'সিলসিলা' থেকে 'ডর', তাঁর সংগীতের মূর্চ্ছনায় বারবার মজেছে দেশবাসী

এই রেশ, সংগীতের এই অনাবিল মূর্চ্ছনা যে কোনও বাস্তবের সীমানা অনায়াসে পেরিয়ে যায়। তাঁর সৃষ্ট এই অগণিত ঢেউয়ের মধ্যেই পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা থেকে যাবেন চিরকাল। মানুষের মনের গহিনে।

Sindhu Som
৩ মিনিট
'সিলসিলা' থেকে 'ডর', তাঁর সংগীতের মূর্চ্ছনায় বারবার মজেছে দেশবাসী

চলে গেলেন বিখ্যাত সন্তুরবাদক এবং সংগীতজ্ঞ পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা। মারা যাওয়ার সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। সংস্কৃতির জগতে একের পর এক ইন্দ্রপতনের সাক্ষী এই বছর। খবরে শোকগ্রস্ত সমস্ত ভারত। ভারতের সংস্কৃতিপ্রেমীদের মনে আরেকবার প্রিয় শিল্পী হারানোর শোকচ্ছায়া নামল। এই ঘটনায় শোকপ্রকাশ করে ট্যুইট করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। লিখেছেন, “পণ্ডিত শিবকুমার শর্মাকে হারানো ভারতের সাংস্কৃতিক জগতের অপূরণীয় ক্ষতি।” তাঁর সঙ্গে শিবকুমারের বিভিন্ন সাক্ষাৎ স্মরণ করেছেন মোদি। শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। “আন্তর্জাতিক মানের ভারতীয় সঙ্গীত শিল্পী, প্রকৃষ্ট সন্তুর বাদক পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার প্রয়াণ খুবই দুঃখজনক।" পারিবারিক সূত্রে খবর কিডনির অসুখে ভুগছিলেন শিবকুমার। গত ছ'মাসের লড়াই এবার ফুরোল। ডায়ালিসিস চলছিল শেষের দিকে। ১০ মে সকালেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর।

শিবকুমারের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৩ জানুয়ারি উত্তর ভারতের জম্মুতে। জন্মসূত্রেই এক সাংগীতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা শিবকুমারের। বাবা ছিলেন বেনারস ঘরানার বিখ্যাত সংগীতশিল্পী উমা দত্ত শর্মা। শিবকুমারের মাতৃভাষা দোগরি। শৈশব থেকেই বাবা শিবকুমারকে সংগীতে পারদর্শী করে তুলতে চেয়েছিলেন। মাত্র বছরপাঁচেক বয়স থেকেই তিনি শিবকুমারকে তবলা ও শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম দিতে শুরু করেন। ১৩ বছর বয়সে প্রথম শুরু হয় সন্তুর শেখা। ওই বছরই (১৯৫৫) মুম্বইয়ের মঞ্চে একটি অনুষ্ঠানে সন্তুর বাজান শিবকুমার। কাশ্মীরের বাদ্যযন্ত্র এই সন্তুর। ভারতে এর তেমন প্রচলন ছিল না। জনপ্রিয়তাও ছিল না। উমা শর্মা এই যন্ত্রের ব্যবহার পুত্রের মাধ্যমে গোটা উপমহাদেশে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বলা যায়, সে বিষয়ে অত্যন্ত সফলই হয়েছেন শিবকুমার। সন্তুরের জনপ্রিয়তা সৃষ্টিতে তাঁর অবদান হয়ে উঠেছে চিরস্মরণীয়। সেতার বা সরোদের পাশাপাশি সন্তুরের প্রতিও আকর্ষণ বেড়েছে মানুষের।

শিবকুমারের পরিবার বলতে স্ত্রী মনোরমা ও দুই সন্তান-সন্ততি। ছেলে রাহুলও বাবার কাছ থেকেই সন্তুরের প্রতি তীব্র আবেগ পেয়েছে। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই তেরো বছর বয়স থেকেই সন্তুর শিখতে শুরু করেছিল রাহুল। ১৯৯৬ নাগাদ পিতা-পুত্র একই সঙ্গে বাজালেন মঞ্চে। সে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। ১৯৯৯ সালে একটি সাক্ষাৎকারে এ-বিষয়ে শিবকুমার জানান, রাহুলকে নিজের শিষ্য করার অন্যতম কারণ, ও ভগবানের আশীর্বাদ পেয়েছে।

শিবকুমার সন্তুরের জনপ্রিয়তা তৈরির অন্যতম কান্ডারী। শান্তারামের ছবি ‘ঝনক ঝনক পায়েল বাজে’-র একটি বিশেষ দৃশ্যের আবহসংগীত সন্তুরে রচনা করেন শিবকুমার। এরপরে ১৯৬০-এ প্রথম নিজস্ব অ্যালবাম। ১৯৬৭ নাগাদ বংশীবাদক হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া ও গিটারবাদক বৃজভূষণ কাবরার সঙ্গে ‘কল অফ দ্য ভ্যালি' নামে একটি কনসেপ্ট অ্যালবাম করেন। এই অ্যালবামটিকে ভারতীয় ধ্রুপদ সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় অ্যালবামগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। হরিপ্রসাদের সঙ্গে এই তাঁর জুটি শুরু। ১৯৮০ সালে ‘সিলসিলা’ থেকে শুরু করে বহু জনপ্রিয় ছবির জন্য সংগীত রচনা করেছেন দু'জনে। এঁদেরকে লোকে সেসময় ‘হরিহর’ (শিভ-হরি) যুগল বলেই চিনত। একে একে 'ফাসলে' (১৯৮৫), 'চাঁদনি' (১৯৮৯), 'লমহে' (১৯৯১) এবং 'ডর' (১৯৯৩)-এর মতো অসাধারণ সব জনপ্রিয় ছবির জনপ্রিয় গান তৈরি করেছেন দু'জনে। ১৯৮২ সালে জাকির হুসেনের সঙ্গে মঞ্চে অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। শুধু ভারতে নয়, বিশ্বের দরবারে সন্তুরকে জনপ্রিয় করে তোলেন শিবকুমার। দেশে-বিদেশে নানা পুরস্কার, নানা সম্মানে ভূষিত হয়েছেন বারবার। ১৯৮৫ সালে আমেরিকা বাল্টিমোরের শহরে তাঁকে আনুষ্ঠানিক নাগরিকত্বে পুরস্কৃত করে। ১৯৮৬ সালে পেয়েছেন সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার। ১৯৯১ সালে তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। ২০০১ সালে, ঠিক তার এক দশক পরে পেয়েছিলেন পদ্মবিভূষণ খেতাব। এছাড়া তাঁর ‘কল অব দ্য ভ্যালি’, ‘চাঁদনি’ এবং ‘সিলসিলা’-র সংগীতের জন্য পেয়েছিলেন প্ল‍্যাটিনাম ডিস্ক। ‘ফাওলে’ তাঁকে এনে দিয়েছিল গোল্ড ডিস্ক। পেয়েছেন পণ্ডিত চতুরলাল এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ডও।

কয়েক প্রজন্মকে অন্য ধরনের সংগীতের স্বাদ দেওয়া মানুষটি আজ চলে গেলেন। সন্তুর এত মিষ্টি একটি বাদ্যযন্ত্র, যে ধ্রুপদ সংগীতের সম্যক জ্ঞান না থাকা মানুষও একে উপভোগ করতে পারেন যথেষ্ট। তাই শুধু ধ্রুপদ নয়, এর বাণিজ্যিক ব্যবহারও সম্ভব। এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই যন্ত্রটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন পণ্ডিত শিবকুমার। তাঁর যাবতীয় উত্তরাধিকার নিয়ে যেমন রাহুল রইলেন, পরবর্তী প্রজন্মকে সন্তুরের স্বাদ দেওয়ার জন্য, আবার নতুন অজস্র সন্তুরবাদক তৈরি করে গেলেন শিবকুমার। যাঁরা কাশ্মীরের এই ঐতিহ্য নিজেদের রক্তে বহন করবে পণ্ডিতের সঙ্গে কোনও রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই। তাঁর ভূপালির রেশ এখনও বেজে বেজে চলেছে কোনও এক সিল্যুয়েট নারীর পায়েলে। এই রেশ, সংগীতের এই অনাবিল মূর্চ্ছনা যে কোনও বাস্তবের সীমানা অনায়াসে পেরিয়ে যায়। তাঁর সৃষ্ট এই অগণিত ঢেউয়ের মধ্যেই পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা থেকে যাবেন চিরকাল। মানুষের মনের গহিনে।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।