রাখিগড়ি সভ্যতার যে ছবি উঠে এসেছিল খননের পর
এখানকার রাস্তাগুলি ছিল গ্রিড প্যাটার্নের (চৌকো ছক কাটা) এবং প্রায় ১.৯২ মিটার চওড়া। পোড়া ইটের বাড়ি, জল পাসের জন্য চমৎকার নর্দমা ব্যবস্থা, কুয়ো এবং জল ধরে রাখার জন্য বড় জলাশয় পাওয়া গিয়েছে। ঠিক যেন আজকের কোনো আধুনিক পরিকল্পিত শহর!
Aryan Invasion Theory is a myth. কিছু মানুষ আমাদের পরাধীন করে শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছে, তোমরা সভ্য ছিলে না, বাইরে থেকে আর্যরা এসে তোমাদের শিক্ষিত করে চলে গিয়েছে। কিন্তু আজ রাখিগড়ি সভ্যতার পর প্রমাণ হয়ে গিয়েছে যে, Aryan Invasion Theory is a myth. ৩০ বছর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববদ্যালয়ে যা পড়ানো বন্ধ হয়ে গিয়েছে, আজও সেই পাঠ্যক্রমের মধ্যে আমরা আছি।
সম্প্রতি এক বক্তৃতায় বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য রাখিগড়ির খননকার্যের প্রসঙ্গ টেনে ‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব’ বা Aryan Invasion Theory-কে একটি মনগড়া গল্প বা ‘মিথ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ভারতীয়রা বাইরে থেকে আসা কোনো গোষ্ঠীর হাত ধরে সভ্য হয়নি, বরং এই সভ্যতা একান্তই এ দেশের নিজস্ব।
শমীক ভট্টাচার্যের এই বক্তব্যের পর অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে— কী এই রাখিগড়ি সভ্যতা? কেন এই প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যকে ভারতীয় ইতিহাসের এক মহাবিপ্লব বলা হচ্ছে?
কী এই রাখিগড়ি সভ্যতা?
সহজ কথায়, রাখিগড়ি হলো আমাদের চেনা সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতারই একটি অংশ। ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের হিসার জেলায় এই প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটটি অবস্থিত। এতদিন পর্যন্ত আমরা জানতাম হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোই হলো এই সভ্যতার সবচেয়ে বড় শহর। কিন্তু রাখিগড়ির আবিষ্কার সেই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রাখিগড়ি হলো গোটা সিন্ধু সভ্যতার বৃহত্তম নগরী। এটি হরপ্পা বা মহেঞ্জোদারোর চেয়েও আকারে অনেক বড়। ঘগ্গর-হাকরা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই প্রাচীন শহরটি প্রমাণ করে, সিন্ধু সভ্যতা কেবল সিন্ধু নদের পারেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তার বিস্তার ছিল আরও অনেক গভীরে।
আবিষ্কার ও খনন
রাখিগড়ির ইতিহাস মাটির নিচ থেকে তুলে আনার কাজটি একদিনে হয়নি। ১৯৬৩ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক সুরজ ভান প্রথম এই ঐতিহাসিক স্থানটি চিহ্নিত করেন। তখন অবশ্য খুবই সীমিত আকারে খনন হয়েছিল। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ (ASI)-র অমরেন্দ্র নাথের নেতৃত্বে এখানে বড় আকারে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। এরপর ২০১২-২০১৬ এবং ২০২১ সালের পর থেকে পুনের ডেকান কলেজ ও অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় আবার খননকাজ শুরু হয়, যা আজও চলছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
খননকার্যে প্রমাণিত হয়েছে, আজ থেকে প্রায় ২৯০০ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ অব্দে) এই স্থানে মানুষের নিয়মিত বসবাস ছিল। অর্থাৎ, জব চার্নক কলকাতা শহর আবিষ্কার করার অনেক অনেক আগে থেকেই এখানে এক উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, রাখিগড়িতে প্রাক-হরপ্পা, পূর্ণ হরপ্পা এবং উত্তর হরপ্পা— এই তিনটি স্তরেরই প্রমাণ রয়েছে। অর্থাৎ, যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় সাড়ে ছয় থেকে ছয় হাজার বছর আগে (৬৫০০-৬০০০ BCE) এই সভ্যতার সূচনা হয়েছিল এবং ২৬০০ থেকে ১৯০০ BCE-র মধ্যে এটি উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল।
মাটির নিচ থেকে কী কী বেরিয়ে এল?
রাখিগড়ির মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল এক অত্যন্ত আধুনিক ও সুপরিকল্পিত নগর সভ্যতা। খননকার্যের ফলে যে প্রধান জিনিসগুলি সামনে এসেছে, তা নিচে দেওয়া হলো:
অপূর্ব নগর পরিকল্পনা: এখানকার রাস্তাগুলি ছিল গ্রিড প্যাটার্নের (চৌকো ছক কাটা) এবং প্রায় ১.৯২ মিটার চওড়া। পোড়া ইটের বাড়ি, জল পাসের জন্য চমৎকার নর্দমা ব্যবস্থা, কুয়ো এবং জল ধরে রাখার জন্য বড় জলাশয় পাওয়া গিয়েছে। ঠিক যেন আজকের কোনো আধুনিক পরিকল্পিত শহর!
কারখানা ও অলংকার: এখানে মণি-মাণিক্য বা দামি পাথর কাটার বড় কারখানা (lapidary) পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া সোনা, রুপো, তামা ও ব্রোঞ্জের নানা সামগ্রী, মাটির পুতুল, সিলমোহর এবং বাটখারা উদ্ধার হয়েছে, যা উন্নত ব্যবসা-বাণিজ্যের ইঙ্গিত দেয়।
প্রাচীন কবরস্থান: রাখিগড়ির ‘মাউন্ড ৭’ নামের ঢিবি থেকে একটি বড় কবরস্থান পাওয়া গিয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ৪৬টি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতদেহগুলির মাথা উত্তর দিকে করে শোয়ানো ছিল এবং কবরের ভিতরে তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের মৃৎপাত্র ও জিনিসপত্র দেওয়া হয়েছিল। কিছু নারী কঙ্কালের হাতে শাঁখের চুড়ি এবং সোনার গয়নাও দেখা গিয়েছে।
রাখিগড়ির ডিএনএ (DNA) রহস্য
রাখিগড়ি আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হলো এখানকার কঙ্কালের ডিএনএ পরীক্ষা। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘Cell’ জার্নালে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়। বসন্ত শিন্দে, নীরজ রাই এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ডেভিড রাইখের মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।
ভারতের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে হাজার বছরের পুরনো কঙ্কালের ডিএনএ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে একটি নারী কঙ্কাল (আইডি: I6113) থেকে সফলভাবে প্রাচীন ডিএনএ (aDNA) সংগ্রহ করতে পারেন। এই পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এই হরপ্পাবাসীর জিন বা বংশগত উপাদান মূলত প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার শিকারী-সংগ্রাহক (Hunter-gatherer) এবং ইরানীয় অঞ্চলের একটি আদিম গোষ্ঠীর মিশ্রণ। তবে এই ইরানীয় গোষ্ঠীটি মূল ইরানের কৃষকদের চেয়ে প্রায় ১২,০০০ বছর আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, তারা এ দেশেরই আদি বাসিন্দা।
সবচেয়ে বড় বিষয়, এই ডিএনএ-তে তথাকথিত ‘আর্য জিন’ বা সেন্ট্রাল এশিয়ান স্টেপ (Steppe) অঞ্চলের যাযাবরদের কোনো জেনেটিক মার্কার (যেমন R1a1) পাওয়া যায়নি।
এই রাখিগড়ির নারীর জিনোমের সঙ্গেই আজকের আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার (বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের) মানুষের জিনের সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে।
কেন এই আবিষ্কার এত বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ?
এতদিন ধরে আমাদের স্কুল-কলেজের ইতিহাসের বইতে পড়ানো হতো যে, ভারতের আদি সভ্যতা হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো ধ্বংস হয়েছিল বাইরে থেকে আসা ‘আর্যদের’ আক্রমণে। বলা হতো, আর্যরাই বাইরে থেকে এসে ভারতকে উন্নত করেছে।
কিন্তু রাখিগড়ির এই একটিমাত্র কঙ্কালের ডিএনএ প্রমাণ করে দিল যে, হরপ্পা সভ্যতার রমরমার সময়ে (Mature Harappan period) বাইরে থেকে কোনো বড় ধরনের অভিবাসন বা আক্রমণ হয়নি। এখানকার মানুষ স্থানীয়ভাবেই চাষবাস, নগরায়ণ এবং সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছিল।
যদিও বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে একটিমাত্র নমুনার উপর ভিত্তি করে পুরো সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন এবং স্টেপ অঞ্চলের মানুষের আগমন হয়তো হরপ্পা সভ্যতার পতনের পর (Late Harappan period) ঘটেছিল, তাও এই আবিষ্কার ‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব’কে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। শমীক ভট্টাচার্যের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা মূলত এই বিজ্ঞানসম্মত সত্যটিকেই তাঁদের বক্তৃতায় তুলে ধরছেন— ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনত্ব, মৌলিকত্ব এবং গৌরবকে প্রমাণ করার জন্য।
রাখিগড়ি আমাদের শিখিয়েছে, ভারতের ইতিহাস ধার করা কোনো ইতিহাস নয়; মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা আমাদের শিকড়টি অত্যন্ত শক্ত এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব।







