মোদি-মেলোনি ম্যাজিকে মেলোডির বিক্রি ঠিক কতটা বাড়ল?
শুধু টাকার অঙ্কেই নয়, পরিমাণেও ভারতের টফি রপ্তানি ৬,৬৫২ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৭,৩৫৭ মেট্রিক টন (প্রায় ১০.৬% বৃদ্ধি)। আগে যেখানে ভারতের তৈরি টফি ও ক্যান্ডি মাত্র ৫০টি দেশে রপ্তানি হতো, বর্তমানে তা বিশ্বের ৭৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
এক প্যাকেট টফিতে কূটনীতি আর বাণিজ্য দুটোই মিষ্টি হয়ে গেল!
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আর ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনির মিষ্টি মুহূর্তের কথাই মাথায় এল, তাই তো?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল দুনিয়ায় মাঝেমধ্যে এমন কিছু হালকা, মিষ্টি মুহূর্ত তৈরি হয় যা রাতারাতি ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইতালি সফরে আলোচনার কেন্দ্রে কোনো জটিল সামরিক চুক্তি বা কূটনৈতিক করমর্দন নেই; বরং পুরো বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছে ভারতের এক অতি পরিচিত, সাধারণ চকোলেট— ‘পার্লে মেলোডি’ (Parle Melody)।
রোমের মঞ্চে ‘মেলোডি’ ম্যাজিক
পাঁচ দেশ সফরের শেষ পর্বে গত ১৯ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পৌঁছন ইতালির রাজধানী রোমে। সেখানে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির আমন্ত্রণে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে 'বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বে' (Special Strategic Partnership) উন্নীত করার লক্ষ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সমস্ত প্রোটোকল আর আনুষ্ঠানিকতার গাম্ভীর্য ছাপিয়ে এক অনন্য মুহূর্ত তৈরি হয়, যখন প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর ইতালীয় সমকক্ষ জর্জিয়া মেলোনিকে উপহার হিসেবে এক প্যাকেট ভারতীয় ‘মেলোডি’ টফি তুলে দেন।
উপহারটি পেয়ে মেলোনি এতটাই আপ্লুত হন যে, ২০ মে তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করেন। সেই ভিডিওতে বেশ হাসিমুখে ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়:
Prime Minister Modi brought us a gift… a very, very good toffee — Melody!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ট্রিনকাসের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় এবং উজ্জ্বল দিনটি ছিল ১৯৬৯ সালের ১ অক্টোবর। সেই দিন এই মঞ্চে প্রথমবার পা রাখেন এক সাধারণ দক্ষিণ ভারতীয় তরুণী — ঊষা আইয়ার (বিয়ের পর যিনি হন ঊষা উথুপ)।
ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন— “Thank you for the gift”। এই ছোট্ট ভিডিওটি পোস্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নেটদুনিয়ায় ঝড় ওঠে। ২০২৩ সালের দুবাই ‘কপ২৮’ (COP28) সম্মেলনে মেলোনির নিজের মুখে বলা মোদি ও মেলোনির নামের মেলবন্ধনে তৈরি বিখ্যাত #Melodi হ্যাশট্যাগটি আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক নম্বরে ট্রেন্ড করতে শুরু করে। নেটিজেনরা রসিকতা করে বলতে শুরু করেন,
"এক প্যাকেট টফিতে কূটনীতি আর বাণিজ্য দুটোই মিষ্টি হয়ে গেল!"
রাতারাতি ‘স্টক আউট’ ও উৎপাদনের হিড়িক
প্রধানমন্ত্রীর এই ‘টফি কূটনীতি’ বা সফট ডিপ্লোম্যাসির প্রভাব শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেওয়ালেই আটকে থাকেনি, এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের বাজারেও। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে এক অদ্ভুত উন্মাদনা তৈরি হয়। মধ্যবিত্তের নস্টালজিয়া আর সাম্প্রতিক ট্রেন্ডের জোয়ারে ভেসে Blinkit, Zepto এবং Amazon-এর মতো বড় বড় অনলাইন ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলিতে রাতারাতি ‘মেলোডি’ টফি শেষ হয়ে যায়। বহু এলাকায় তৈরি হয় সাময়িক ঘাটতি।
বাজারের এই অপ্রত্যাশিত ও বিপুল চাহিদা দেখে পার্লে প্রোডাক্টস (Parle Products) কোম্পানিও কালবিলম্ব করেনি। কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট ময়ঙ্ক শাহ জানান, মোদি-মেলোনি মুহূর্তের পর থেকেই দেশ এবং বিদেশ— উভয় বাজার থেকেই মেলোডির চাহিদা আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোম্পানি জরুরি ভিত্তিতে তাদের কারখানাগুলিতে মেলোডি টফির উৎপাদন এক ধাক্কায় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে দ্রুত স্টক পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পার্লে কর্তৃপক্ষের মতে, কোম্পানির প্রায় ৪৩ বছরের ইতিহাসে (১৯৮৩ সালে বাজারে আসার পর থেকে) এটিই সবচেয়ে বড় এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া ‘ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইন’।
ভারতীয় টফি রপ্তানির খতিয়ান
এই ভাইরাল ঘটনার রেশ ধরেই গত ২১ মে (বুধবার) ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের কনফেকশনারি বা টফি রপ্তানির একটি খতিয়ান তুলে ধরেন। মেলোনি ও মোদির মেলোডি-যোগসূত্রকে চমৎকার শব্দবন্ধে মিলিয়ে তিনি লেখেন:
“India’s TOFFEE TALE would surely be melody to the ears! Exports have grown nearly 166% since 2013-14.”
বাণিজ্য মন্ত্রকের দেওয়া সরকারি তথ্য অনুসারে, গত ১২ বছরে ভারতের টফি (যার মধ্যে টফি, ক্যারামেল ও অনুরূপ মিষ্টি জাতীয় পণ্য অন্তর্ভুক্ত) রপ্তানি খাতে এক অবিশ্বাস্য জোয়ার এসেছে। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে যেখানে ভারতের সামগ্রিক টফি রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৪৯.৬৮ কোটি টাকা, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে তা ১৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছেছে ১৩২ কোটি টাকায়। ডলারে হিসাব করলে ২০১৩-১৪ সালের ৮.১৭ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বর্তমান অর্থ বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৪১ থেকে ১৫.১৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ডলারে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৬৪%। শুধু টাকার অঙ্কেই নয়, পরিমাণেও ভারতের টফি রপ্তানি ৬,৬৫২ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৭,৩৫৭ মেট্রিক টন (প্রায় ১০.৬% বৃদ্ধি)।
আগে যেখানে ভারতের তৈরি টফি ও ক্যান্ডি মাত্র ৫০টি দেশে রপ্তানি হতো, বর্তমানে তা বিশ্বের ৭৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্ববাজারে ভারতীয় স্বাদের দাপট
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতীয় টফির মূল্য বা দামের গ্রোথ পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। এর মূল কারণ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ভারতীয় টফির দাম গত ১২ বছরে প্রায় ২.৪ গুণ বেড়েছে। অর্থাৎ, ভারত এখন শুধু সস্তা পণ্য হিসেবে নয়, বরং উন্নত মান, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছে।
বর্তমানে এই রপ্তানি বাজারের সিংহভাগ চালিত হচ্ছে পার্লে-র হাত ধরে। সৌদি আরব (সবচেয়ে বড় ক্রেতা), সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি এবং বেনিন, নাইজেরিয়া, ঘানার মতো আফ্রিকার দেশগুলিতে ভারতীয় টফির তুমুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। মেলোডি ছাড়াও পার্লে-র Kismi (এলাচি ফ্লেভার), Mango Bite, Poppins, কিংবা Eclairs-এর মতো ব্র্যান্ডগুলি বিশ্ববাজারে ভারতের প্রসেসড ফুড ও FMCG খাতের নাম উজ্জ্বল করছে।
রোমের মাটিতে মেলোডি চকলেটের এই মিষ্টি আদান-প্রদান প্রমাণ করে দিল যে, আধুনিক যুগে কূটনীতি আর শুধু নীতিগত ফাইলের বদ্ধ ঘরে সীমাবদ্ধ নেই। ১ টাকার একটি ভারতীয় চকোলেট কীভাবে বিশ্বমঞ্চে দেশের ব্যবসার ব্র্যান্ডিং করে তুলতে পারে, এই ঘটনা তারই এক আদর্শ উদাহরণ। মোদি-মেলোনির এই রসাত্মক ও আন্তরিক মুহূর্তটি ইতালির সঙ্গে ভারতের ২০ বিলিয়ন ইউরোর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রাকে তো সহজ করবেই, পাশাপাশি বিশ্ববাজারে ভারতীয় ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতাকেও আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।








