আরশোলাদের আন্দোলনে রাহুলও সামিল, যেভাবে আন্দোলনের কেন্দ্রে বিরোধী রাজনীতি

Rahul Gandhi: রাহুল গান্ধীর ছাত্র-যুব নেতৃত্বাধীন নিট আন্দোলনে অংশগ্রহণ, তাঁর আটক এবং মুক্তি ভারতের বিরোধী রাজনীতিকে নতুন আলোচনায় নিয়ে এসেছে। কীভাবে একটি ছাত্র আন্দোলন জাতীয় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হলো এবং বিরোধী রাজনীতির সামনে নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করল?

inscript
৩ মিনিট
আরশোলাদের আন্দোলনে রাহুলও সামিল, যেভাবে আন্দোলনের কেন্দ্রে বিরোধী রাজনীতি

দিল্লির রাজপথে ২২ জুলাই যে ছবি তৈরি হলো, তা বিরোধী রাজনীতির চরিত্র নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগও তৈরি করেছে। ছাত্র-যুবদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মধ্যে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর উপস্থিতি অনেকের কাছেই একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ধরা পড়েছে। আন্দোলনকারীদের পাশে বসে থাকা, পুলিশের হাতে আটক হওয়া এবং পরে মুক্তি পাওয়ার সেই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যম থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম—সব জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়ে।

এই আন্দোলনের মূল দাবি, নিট-সহ পরীক্ষা ব্যবস্থার সংকট, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রথম থেকেই আন্দোলনটি ছাত্র-যুবদের উদ্যোগে এগিয়েছে। কোনো বড় রাজনৈতিক দলের পতাকা এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল না। তাই সাধারণ মানুষের কাছে আন্দোলনটি নিজের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পেরেছিল।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলির সামনে সাধারণত দুটি পথ থাকে। একদিকে আন্দোলনের বাইরে থেকে সমর্থন জানানো, অন্যদিকে আন্দোলনের অংশ হয়ে তার দাবিকে আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করা। রাহুল গান্ধী দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছেন। তিনি শুধু বিবৃতি দিয়ে থেমে থাকেননি। সরাসরি আন্দোলনস্থলে পৌঁছেছেন, ছাত্রদের সঙ্গে বসেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। পরে তাঁকে দিল্লি পুলিশ আটকও করে।

ভারতের বিরোধী রাজনীতির একটি বড় সমালোচনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। অনেক সময় অভিযোগ ওঠে, বিরোধী নেতারা শুধু নির্বাচনের সময় মানুষের কাছে যান। ভোটের আগে বড় বড় প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের আন্দোলনের সময় তাঁদের দেখা যায় না। এই ধারণা ঠিক হোক বা ভুল, জনমানসে এর প্রভাব রয়েছে। সেই কারণেই দিল্লির এই ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্বও আলাদা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শাহিনবাগ, কৃষক আন্দোলন থেকে কোথায় আলাদা আরশোলাদের জমায়েত?

NEET Protest vs Shaheen Bagh and Farmers' Protest: শাহিনবাগে ছিল নাগরিকত্বের প্রশ্ন, কৃষক আন্দোলনে জীবিকার লড়াই। কিন্তু দিল্লির নিট-দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন কেন অন্যরকম? কীভাবে এই আন্দোলন ধর্ম বা জীবিকার গণ্ডি ছাড়িয়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্নকে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে এনে ফেলল?

রাহুল গান্ধীর উপস্থিতি অন্তত একটি বার্তা দিয়েছে—রাস্তার আন্দোলনকে সংসদের বাইরের একটি রাজনৈতিক লড়াই হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি শুধু সংসদে সরকারের সমালোচনা করেননি, আন্দোলনের ময়দানেও নিজেকে উপস্থিত রেখেছেন। এর ফলে ছাত্রদের দাবি জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের মূল চরিত্র ছাত্র-যুবদেরই ছিল। রাহুল গান্ধীর উপস্থিতি সেই চরিত্রকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়নি। বরং তিনি আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, কোনো গণআন্দোলনের পাশে বিরোধী নেতৃত্ব দাঁড়ালে সরকারের উপর চাপ বাড়ে। কারণ তখন বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে নয়, রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবেও সামনে আসে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে বিরোধী দল আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে নিতে পারে। ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শাহিনবাগ আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন কিংবা বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন দেখিয়েছে, সাধারণ মানুষের উদ্যোগে শুরু হওয়া আন্দোলনের নিজস্ব শক্তি থাকে। রাজনৈতিক দলগুলি সেখানে অংশ নিতে পারে, সমর্থন জানাতে পারে, কিন্তু আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি সাধারণ মানুষই। সেই ভারসাম্য বজায় থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রাহুল গান্ধীর ক্ষেত্রেও এখন সেই পরীক্ষাই সামনে। যদি তিনি শুধু এই কিছুদিনের উপস্থিতিতেই থেমে যান, তাহলে সমালোচকরা একে রাজনৈতিক কৌশল বলেই ব্যাখ্যা করবেন। কিন্তু যদি শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং যুবসমাজের দাবিকে ধারাবাহিকভাবে সংসদ ও রাজপথ—দুই জায়গাতেই তুলে ধরেন, তাহলে এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

রাজনীতিতে ছবি বা প্রতীক অনেক সময় বাস্তব রাজনীতির থেকেও বেশি প্রভাব ফেলে। পুলিশের হাতে আটক হওয়া রাহুল গান্ধীর ছবি সেই ধরনের একটি রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। কারণ এই ছবিতে তিনি ভোট চাইতে আসা একজন নেতা নন, বরং একটি চলমান আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো বিরোধী দলনেতা হিসেবে ধরা পড়েছেন।

সোমবারের ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। আন্দোলনটি আর শুধু পরীক্ষা বা প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে আটকে নেই। বিরোধী দলনেতার সরাসরি অংশগ্রহণ এবং তাঁর আটক হওয়ার ঘটনায় আন্দোলনটি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। এর ফলে চাপ এখন শুধু শিক্ষামন্ত্রীর উপর নয়, প্রধানমন্ত্রীর সরকারকেও এই অসন্তোষের রাজনৈতিক জবাব দিতে হচ্ছে।

গণতন্ত্রে বিরোধী দলনেতার কাছ থেকে এমন ভূমিকাই অনেক নাগরিক প্রত্যাশা করেন—ভোটের সময় নয়, সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতি।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ইজরায়েলের গণতন্ত্রে ফিলিস্তিনের জায়গা কোথায়?

Ballot Box Apartheid in israel: ইজরায়েলের ২৬তম নেসেট নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট কিংবা এইজেনকটের ‘চেঞ্জ ব্লক’—কেউই ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। আরব দলগুলি ১৯ আসনে ‘কিংমেকার’, কিন্তু উভয় পক্ষই তাদের সঙ্গে জোট নাকচ করেছে। ইজরায়েলি নির্বাচনের ‘ব্যালট বক্সে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ’ই এখন মুখ্য।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

তেলের দাম বাড়লে কেন পড়ে সেনসেক্স-নিফটি?

crude oil price: তেলের দাম বাড়লেই কেন পড়ে যায় সেনসেক্স-নিফটি? কিভাবে তেলের দাম বাড়লে ভারতীয় টাকার দাম কমে যায়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে,কোন কোন শেয়ারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে?

যুদ্ধের অস্ত্র পরিবহণে অস্বীকার, ২২ দেশের ১১৩ বন্দরে শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক ধর্মঘটে কোন বার্তা উঠে এল?

Dock Workers: বিশ্বের ২২টি দেশ ও ১১৩টি বন্দরে যুদ্ধ ও সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে শামিল হলেন শ্রমিকরা। গাজায় ইজরায়েলি আগ্রাসন থেকে ইউক্রেন সংঘাত, অস্ত্র পরিবহণ বন্ধের দাবিতে গড়ে উঠল আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি

পূর্ব মেদিনীপুরে খ্রিস্টান পরিবারের উপর হামলার অভিযোগ, ধর্মান্তরণের চাপ বজরং দলের বিরুদ্ধে

পার্বতীর অভিযোগ, সন্ধ্যায় যখন তাঁরা প্রার্থনা করতে বসেন, সেই সময় ৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় জোর করে বাড়িতে ঢুকে তাঁদের মারধর করেন। তাঁর চুলের মুঠি ধরে মারধর করা হয়, স্বামীকে গালিগালাজ করা হয় এবং তাঁর ননদ অর্থাৎ মোহন সোরেনের মেয়ে রেণু সোরেনকেও আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ।

প্রাথমিকে ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি! পড়ুয়াদের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট?

West Bengal Primary Education: প্রাথমিক শিক্ষায় বড় পরিবর্তনের পথে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হতে পারে ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি। পড়ুয়াদের অগ্রগতির ভিত্তিতে শিক্ষকদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টও কি নির্ধারিত হবে?

ইজরায়েলে সরকার গড়বে কে?

Israel election results: নির্বাচনে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নেতানিয়াহুর টিকে থাকা ও আইজেনকটের ক্ষমতায় আসা অনিশ্চিত; এমতাবস্থায় আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করবে?

আইডিবিআই বিক্রির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ, রাহুলের চিঠিতে জোর পেল ব্যাঙ্ক কর্মীদের আন্দোলন

IDBI Bank privatisation: কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনে, আইডিবিআই ব্যাঙ্কের ৬০.৭২ শতাংশ মালিকানা কানাডার ফেয়ারফ্যাক্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে ₹৫২,৮৭৮ কোটি টাকায় বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাহুল গান্ধী ব্যাঙ্ক কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, লোকসানে থাকা ব্যাঙ্ক মুনাফায় ফেরার পর কেন বিক্রি করছে সরকার? ২ ও ৩ নভেম্বর দেশব্যাপী অনশনের ডাক ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের।