জাতির উদ্দেশে ভাষণে ৫৯ বার কংগ্রেসের নাম, মোদিকে নিশানা বিরোধীদের

PM Modi Speech on Women Reservation Bill: মহিলাদের সংরক্ষণ নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণে কেন ৫৯ বার কংগ্রেসের নাম নিলেন প্রধানমন্ত্রী? তবে কি নারী সংরক্ষণ ও ডিলিমিটেশনকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়ে গেল দেশে?

inscript
৩ মিনিট
জাতির উদ্দেশে ভাষণে ৫৯ বার কংগ্রেসের নাম, মোদিকে নিশানা বিরোধীদের

লোকসভায় নারী সংরক্ষণ ও ডিলিমিটেশন ঘিরে সরকারের প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনী বিল পাস না হওয়ার পর শনিবার রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই ভাষণের পরেই শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে নিরপেক্ষ বার্তা দেওয়ার বদলে ভাষণকে রাজনৈতিক আক্রমণের মঞ্চে পরিণত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বারবার উঠে আসে নারী সংরক্ষণ বিলের প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেন, বিরোধীরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের বিরোধিতা করেছে। তাঁর কথায়, বিরোধীরা নারী শক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, বিষয়টি এত সরল নয়।

সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে সরাসরি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে নারী সংরক্ষণ এবং ডিলিমিটেশন—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, বিরোধীরা নারী সংরক্ষণের বিরোধিতা করেনি। বরং ২০২৩ সালের আইনে যে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, সেটি এখনই কার্যকর করা হোক—এটাই তারা চায়। আপত্তি ছিল মূলত ডিলিমিটেশন বা লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে।

বিরোধীদের বক্তব্য, সরকার নারী সংরক্ষণের আবেগকে সামনে রেখে এমন একটি ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চাইছে, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ভাবে বিজেপির সুবিধা করবে। কারণ জনসংখ্যার ভিত্তিতে যদি নতুন করে লোকসভা আসন ভাগ হয়, তাহলে উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজ্যগুলিতে আসন বাড়বে। এই অঞ্চলগুলিতে বিজেপির শক্তি বেশি। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিরোধীরা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ডিলিমিটেশন: একটি আসনও কমবে না, অমিত শাহের দাবি কেন মানছে না দক্ষিণ ভারত?

Delimitation: দক্ষিণের রাজ্যগুলির লোকসভা আসন কি সত্যিই কমবে না? কেন্দ্রের এই আশ্বাস কি উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা কমাতে পারবে? ডিলিমিটেশন, জনসংখ্যা এবং আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে কেন বাড়ছে রাজনৈতিক বিতর্ক?

খড়্গের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে কংগ্রেসের নাম ৫৯ বার উল্লেখ করেছেন, কিন্তু মহিলাদের প্রসঙ্গ তুলেছেন খুব কম। তাঁর মতে, এতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে সরকারের আসল লক্ষ্য নারী সংরক্ষণ নয়, বিরোধীদের আক্রমণ করা। তিনি আরও বলেন,

নারী সংরক্ষণ বিল ২০২৩ সালেই পাস হয়েছে। সরকার চাইলে বর্তমান ৫৪৩টি লোকসভা আসনের মধ্যেই ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ চালু করতে পারে।

এই বিতর্কের মধ্যে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে। বর্তমানে বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন চলছে। তাই নির্বাচনী আচরণবিধি বা মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট কার্যকর রয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এমন সময়ে প্রধানমন্ত্রী সরকারি ভাষণকে রাজনৈতিক প্রচারের জন্য ব্যবহার করেছেন। খড়্গে এটিকে গণতন্ত্র এবং সংবিধানের পরিপন্থী বলেও আখ্যা দিয়েছেন।

কংগ্রেসের কমিউনিকেশন ইন-চার্জ জয়রাম রমেশের বক্তব্য আরও কড়া। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণের যে মর্যাদা থাকে, তা নষ্ট করেছেন। সাধারণত এই ধরনের ভাষণ জাতীয় ঐক্য, সংকট বা বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে হয়। সেখানে রাজনৈতিক আক্রমণ, বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং নির্বাচনী কোনো রকম উদ্দেশ্য আনা উচিত নয়। তিনি এই ভাষণকে 'জাতীয় ভাষণ' নয়, 'দুর্দশার ভাষণ' বলেও কটাক্ষ করেছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে ২০২৯-এর রাজনৈতিক অঙ্ক কষছে কেন্দ্র?

Delimitation: ডিলিমিটেশন ও আসন বৃদ্ধির প্রস্তাবে কেন বাড়ছে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা? মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোই কি আসল লক্ষ্য, নাকি এর আড়ালে রয়েছে বড় রাজনৈতিক হিসাব?

কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও অভিযোগ করেন, নারী সংরক্ষণকে সামনে রেখে আসলে সরকার ক্ষমতা ধরে রাখার একটি বড় রাজনৈতিক পরিকল্পনা করছিল। তাঁর মতে, বিল পাস হলে নিজেদের সুবিধামতো আসন পুনর্বিন্যাস করা যেত, আর না হলে বিরোধীদের নারী বিরোধী বলে প্রচার করা যেত। তিনি বলেন,

মহিলাদের সামনে রেখে রাজনৈতিক লাভ তুলতে চেয়েছিল সরকার, কিন্তু সেই কৌশল সফল হয়নি।

তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের বক্তব্যও একই রকম। তিনি বলেন, মহিলাদের ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে ডিলিমিটেশন বিল পাস করানোর চেষ্টা হয়েছে। মহুয়া মৈত্রেরও দাবি, নারী সংরক্ষণ আইন আগেই পাস হয়েছে। এখনই তা কার্যকর করতে সরকারকে কেউ বাধা দিচ্ছে না।

কেরলের কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার নেতা জন ব্রিট্টাস বলেন, কোনো প্রধানমন্ত্রী এর আগে জাতির উদ্দেশে ভাষণ ব্যবহার করে এভাবে বিরোধীদের আক্রমণ করেননি। তাঁর মতে, বিরোধীদের ‘নারী বিরোধী’ বা ‘ভ্রূণহত্যার সমর্থক’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা সংসদীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই ভাষণ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। বহু মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, নারী সংরক্ষণ যদি সত্যিই সরকারের অগ্রাধিকার হয়, তাহলে ২০২৩ সালে পাস হওয়া আইন এখনও কার্যকর করা হলো না কেন। আবার অনেকে মনে করছেন, নারী সংরক্ষণ ও ডিলিমিটেশনকে একসঙ্গে বেঁধে ফেলা ছিল সরকারের রাজনৈতিক কৌশল। বিভিন্ন অনলাইন আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, বিরোধীদের একটি বড় অংশ মনে করছে, সরকার আসলে নারী সংরক্ষণের চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধার হিসেবটাই বেশি করছে।

নারী সংরক্ষণ নিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিভাজন তৈরি হয়েছে। একদিকে বিজেপি দাবি করছে তারা মহিলাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে চায়। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, সেই দাবির আড়ালে আসলে রয়েছে ডিলিমিটেশনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দেওয়ার চেষ্টা। আগামী দিনে এই বিতর্ক আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।