'ঠাকুর'-এর আদেশে জ্বলে উঠেছিল 'হুল'! কীভাবে সিধু-কানহুর ডাকে কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ শাসন?
Hul Rebellion: ভাগনাডিহি গ্রামে দশ হাজার সাঁওতালের সমাবেশে সিধু ও কানহু ঘোষণা করলেন—স্বয়ং ‘ঠাকুর’ তাঁদের কাছে আবির্ভূত হয়েছেন এবং দিয়েছেন এক অব্যর্থ আদেশ। সেই অলৌকিক আদেশই বদলে দিল আদিবাসী ইতিহাসের গতিপথ।
১৮৫৫ সালের গ্রীষ্মে ভাগনাডিহির মাঠে দশ হাজার সাঁওতালের একটি সমাবেশ ঘটে। সেদিনই বাংলার বুকে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়—সিধু ও কানহুর ডাকে স্বয়ং ‘ঠাকুর’-এর আবির্ভাবের বার্তা ঘোষিত হয়। 'দিকুদের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের জ্বেলে দেওয়া সেই বিদ্রোহের আগুন আজও জ্বলজ্বল করছে ইতিহাসের পাতায়।
ইউরোপ তখনও শিল্প-বিপ্লবের দাপটে কাঁপছে। ভারতের বুকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির এক প্রান্তে আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবন হয়ে উঠেছিল নরকের মতো। মহাজনের ৫০০ শতাংশ সুদ, দারোগার অমানুষিক নির্যাতন আর জমিদারের সীমাহীন অত্যাচার—এসবই সাঁওতালদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সবকিছু বদলে যায়। ভাগনাডিহি গ্রামে দশ হাজার সাঁওতালের সমাবেশে সিধু ও কানহু ঘোষণা করলেন—স্বয়ং ‘ঠাকুর’ তাঁদের কাছে আবির্ভূত হয়েছেন এবং দিয়েছেন এক অব্যর্থ আদেশ। সেই অলৌকিক আদেশই বদলে দিল আদিবাসী ইতিহাসের গতিপথ।
সাঁওতাল বিদ্রোহ বা 'হুল'-এর সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো এর ধর্মীয় ভিত্তি। ইতিহাসবিদ কালী কিঙ্কর দত্ত ও এম. পি. ইয়র্কের গবেষণা অনুযায়ী, সিধু ও কানহু দাবি করেছিলেন যে ‘ঠাকুর’ তাঁদের কাছে প্রথমে 'সাদা পোশাকধারী শ্বেতাঙ্গ মানুষ' রূপে আবির্ভূত হন; তারপর আগুনের ফুলকি ও ছুরির বেশে এবং শেষে একটি শাল গাছের গোল চাকা রূপে দেখা দেন।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো—ঠাকুরের দেওয়া সেই 'সাদা বই' আসলে ছিল সেন্ট জনের গসপেলের ইংরেজি সংস্করণের ছেঁড়া পাতা, যা 'স্বর্গ থেকে পড়া পবিত্র কাগজ' হিসেবে প্রতিটি গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনৈতিক চেতনার এই অভূতপূর্ব মিলনই তৈরি করেছিল সাঁওতাল বিদ্রোহের শক্তিশালী ভিত্তি। কারণ সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী ধর্ম ছিল প্রকৃতিকেন্দ্রিক সর্বপ্রাণবাদ—পাহাড়, নদী ও গাছে বাস করা বিভিন্ন 'বোঙা' বা আত্মার আখ্যান। সর্বোচ্চ দেবতা 'মারান বুরু' বা ‘ঠাকুর’-এর বাণী তাই তাঁদের কাছে ছিল চূড়ান্ত সত্য।
বিদ্রোহের আগের সাঁওতাল সমাজ ছিল মূলত অধিকেন্দ্রিক ও সমতাবাদী। তাঁদের সমাজ কাঠামোতে কোনো কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পরিসর ছিল না। গ্রামের প্রধান 'মাঝি' সিদ্ধান্ত নিতেন 'মোড়ে হর' বা গ্রামসভার ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে। এম. পি. ইয়র্ক তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, সাঁওতালদের মধ্যে বিশ্বাস করা হতো—'জনতার কণ্ঠস্বরই হলো ঐতিহ্যের কণ্ঠস্বর'।
তবে এই সামাজিক গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল 'হর-দিকু' বৈপরীত্য। সাঁওতালরা নিজেদের 'হর' অর্থাৎ বিশুদ্ধ মানুষ এবং বাইরের সবাইকে 'দিকু' বলে চিহ্নিত করতেন। বিদ্রোহের সময় ‘ঠাকুর’-এর আদেশে এই 'দিকু'-দের একটি তালিকা বানানো হয়েছিল। তাতে নাম থাকা মহাজন, দারোগা, জমিদার এবং ধনী বাঙালি ভদ্রবিত্ত—সবাই ছিল সাঁওতালদের চিহ্নিত শত্রু।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বীরসা মুন্ডার জীবন, 'উলগুলান' (মহাবিদ্রোহ) এবং আদিবাসী মানুষের জল-জঙ্গল-জমিনের অধিকারের লড়াইকে বাংলা সাহিত্যে অমরত্ব দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী তাঁর কালজয়ী উপন্যাস 'অরণ্যের অধিকার'-এ। এই উপন্যাসে মহাশ্বেতা দেবী দেখিয়েছেন যে, মুন্ডা উলগুলান কেবল পুরুষ যোদ্ধাদের শৌর্য-বীর্যের ইতিহাস ছিল না, বরং তা ছিল সমগ্র আদিবাসী সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আর এই লড়াইয়ের এক অবিচ্ছেদ্য, অথচ পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসে প্রায় উপেক্ষিত অংশ ছিলেন মুন্ডা নারীরা।
কারণ, ‘ঠাকুর’-এর এই আদেশ শুধু ধর্মীয় বার্তা ছিল না, এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি। যারা তা অমান্য করত, তাদের মাথা কেটে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো—এমনই কঠোর ছিল এই আদেশ।
সেই কর্মসূচির মূল দিকগুলি ছিল:
কর ব্যবস্থায় বদল: প্রতি বলদের লাঙলে ১ আনা এবং প্রতি মহিষের লাঙলে ২ আনা কর নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা আগের জমিভিত্তিক করের চেয়ে অনেক সহজ ছিল।
সুদের হার হ্রাস: প্রতি টাকায় মাত্র ১ পাই সুদ ধার্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যেখানে মহাজনেরা ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিতেন।
শত্রু নির্মূল: সব 'দিকু' বা বহিরাগত অত্যাচারীকে হত্যা অথবা এলাকা থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
নতুন শাসনব্যবস্থা: সিধু ও কানহু নিজেদের 'সুভা'(শাসক) হিসেবে ঘোষণা করেন এবং নিজেদের পরিপালনে নায়েব ও দারোগা নিয়োগ করেন।
সামরিক বাহিনী গঠন: সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী তীর-ধনুকের দলকে সংগঠিত করা হয় 'ফৌজ' হিসেবে—যা ছিল তাদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ও অস্বাভাবিক।
এই বিদ্রোহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ছিল শাল গাছের তৈরি গোল চাকা (Cartwheel)। এটি সাঁওতালদের ব্যবহার্য গরুর গাড়ির চাকা, যা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশও ছিল। এম. পি. ইয়র্কের মতে, এই চাকা ছিল 'ঠাকুর'-এর প্রত্যক্ষ শক্তি ও সংস্কারমূলক শক্তির প্রতীক। পিটার স্ট্যানলির মতে, এই চাকা ছিল জীবনচক্র ও ফসলের আবর্তনের প্রতীক; এখানে তা ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ বাণীর মাধ্যম।
পাশাপাশি, আগুন ও ছুরি ছিল সহিংস সংগ্রামের প্রতীক। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল 'সাদা পোশাকধারী শ্বেতাঙ্গ মানুষ'-এর প্রতীক। সাঁওতালরা তখনো ব্রিটিশ শাসকদের 'পিতা' বা 'হাকিম' হিসেবে দেখত। ‘ঠাকুর’ যখন শ্বেতাঙ্গ রূপে আসেন, তখন তাঁদের মনে হয়—ব্রিটিশ কর্তৃত্বই তাঁদের প্রকৃত রক্ষক, কিন্তু তা স্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও মহাজনদের হাতে কলুষিত হয়েছে। তাই তাঁরা সরাসরি ঠাকুরের হুকুমে ব্রিটিশ শাসনকে 'দিকু'-দের হাত থেকে 'শুদ্ধ' করতে চেয়েছিলেন।
১৮৫৫ সালের ৭ই জুলাই পাঁচকাথিয়াতে দারোগা মহেশ দত্ত হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিদ্রোহ। সাঁওতাল বাহিনী পাকুড়, মোশেসপুর ও নারায়ণপুর লুণ্ঠন করে। এই লড়াইয়ে ব্রিটিশ মহিলা মিসেস টমাস ও মিস পেল নিহত হন। কিন্তু এর বিপরীতে ব্রিটিশ দমনপীড়ন ছিল আরও নির্মম। মেজর ভিনসেন্ট জার্ভিসের অমানুষিক অত্যাচার সাঁওতাল ইতিহাসে এখনও ভাস্বর। ১৮৫৫ সালের নভেম্বরে সামরিক আইন জারি করে সাঁওতাল নেতাদের গ্রেফতার ও ফাঁসি দেওয়া হয়।
সাঁওতাল বিদ্রোহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি প্রমাণ করে যে একটি আদিবাসী সম্প্রদায় যখন চরম শোষণের মুখে পড়ে, তখন তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক কাঠামো একত্রিত হয়ে এক প্রকার পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারে।
সিধু ও কানহু ঐতিহ্যবাহী 'মাঝি' পদকে অতিক্রম করে 'সুভা'(রাজা) হন। গ্রাম-পরগনা কাউন্সিলের স্থান নেয় একটি কেন্দ্রীয় আদেশ—'ঠাকুরের বাণী'। আদিবাসীদের প্রথাগত তীর-ধনুকের বাহিনীকে সুসংগঠিত করা হয় 'ফৌজ' হিসেবে।
যদিও এই ধর্মীয় রাজনীতি সাঁওতালদের সামরিক পরাজয় রোধ করতে পারেনি, কিন্তু এটি একটি জাতি হিসেবে তাঁদের পরিচয়কে চিরকালের জন্য বদলে দিয়েছে। এই বিদ্রোহের পর পরই 'সাঁওতাল পরগনা' গঠিত হয় এবং 'হর' থেকে 'সাঁওতাল'—এই আত্মপরিচয়ের বীজ রোপিত হয়।
১৮৫৫ সালের 'হুল' ছিল আদিবাসী রাজনীতি ও ধার্মিকতার এক অনন্য মিলন, যেখানে উপাসনার চেয়েও বড়ো হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। সাঁওতাল বিদ্রোহ শুধু একটি সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল না—এটি ছিল একটি সভ্যতার আত্মপ্রকাশের প্রচেষ্টা, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ লড়াই।
আজও যখন আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার, জমি ও পরিচয় নিয়ে কথা ওঠে, তখন ১৮৫৫ সালের সেই গ্রীষ্মের দিনগুলি ফিরে আসে। ভাগনাডিহির মাঠে দশ হাজার সাঁওতালের সমাবেশ আর ঠাকুরের আদেশে জ্বলে ওঠা আগুন—তা শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, প্রতিটি আদিবাসী জনতার আত্মমর্যাদার অমর গাথায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।
[লেখাটি কালী কিঙ্কর দত্তের 'The Santal Insurrection of 1855-57' এবং এম. পি. ইয়র্কের 'Tribal Identity among the Santals, 1770-1857' গবেষণার উপর ভিত্তি করে রচিত]







