বিচারপতি নিয়োগে আগাম সরকারি সম্মতি? চন্দ্রচূড়কে নিয়ে কী বললেন কৌল?
Sanjay Kishan Kaul vs DY Chandrachud: বিচারপতি নিয়োগের আগে সরকারের মতামত নেওয়া হয়েছিল? কলেজিয়ামের অন্দরমহলে কী ঘটেছিল? প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়কে ঘিরে সঞ্জয় কৌলের অভিযোগ বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে?
ভারতের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সঞ্জয় কিষাণ কৌলের একাধিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। তাঁর আসন্ন স্মৃতিকথা Without Fear or Favour প্রকাশের আগেই প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন কৌল। তাঁর অভিযোগ, বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আলোচনা করতেন। এমনকি, সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম নিয়ে আলোচনা করার আগেই সরকারের মতামত জানার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন তিনি।
এই অভিযোগ সামনে আসার পর আইনজীবী মহলে শুরু হয়েছে পাল্টা বিতর্ক। কেউ কৌলের বক্তব্যকে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ চন্দ্রচূড়ের বিচারপতি ও প্রধান বিচারপতি হিসেবে কাজের প্রশংসা করে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খারিজ করছেন।
বিচারপতি নিয়োগে কলেজিয়ামের ভূমিকা কী?
ভারতে সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে কলেজিয়াম ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়ামে প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর পরবর্তী প্রবীণ বিচারপতিরা থাকেন। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো বিচারপতি নিয়োগের সিদ্ধান্তে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত রাখা এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা বজায় রাখা।
তবে এই ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিচারপতিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে কতটা আলোচনা করা উচিত, সেই আলোচনার সীমা কোথায় শেষ হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় বিচারপতি নিয়োগ কমিশন বা এনজেএসি আইন বাতিল করে দেয়। আদালতের বক্তব্য ছিল, এই কমিশনের মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগে সরকারের ভূমিকা বাড়লে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর পরেও কলেজিয়াম ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা বন্ধ হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে কৌলের বক্তব্য নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, তিনি বাইরে থেকে এই ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করছেন না। তিনি নিজেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন এবং ২০২২ সালের জুন থেকে চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন কলেজিয়ামের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অবসর নেওয়ার আগে তিনি কলেজিয়ামের ভিতরের কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করেছেন।
ছ'টি শূন্যপদ ঘিরে কী ঘটেছিল?
কৌলের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ছ'টি শূন্যপদে বিচারপতি নিয়োগের একটি বৈঠক। তাঁর স্মৃতিকথা এবং সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’-এ করণ থাপরকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, ওই বৈঠকের আগে পাঁচটি নাম নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বৈঠকের ঠিক আগে চন্দ্রচূড় আরও এক জনের নাম প্রস্তাব করেন।
কৌলের দাবি, এই ষষ্ঠ নামটি নিয়ে আলোচনার সময় চন্দ্রচূড় তাঁকে আলাদা একটি ঘরে নিয়ে যান। সেখানে প্রস্তাবিত নামটি নিয়ে সরকারের মতামত জানতে ফোন করা উচিত কি না, তা নিয়ে কথা হয়। কৌলের মতে, কলেজিয়ামের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই সরকারের সম্মতি নেওয়ার এই চেষ্টা বিচারপতি নিয়োগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
DY Chandrachud: প্রধান বিচারপতি যখন সংবিধানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কথা, ব্যক্তিগত ধর্ম এবং ঈশ্বরের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তখন সেই বিচারপতি এবং বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।
কৌল তাঁর বক্তব্যে পরামর্শ ও আগাম অনুমোদনের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাঁর মতে, কোনো নিয়োগের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা এক বিষয়। কিন্তু কলেজিয়াম নিজেরাই কোনো নাম নিয়ে আলোচনা করার আগে সরকারের সম্মতি পাওয়ার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
কৌল আরও দাবি করেছেন, প্রস্তাবিত ষষ্ঠ নামটির সঙ্গে তিনি একমত হননি। তাঁর ধারণা ছিল, কলেজিয়ামের অন্য সদস্যরাও ওই নাম মেনে নেবেন না। শেষ পর্যন্ত সেই নাম নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়নি বলেও তিনি জানান।
তবে এই ঘটনায় সরকারের কাছ থেকে সত্যিই কোনো আগাম অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, তা কৌলের বক্তব্য থেকেই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না। তাঁর অভিযোগের মূল বিষয়, এমন একটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়াটাই বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করে।
কৌল মনে করেন, কোনো প্রধান বিচারপতি যদি তাঁর মেয়াদে সরকারের সঙ্গে এই ধরনের আলোচনাকে স্বাভাবিক প্রথায় পরিণত করেন, তা হলে পরবর্তী প্রধান বিচারপতিদের পক্ষে সেই প্রথা থেকে সরে আসা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত, যাঁদের কার্যকালের মেয়াদ কম, তাঁদের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কোনও প্রশাসনিক রীতি বদলানো আরও কঠিন হতে পারে।
চন্দ্রচূড়ের ভূমিকা নিয়ে দ্বিমত
কৌলের অভিযোগের বিরোধিতা করেছেন প্রবীণ আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী। তাঁর মতে, চন্দ্রচূড়ের কার্যকাল ভারতীয় বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। আধার, গোপনীয়তার অধিকার, খনিজ সম্পদ, দেউলিয়া আইন, সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং নির্বাচনী বন্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি চন্দ্রচূড়ের কাজের প্রশংসা করেছেন।
দ্বিবেদীর বক্তব্য, চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন আদালত এমন একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সরকারের অবস্থানের সঙ্গে মেলেনি। নির্বাচনী বন্ড ব্যবস্থা বাতিলের রায় তার অন্যতম উদাহরণ। তাই শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে মতপার্থক্যের ভিত্তিতে চন্দ্রচূড়কে সরকারের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত বলে চিহ্নিত করা উচিত নয় বলেই তাঁর মত।
বিচারপতিদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু অবসরের পরে এক প্রাক্তন বিচারপতির অন্য এক প্রাক্তন বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলার সময় এবং উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দ্বিবেদী। তাঁর আশঙ্কা, আসন্ন বইয়ের প্রচারের সঙ্গে এই বিতর্কের সময়ের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে।
অন্যদিকে, প্রবীণ আইনজীবী এবং সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি বিকাশ সিং কৌলের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, চন্দ্রচূড়ের প্রকাশ্য অবস্থান এবং সরকারের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনিক আচরণের মধ্যে অসঙ্গতি ছিল। বিচারপতি নিয়োগের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলি কোন বেঞ্চে পাঠানো হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ মামলা কোন বেঞ্চে যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্টে কোন মামলা কোন বিচারপতি বা বিচারপতিদের বেঞ্চে শুনানি হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই প্রশাসনিক ক্ষমতাকে বলা হয় ‘মাস্টার অব দ্য রোস্টার’-এর ক্ষমতা।
কৌলের অভিযোগ, অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন বা পিএমএলএ সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি তাঁর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ থেকে অন্য বেঞ্চে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মামলাটির আগের রায়ের কিছু অংশ পুনর্বিবেচনার প্রশ্ন ছিল। কৌলের বক্তব্য, কোনো মামলায় কী রায় হতে পারে, সেই আশঙ্কার ভিত্তিতে মামলাটি এক বেঞ্চ থেকে অন্য বেঞ্চে সরানো উচিত নয়।
এই মামলার শুনানির সময় কৌলের অবসর গ্রহণের তারিখ কাছে চলে এসেছিল। তাঁর দাবি, অবসরের আগে কেন তিনি মামলাটি শুনছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু তিনি জানিয়েছিলেন, মামলাটি আগেই তাঁর বেঞ্চে উঠেছিল এবং সরকারের অতিরিক্ত সময় চাওয়ার কারণে পরবর্তী শুনানির তারিখ পিছিয়ে গিয়েছিল।
কৌল আরও জানান, বিচারক হিসেবে ২২ বছরের কর্মজীবনে তিনি নিজের বিচারবোধের সঙ্গে আপস করেননি। অবসরের কাছাকাছি সময়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মামলা শুনতে গিয়ে চাপের মুখে নিজের অবস্থান বদলানো তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
বিকাশ সিংও মনে করেন, মামলা বণ্টনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কোন ধরনের মামলা কোন বেঞ্চ শুনবে, তা প্রধান বিচারপতি নির্ধারণ করতে পারেন। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট বিভাগের মধ্যে মামলাগুলি বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদ্ধতি থাকা উচিত।
বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ কৌলের আসন্ন স্মৃতিকথার প্রসঙ্গ তুলে নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিচারপতি নিয়োগে সরকারের ভূমিকা, কলেজিয়ামের বৈঠকের আগে সরকারের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক বিচারপতির জাতপাত নিয়ে সরকারের প্রশ্ন তোলার অভিযোগগুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই অভিযোগগুলির স্বাধীন যাচাই অবশ্য জরুরি।
কৌলের বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্কের মূল প্রশ্ন, বিচারপতি নিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিচারবিভাগ কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনা সব সময়েই অনুচিত, এমন দাবি করা যায় না। কিন্তু সেই আলোচনা যদি বিচারপতি নিয়োগের সিদ্ধান্তে সরকারের আগাম সম্মতি পাওয়ার পদ্ধতিতে পরিণত হয়, তা হলে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
একইভাবে, প্রধান বিচারপতির হাতে মামলা বণ্টনের ক্ষমতা থাকা প্রশাসনিক প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা থাকা দরকার। কোনো মামলার সম্ভাব্য রায়ের আশঙ্কায় বেঞ্চ বদল করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কৌলের অভিযোগই চূড়ান্ত সত্য, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলির বিস্তারিত তথ্য এবং অন্য পক্ষের বক্তব্য খতিয়ে দেখা জরুরি।






