু হেঁটে বেড়িয়েছিলেন, পাহাড়ের লোককথা আর স্মৃতির চাদরে মোড়া সেই বাংলো আজ নতুন প্রাণ পেয়ে পর্যটকদের স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দুর্গাপুজো ২০২৬: কতটা বদলে গেল বাঙালির শারদোৎসব?

Durga Puja 2026: দুর্গাপুজোর প্রতিমা, খাদ্যাভ্যাস, বইয়ের স্টল, কার্নিভাল ও বিসর্জন ঘিরে ২০২৬ সালে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দুর্গাপুজোর ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সামাজিক অংশগ্রহণের পরিসর কতটা বদলাচ্ছে?

শারদোৎসবের উৎস কি শুধু ধর্মে, নাকি কৃষি ও সমাজের ইতিহাসেও?

Durga Puja history: শারদোৎসব ও দুর্গাপুজোর ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিসভ্যতা, মাতৃকা উপাসনা, তন্ত্র, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির আত্তীকরণ এবং মহিষাসুরের বিকল্প আখ্যান।

বিসর্জনের রাতে শহর নিজের উল্টো ছবি দেখে

Durga Puja Visarjan: ক্যাওড়ামো মানে ক্ষমতার ভাষাকে অপমান করা। ক্যাওড়ামো মানে প্রভুর ভাষায়, প্রভুর বিরুদ্ধে কথা বলা। ক্যাওড়ামো মানে এমন এক শব্দসমাহার, যা অভিধানে ঢোকে না, কিন্তু অলিতে গলিতে বেঁচে থাকে আজীবন।

বিসর্জন একটি বাঙ্ময় নীরব আলো

Durga Puja Visarjan: বিসর্জনের মধ্যে ফেরার ফুরিয়ে আসা লেগে থাকে। কার ফেরা ফুরিয়ে এল? শুধুই কি এক বাঙালি মেয়ের নিজের বাড়ির কাছে ফেরা ফুরিয়ে আসে? শুধুই কি এক বাঙালি মায়ের নিজের বাচ্চাকাচ্চা সমেত বাপের বাড়িতে ফেরার দিন ফুরিয়ে আসা লেগে থাকে তার মধ্যে? নাকি আরও গভীর অনেক কিছুর, কিংবা খুব সাধারণ সমস্ত কিছুর ফেরা ফুরিয়ে আসে বিসর্জনের সঙ্গে?

মণ্ডপ থেকে থিম পুজো: যেভাবে বদলে গেল কলকাতার প্যান্ডেল শিল্প

Durga Puja pandal history: তপতী গুহ ঠাকুরতার প্রবন্ধ 'Abodes of the Goddess'-এর অংশ বিশেষ অনূদিত হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এই প্রবন্ধটি প্রাথমিকভাবে ইয়েল স্কুল অব আর্কিটেকচারের জার্নাল 'পারস্পেক্টা' (Perspecta)-য় প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি দেখতে পারেন: তপতী গুহঠাকুরতা, "অ্যাবোডস অব দ্য গডেস" (Abodes of the Goddess), পারস্পেক্টা ৫২, অক্টোবর ২০১৯: ১৯৫–২০৭।

কারও ফেরা হলো না মায়ের কোলে, কারও চোখের সামনেই চলে গেলেন মা, সপ্তমীর ভিড় কেড়ে নিল চেনা মুখগুলো

Kolkata Durga Puja stampede: যে শিশুটি বাবার হাত ধরে মণ্ডপ দেখতে চেয়েছিল, কিংবা যে তরুণ উৎসবের দিনেও শুধু মায়ের হাসিমুখ দেখতে ভিড়ে সামিল হয়েছিল—মুহূর্তের হুড়োহুড়িতে তাদের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল।

ভূমিকম্পে নদী শুকোল, গ্রাম ছাড়লেন কারিগররা: আজরাখপুর যেভাবে বাঁচিয়ে রাখল ৪০০ বছরের শিল্পকে

Ajrakh block printing: ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকেই শুকিয়ে যেতে থাকে সরন নদী। নিয়মিত বহমান জল ছাড়া কাপড়ে স্বাভাবিক রং ফোটানো কঠিন হয়ে পড়ায় গ্রামবাসীরা কূপ খনন করেছিল। নলকূপের জলে অতিরিক্ত মাত্রায় লোহা থাকার কারণে কাপড়ে রঙের কাঙ্ক্ষিত উজ্জ্বলতা আনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে ফিকে হতে থাকে প্রাকৃতিক ও ভেষজ রঙের এই ঐতিহ্যবাহী আজরাখ শিল্প। জীবিকার সন্ধানে এক সময় গ্রামের বহু মানুষ ভিন্ন পেশা বেছে নিয়ে দেশের নানা প্রান্তে পাড়ি দিতে বাধ্য হন।

শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব ধারার মেলবন্ধন: খড়দহে নিত্যানন্দের কাত্যায়নী পুজো

Khardaha Nityananda Prabhu Durga Puja: নিত্যানন্দের পূজিতা দেবী কাত্যায়নী দশভুজা। ঘোড়ামুখো সিংহ তাঁর বাহন। ত্রিশূল হাতে অসুরকে তিনি হত্যা করছেন। তাঁর ডানে জয়া ও বামে বিজয়া। জয়ার নিচে গণেশ আর বিজয়ার নিচে কার্তিকের অবস্থান।