কবি রাহুল পুরকায়স্থ বাড়িতে ফিরলেই হয়ে যেতেন এক বিরাট শিশু!

Rahul Purkayastha : পুপলু! আমাদের এই নতুন বাড়ির মায়াবি শূন্যতায় তুমি যে অপেক্ষা রচনা করলে... এই কান্না আমি কোথায় জমিয়ে রাখব?

Barnali Sengupta
৩ মিনিট
কবি রাহুল পুরকায়স্থ বাড়িতে ফিরলেই হয়ে যেতেন এক বিরাট শিশু!

কবি রাহুল পুরকায়স্থ। আমাদের সবার রাহুলদা। যে রাহুলদা এক জায়গায় বলেছিল, 'গ্রহকেন্দ্র গৃহ কেন্দ্র ঘুম-ঘুম ঘোরে/ প্রতি জন্ম মৃত্যু নেয়, প্রতি জন্ম মরে'— সেই রাহুলদাই বাড়িতে ছোট্ট পুপলু, এক বিরাট শিশু। ঘুম থেকে উঠতেই যেভাবে কোনো শিশু তার মা-কে খোঁজে, সেইভাবেই ওই পুপলু আঁকড়ে থাকত তার পরিবারকে।

কুপির আলোয়

সুদূরের হাটে এক

সামান্য হাটুরে বটে আমি

ঘুমের দেয়াল বেয়ে নামি

পুরাতন কবিতা খাতায়

পোকা কাটা পসরা বানাই

দিন শেষে না বিকোনো পণ্য নিয়ে

ঘরে ফিরে যাই

রাঁধি বাড়ি খাই।।

এই কবিতা লেখেন যে রাহুল পুরকায়স্থ, সেই রাহুলদারই বাড়িতে কত ছেলেমানুষি, কত যে আবদার, বায়না, খুনসুটি, অভিমান! রবিবারের সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাঁর প্রথম প্রশ্ন, আজকের স্পেশাল মেনু কী? প্রতি রবিবার কিছু বিশেষ হতেই হবে, নয়তো সে অভিমানে ভরপুর। একটা আবদার শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে যেত পরের আবদার। যেমন, লেখাটা শুরু করব, কয়েকটা ভালো পেন কিনে দাও না? কিংবা, ‘ওই বইটা একটু খুঁজে দাও!’, ‘নখ কেটে দাও...’, 'পিঠ চুলকে দাও’— এমন কত কী! সব সময় কিছু-না-কিছু চলতেই থাকত। আরেকদিন পুপলু আবদার করল, ‘আজ কিন্তু চুপিচুপি আইসক্রিম খাব দু-জন!’ একদিন তো ডিমের ডেভিল খেয়ে মহা খুশি! পুপলু রচনা করল ট্যাগ লাইন:

আমরা দুটি দামড়া

করি না কামড়ি-কামড়া

কবি রাহুলদা, সাংবাদিক রাহুলদা, গভীর অনুভবের রাহুলদার যাপন ছিল কখনো-কখনো এলোমেলো। পারিবারিক শিশু রাহুলদাকে এ-বিষয়ে বোঝানো হল, ‘পুপলু, ওষুধের পাতা থেকে ওষুধগুলো এমন এলোমেলো ভাবে খাও কেন? এর থেকেই বোঝা যায় তুমি অরগানাইজড নও!’ কিছুদিন এই কথা শোনার পর স্বগতোক্তি করতে-করতে ওষুধ খেত, বলত, ‘রাহুল, তুমি অরগানাইজড নও, ওষুধ খাওয়া দেখেই লোকজন সেটা বুঝে যাচ্ছে! পরপর ওষুধ খাও, পরপর...’ কিছুদিন খুব ঘটা করে মেন্টেন করার পর, আবার যে কে সেই!

স্কুল-পড়ুয়া বাচ্চাদের মতোই রাহুলদার পারিবারিক চলন-বলন ছিল ভীষণ মিষ্টি! লকডাউনের সময় বাড়িতে শুরু হয়েছিল ‘মেডিটেশন পর্ব’। প্রতিদিনই রাহুলদার প্রাথমিক চেষ্টা ছিল ‘আজ নয় কাল’ বলে কাটিয়ে দেওয়ার। তারপর শুরু হত বারগেনিং... মেডিটেশনের আধ ঘণ্টার সময়সীমাকে শেষ পর্যন্ত পাঁচ মিনিটে নামিয়ে আনত, নানা অছিলায়। আবার সে পাঁচ মিনিটও চোখ পিটপিট করেই চলত!

রাহুল পুরকায়স্থ ও বর্ণালী সেনগুপ্ত, বইমেলায়

পুজো, জন্মদিন, নববর্ষ, সরস্বতী পুজোয় নতুন জামা পরে গদগদ হয়ে থাকত, একদম শিশুর মতো। প্রতি বছর লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতী পুজো ও কালী পুজোয় বাড়িতে যেন ‘ঝুলন যাত্রা’। সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে আলপনা এঁকে, খিচুড়ি রান্না হলে তবে তাঁর শান্তি! আসলে বন্ধুপ্রিয় পুপলুর এইসব আয়োজনের নেপথ্যে ছিল জমিয়ে আড্ডা, একসঙ্গে সবাই মিলে খিচুড়ি খাওয়া আর কবিতা-গান! ভালো গান শুনতে ও শোনাতে রাহুলদার সমান আগ্রহ ছিল। কিন্তু সমস্যা হত যখন আবেগপ্রবণ হয়ে নিজেও গাইতে শুরু করত, ক্র্যাকিস গলায়। তেমনই এক বর্ষার দিনে রাহুলদা গেয়ে উঠল,

এমনও দিনে তারে বলা যায়...

দু-জনে মুখোমুখি, গভীর দুখে দুঃখী...

স্বভাবতই, এর ফলে প্রশ্ন উঠল, ‘পুপলু, তুমি দুঃখী?’ ফলত, রবীন্দ্রসংগীত বদলে গেল এবং পরবর্তী সময়ে রাহুলদার বন্ধুকুল জানলেন, সংসার অতি বিষমবস্তু, তা করতে গেলে কত কী যে করতে হয়! রবীন্দ্রসংগীতও বদলাতে হয়, 'এমনও দিনে তারে বলা যায়.../দু-জনে মুখোমুখি, গভীর সুখে সুখি...'

দুষ্টু-মিষ্টি আর প্রচণ্ড বাধ্য এক শিশুকে আগলে রেখে ছিলাম এই ক-বছর! যে-পুপলু সবার রাহুলদা, সবার কাছে যে রাহুল পুরকায়স্থ, সে যেন তাঁর আসল ভালোবাসার কাজগুলো মন দিয়ে করতে পারে।

নিরালায় দুজনে

‘তার না-বলা কথার কাছে কান পেতে আছি’ পুপলু! আমাদের এই নতুন বাড়ির মায়াবি শূন্যতায় তুমি যে অপেক্ষা রচনা করলে... এই কান্না আমি কোথায় জমিয়ে রাখব?

লিখেছেন
Barnali Sengupta
Barnali Sengupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?