প্রধানমন্ত্রী ভাষণ ঘিরে বিতর্ক: ৭০০-র বেশি নাগরিকের নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ
PM Modi speech controversy: প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে ভাষণ কি আদর্শ আচরণবিধি ভঙ্গ করেছে? সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে কি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে? ৭০০-র বেশি নাগরিক কেন নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হলেন? বিরোধীদের অভিযোগ কতটা ভিত্তিসম্পন্ন?
প্রধানমন্ত্রীের জাতির উদ্দেশে ভাষণ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হলো। ১৮ এপ্রিলের ভাষণকে কেন্দ্র করে ৭০০-র বেশি নাগরিক যৌথভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আদর্শ আচরণবিধি বা মডেল কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গ করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা সরকারি ভাষণ হিসেবে দেখানো হলেও তার মধ্যে বিরোধী দলগুলিকে সরাসরি আক্রমণ করা হয়। বিশেষ করে মহিলাদের সংরক্ষণ বিল, লোকসভা আসন বৃদ্ধি এবং ডিলিমিটেশন ইস্যুতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে কড়া ভাষা ব্যবহার করা হয়। অভিযোগকারীদের মতে, এই ভাষণ কার্যত নির্বাচনী প্রচারের মতো ছিল।
এই ভাষণটি সম্প্রচারিত হয়েছিল সরকারি অর্থে চলা মাধ্যম যেমন দূরদর্শন, অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং সংসদ টিভি-তে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নির্বাচনের সময় সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া আদর্শ আচরণবিধির পরিপন্থী। কারণ, এতে ক্ষমতাসীন দল অন্যদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পায়।
নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি পদমর্যাদা এবং সরকারি সম্প্রচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচার করেছেন। এই ধরনের কাজ নির্বাচনী লড়াইয়ে সমান সুযোগের নীতি নষ্ট করে। অভিযোগকারীরা আরও বলেন, সরকারি খরচে কোনো দলীয় প্রচার চালানো হলে তা সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
PM Modi Speech on Women Reservation Bill: মহিলাদের সংরক্ষণ নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণে কেন ৫৯ বার কংগ্রেসের নাম নিলেন প্রধানমন্ত্রী? তবে কি নারী সংরক্ষণ ও ডিলিমিটেশনকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়ে গেল দেশে?
চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধির কয়েকটি নির্দিষ্ট ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দল সরকারি গাড়ি, কর্মী, সম্প্রচারমাধ্যম বা সরকারি পদমর্যাদা ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার করতে পারে না। মন্ত্রীদের সরকারি সফর এবং রাজনৈতিক প্রচারকে আলাদা রাখতে হবে। সরকারি অর্থে বিজ্ঞাপন বা রাজনৈতিক প্রচারও এড়াতে হবে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধানমন্ত্রীের এই ভাষণ সেই সব নিয়মের পরিপন্থী।
এই অভিযোগে শুধু সাধারণ নাগরিকরাই নন, বিরোধী দলগুলিও সরব হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই)-এর সাংসদ পি. সন্তোষ কুমার নির্বাচন কমিশনের কাছে আলাদা করে অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ছিল এবং তা ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা নির্বাচনী নিয়মের গুরুতর লঙ্ঘন।
একইভাবে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী)-ও নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. বেবি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের বিষয়বস্তু, ভাষা এবং উপস্থাপনা কোনো ভাবেই সরকারি প্রশাসনিক বার্তা হিসেবে ধরা যায় না। তাঁর মতে, এটি ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক বক্তব্য, যেখানে বিরোধী দলগুলিকে নাম করে আক্রমণ করা হয়েছে এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বারবার কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, দ্রাবিড় মুনেত্র কড়গম এবং সমাজবাদী পার্টির নাম উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এই দলগুলি সংসদে মহিলাদের অধিকার রুখে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী 'ফিমেল ফিটিসাইড' বা 'নারী অধিকার হত্যার' মতো শব্দও ব্যবহার করেন, যা নিয়ে বিরোধীরা আরও ক্ষুব্ধ।
অভিযোগকারীরা নির্বাচন কমিশনের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন। প্রথমত, পুরো ভাষণের বিষয়বস্তু খতিয়ে দেখে তদন্ত শুরু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যদি দেখা যায় যে ভাষণটি কমিশনের অনুমতি ছাড়া সম্প্রচারিত হয়েছে, তাহলে সেটি সরকারি নথি, ওয়েবসাইট এবং সম্প্রচারমাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। আর যদি কমিশনের অনুমতি নিয়ে এই ভাষণ সম্প্রচার করা হয়ে থাকে, তাহলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলিকেও সমান সময় দিতে হবে নিজেদের বক্তব্য রাখার জন্য।
এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং কোনো পদক্ষেপ করে কি না। কারণ, ভোটের আবহে সরকারি পদ ও সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে একসঙ্গে ৭০০-র বেশি নাগরিক, বিরোধী দল এবং প্রাক্তন আমলাদের সরব হওয়া এই ঘটনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।






