নিরক্ষর হয়েও আস্ত একটা বইয়ের লেখক, প্রান্তিক মানুষদের লড়াইয়ের আখ্যান 'নিরক্ষরের গল্পগুচ্ছ'

Nirokkhorer Golpoguccho Bangladesh : বইয়ের পাতায় টিপছাপ দিচ্ছেন তাঁরা! যিনি বই লিখেছেন, যিনি লেখক, তিনিই আবার টিপছাপ দিচ্ছেন! কেন?

inscript
৩ মিনিট
নিরক্ষর হয়েও আস্ত একটা বইয়ের লেখক, প্রান্তিক মানুষদের লড়াইয়ের আখ্যান 'নিরক্ষরের গল্পগুচ্ছ'

ছোট বড় যে কোনও বইমেলায় যাওয়া মানে, বিভিন্ন স্টল ঘুরে বইপত্র হাতে নেওয়া। পছন্দের বই কিংবা পত্রিকা দেখলেই সেটি কিনে নেওয়া। আর যদি সেই বইয়ের লেখক আশেপাশেই থাকেন, কিংবা পরিচিত হন, তাহলে আবদার আসে – একটা সই কিন্তু চাইই চাই। সমস্ত জায়গায় ছবিটা একই। ২০২৩-এর বাংলাদেশের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়ও ছবিটা আলাদা কিছু হয়নি। তবুও কোথাও যেন একটা অন্যরকম হাওয়া সেখানে ঘুরে গিয়েছে। এমন এক দৃশ্য, এমন উদ্যোগ, যা সচরাচর চোখে পড়ে না আমাদের।

বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত প্রকাশনী সংস্থা হল বিদ্যানন্দ প্রকাশনা। সেখানেই হাজির হয়েছেন দুই বৃদ্ধ। ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি, চুলে পেকে গিয়েছে অনেকটা, চামড়াতেও ভাঁজ পড়েছে। নাম আশুতোষ চক্রবর্তী ও জয়নাল উদ্দিন। তাঁদের বাড়ি ফেনিতে। তাঁরা একটি গল্প সংকলনের লেখকও বটে। মানুষজন আসছেন, সেই বই কিনছেন, সই চাইছেন। তাঁরা সই দিচ্ছেনও; কিন্তু কলম নয়, চাইছেন স্ট্যাম্প প্যাড। বুড়ো আঙুল দিয়ে বইয়ের পাতায় টিপছাপ দিচ্ছেন তাঁরা! যিনি বই লিখেছেন, যিনি লেখক, তিনিই আবার টিপছাপ দিচ্ছেন! কেন?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলাদেশের কালীমূর্তি চুরি হয়ে রাজস্থানের দুর্গে! যেভাবে পুজো হয় যশোরেশ্বরী কালীর

Jeshoreshwari Kali Temple Bangladesh: মূর্তির অবয়ব পুরোটাই আবৃত মখমলে। মাথার ওপর টকটকে লাল রঙের চাঁদোয়া ও সোনার মুকুট। কণ্ঠে রক্তজবার মালা ও নানা অলংকার। লোলজিহ্বা দেবীর ভীষণা মূর্তি।

এখানেই লুকিয়ে আছে সেই উদ্যোগের প্রাণভোমরা। লুকিয়ে আছে সমাজের প্রান্তিক মানুষের গল্প। আর সেখান থেকেই উঠে এসেছে এই গল্প সংকলনটি। বইয়ের নাম ‘নিরক্ষরের গল্পগুচ্ছ’। আশুতোষ, জয়নালের মতো ১২-১৩ জন প্রান্তিক মানুষের গল্প উঠে এসেছে এই বইয়ে। এবং আসল ব্যাপার হল, এঁরা প্রত্যেকেই অক্ষরজ্ঞানহীন। পরিস্থিতির চাপে, জীবনের জাঁতাকলে পড়ে এই মানুষগুলির আর পড়াশোনা হয়নি। অক্ষর পরিচয়ও হয়নি। সেই মানুষগুলিই এই বইয়ের ‘লেখক’। তবে এখানেই থেমে নেই। বইয়ের প্রচ্ছদেও রয়েছে সেই ভাবনার ছোঁয়া। প্রচ্ছদে বড় একটি আঙুলের ছাপ, সেটি করেছেন এক রিকশাচালক, নাম সেলিম ভূঁইয়া। তাঁরও অক্ষর পরিচয় নেই। ‘নিরক্ষরের গল্পগুচ্ছ’ নামাঙ্কন করেছেন এমতাজুল হোক। ঢাকায় একটি অফিসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এমতাজুল পড়াশোনা করতে না পারলেও কষ্ট করে দেখে দেখে একটু লিখতে পারেন। তাঁর সেই লেখাতেই আরও উজ্জ্বল হয়েছে বইটি।

কিন্তু কেন এই উদ্যোগ? বিদ্যানন্দ প্রকাশনা ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন প্রথম থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে রেখেছে। এই প্রকাশনাই ম্রো ভাষার প্রথম বই বের করেছিল। সামাজিক কাজের জন্য বাংলাদেশের ‘একুশে পদক’ সম্মানও পেয়েছে এই ফাউন্ডেশন। তাদের ভাবনা ছিল, বাংলাদেশ তো বটেই, এই উপমহাদেশের একটি বিরাট বড় অংশের মানুষের কাছে এখনও শিক্ষার আলো পৌঁছয়নি। তাঁদের জীবনযুদ্ধ অনেকের থেকে আলাদা। কষ্ট করে বেঁচে থাকতে হয় সেই প্রান্তিক মানুষদের। কিন্তু ভাষা তো তাঁদেরও। বাংলা ভাসাত তাঁদের মুখেও শব্দ ফুটিয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা দিবস মানে তো তাঁদেরও উদযাপন। তাঁরা কেন পিছিয়ে থাকবেন?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্টল নয় টেবিল, লিটল ম্যাগাজিনের স্পর্ধা আজও আকাশছোঁয়া

Bengali Little Magazine Literature Movement : ন্যাপথালিন মুড়িয়ে, ঘর সাজানোর মাধ্যম নয় এটি। বরং লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিটি ছত্রেই লেগে রয়েছে রক্ত, চিৎকার আর প্রতিবাদ।

সেখান থেকেই এই বিশেষ বইয়ের কাজ শুরু। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের তরফ থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে এই মানুষগুলোর কথা শুনেছে। তাঁদের গল্প শুনেছেন। সেই সব গল্প রেকর্ড করে এনে লিখেছেন তাঁরা। অবশ্য ওই ‘নিরক্ষর’ মানুষগুলোর নামেই সেজে উঠেছে বইটি। তাঁরাই লেখক, তাঁরাই গল্পকথক। তারপর সেসবই বই আকারে সামনে এসেছে।

একুশের বইমেলায় হাজির হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে যায় জয়নাল উদ্দিন, আশুতোষ চক্রবর্তীদের। প্রথমবার ঢাকায় আসা তাঁদের। এভাবে বই নিয়ে আস্ত মেলা হতে পারে, সেটা তাঁরা কল্পনাও করতে পারেননি। লেখক কপিও পেয়েছেন, সঙ্গে রয়্যালটির বন্দোবস্তও আছে। কিন্তু এই লেখাগুলো পড়বেন কী করে? একগাল হেসে উত্তর দেন জয়নাল, আশুতোষ। বাড়িতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। সেই নাতি-নাতনিদের মুখ থেকেই শুনবেন এই গল্প। এভাবেই জয় হয় বাংলা ভাষার। শিক্ষার আলো আর কত দেরিতে এই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছবে? ‘নিরক্ষরের গল্পগুচ্ছ’ সেই প্রশ্নও সামনে রাখছে

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।