সোনালি সুইটির পর এবার সাইদা, 'ঘাড়ধাক্কা'র তালিকায় নতুন নাম যে প্রশ্ন তুলছে
Saida Fakir Case: সাইদা ফকিরকে বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবির ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি। কাউকে দেশছাড়া করার আগে যথাযথ তদন্ত ও সাংবিধানিক সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই বিতর্ক ফের উঠে এসেছে।
উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের বাসিন্দা সাইদা ফকিরের ঘটনা আবারও ভারতের নাগরিকত্ব যাচাই, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। পরিবারের অভিযোগ, প্রায় ২০ বছর ধরে নবি মুম্বইয়ে বসবাসকারী এই শ্রমজীবী মহিলাকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করে কোনো পূর্ণাঙ্গ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধুমাত্র এক জন মহিলার দুর্ভোগের ঘটনা নয়; রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা আইনসম্মতভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। কারণ, এর আগে বীরভূমের সোনালি খাতুন, সুইটি বিবি এবং দানিশ শেখদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। ফলে সাইদা ফকিরের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একই ধরনের অভিযোগের ধারাবাহিকতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
সাইদা ফকিরের আদি বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের গোবিন্দপুরের পূর্বপাড়ায়। স্বামী জুম্মান ফকিরের সঙ্গে গত প্রায় দুই দশক ধরে তিনি নবি মুম্বইয়ের সান গোল্ডেন প্যালেস এলাকায় থাকতেন। দু'জনেই গাড়ি ধোয়ার কাজ করে সংসার চালাতেন। পরিবারের দাবি, ১৯ জুলাই বাজারে যাওয়ার পথে নবি মুম্বই পুলিশ তাঁকে আটকায়। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে স্থানীয় আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে বাড়ি না ফেরায় স্বামী থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, স্ত্রীকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হয়েছে। আরও পরে তাঁর অভিযোগ, পুলিশ জানায় সাইদাকে অসম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই অভিযোগ সামনে আসার পর পরিবার দ্রুত আইনি পথে হাঁটে। ২৩ জুলাই সাইদার আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র-সহ একাধিক সরকারি নথি নিয়ে কলকাতা হাই কোর্ট, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং স্বরূপনগর থানার দ্বারস্থ হন তাঁরা। পরিবারের দাবি, সাইদার নাম ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াতেও বাদ পড়েনি। অর্থাৎ সরকারি নথিতে তাঁকে এখনও ভোটার হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বলে রাখা ভালো, ভারতে কাউকে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে বিদেশি ঘোষণা করার বিধান নেই। নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সাধারণত প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়পত্র, সরকারি নথি, বসবাসের তথ্য এবং অন্যান্য রেকর্ড পরীক্ষা করে। প্রয়োজন হলে নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫, বিদেশি আইন, ১৯৪৬ এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। বিভিন্ন আদালতও একাধিকবার জানিয়েছে, নাগরিকত্ব নিয়ে বিরোধ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নয়, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ আইনের চোখে সমতার অধিকার এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ফলে কাউকে দেশছাড়া করার আগে এই সাংবিধানিক সুরক্ষাগুলিও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আধার, প্যান বা ভোটার পরিচয়পত্রই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। তবে এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি, যেগুলি প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত। সাইদার পরিবারের অভিযোগ, সেই যাচাই না করেই তাঁকে সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের সত্যতা এখনও আদালতে বিচারাধীন। কিন্তু অভিযোগই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—প্রশাসন কি সমস্ত নথি পরীক্ষা করেছিল? যদি করে থাকে, তার ভিত্তি কী ছিল? আর যদি না করে থাকে, তবে সেই প্রক্রিয়াগত ঘাটতির দায় কার?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonali Khatun, Sweety Bibi: দু'দশক দিল্লিতে থাকার পরও কেন সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবিদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হলো? নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও কেন জেল, পুশব্যাক ও অপমানের শিকার হতে হলো তাঁদের? সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকার প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিল?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। কয়েক মাস আগেই সোনালি খাতুন, সুইটি বিবি ও দানিশ শেখদের ঘটনা জাতীয় স্তরে আলোড়ন তুলেছিল। তাঁদের অভিযোগও ছিল, দিল্লি পুলিশ বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দেয় এবং কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সোনালি তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। বিদেশের জেলে বন্দি অবস্থায় তাঁর অনাগত সন্তান যদি বাংলাদেশেই জন্ম নেয় কোন দেশের নাগরিক হবে, সেই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
সেই মামলায় কলকাতা হাই কোর্ট প্রথমে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। পরে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছয়। শেষ পর্যন্ত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দিয়ে আদালত তাঁদের ভারতে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রও আদালতে জানায়, সুইটি বিবি, দানিশ শেখ-সহ চার জনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে এবং পরে তাঁদের নাগরিকত্বের দাবি যাচাই করা হবে। তবে কেন্দ্র স্পষ্ট করে দেয়, এই সিদ্ধান্ত বিশেষ পরিস্থিতির জন্য এবং ভবিষ্যতের সব মামলায় এটি নজির হিসেবে ধরা যাবে না।
প্রায় এক বছরের অনিশ্চয়তা, জেলবন্দি জীবন এবং দেশছাড়া হওয়ার আতঙ্কের পর সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন সুইটি বিবি ও দানিশ শেখ। সাইদা ফকিরের ঘটনার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল টেনে সুইটি বিবি ইনস্ক্রিপ্ট-কে বলেন,
আগে তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়ার পরই কাউকে সীমান্ত পার করা উচিত। বাংলাদেশে জেলে কাটানো দিনগুলির কষ্ট যেন আর কোনো ভারতীয় নাগরিককে ভোগ করতে না হয়।
একই কথা বলেছেন সোনালি খাতুনও। তাঁর কথায়,
আমাদের মতো আর কেউ যেন এই কষ্ট না পায়। তিনি যদি ভারতীয় হন, তা হলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। আমরা বাংলাদেশে খুব কষ্ট পেয়েছি। কাউকে বাংলাদেশে পাঠানোর আগে পুলিশ কেন তদন্ত করে না যে তিনি সত্যিই ভারতীয়, না অন্য দেশের নাগরিক?
সাইদা ফকিরের ঘটনার অভিযোগের ধরন প্রায় একই। একজন পরিযায়ী শ্রমিক, যিনি বহু বছর ধরে অন্য রাজ্যে কাজ করছেন, তাঁকে বিদেশি সন্দেহে আটক করা হয়েছে। পরিবার দাবি করছে, সরকারি নথি ছিল। তবুও তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই পুনরাবৃত্তিই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলার বহু মানুষ জীবিকার জন্য দিল্লি, মুম্বই, গুজরাত বা অন্য রাজ্যে কাজ করতে যান। তাঁদের বড় অংশই দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, পরিচারিকা বা অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের কর্মী। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় আইনি লড়াই চালানোর সামর্থ্যও তাঁদের সীমিত। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তাঁরা আরও অসহায় হয়ে পড়েন।
অন্যদিকে প্রশাসনের যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই কারণে সন্দেহজনক ক্ষেত্রে তদন্ত করাও প্রয়োজন। কিন্তু সেই তদন্ত যদি আইনি প্রক্রিয়া, নথি যাচাই এবং আদালতের নির্দেশিত ন্যায্য পদ্ধতি অনুসরণ না করে হয়, তাহলে নিরীহ নাগরিক তার শিকার হতে পারেন। আর একবার কাউকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দিলে সেই ভুল সংশোধন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
সোনালি খাতুন, সুইটি বিবি, দানিশ শেখ এবং এখন সাইদা ফকির—এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলিতে প্রশ্ন উঠছে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে প্রশাসনিক সন্দেহ কি কখনও আইনি প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে? একজন মানুষের পরিচয়, স্বাধীনতা এবং নিজের দেশে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়ার আগে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয় কি আরও সতর্ক হওয়া? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই আগামী দিনে শুধু সাইদা ফকিরের মামলার নয়, ভারতের নাগরিকত্ব যাচাই ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও অন্যতম বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।








