ভুচিচের পদত্যাগ: সার্বিয়ায় জেন-জি নেতৃত্বে বদলাচ্ছে ক্ষমতার সমীকরণ?
Serbian protest against the government: সার্বিয়ায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে ছাত্র আন্দোলন। নোভি সাদ স্টেশন দুর্ঘটনার পর শুরু হওয়া এই আন্দোলন এবার নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রবেশ করেছে। ভুচিচ প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার চেষ্টা করছেন। ফলে ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও প্রশ্ন সামনে আনছে।
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ সার্বিয়ার রাজনীতিতে এই সেপ্টেম্বর এমন এক মোড় এনে দিয়েছে, যার তাৎপর্য শুধু একজন দীর্ঘদিনের শাসকের পদত্যাগে সীমাবদ্ধ নয়। ২৭ সেপ্টেম্বর আলেকজান্ডার ভুচিচ প্রেসিডেন্টের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সেটি প্রচলিত অর্থে ক্ষমতা ত্যাগ নয়। ২৫ অক্টোবরের আগাম সংসদীয় নির্বাচনে তিনি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবিরের প্রার্থী হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে যাওয়ার পথ তৈরি করেছেন। ফলে সার্বিয়ার সামনে এখন প্রশ্ন কেবল ‘ভুচিচ থাকবেন কি থাকবেন না’ নয়; বরং ২০১২-১৪ সালের পর যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ভুচিচ-কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল, সেটি কি প্রেসিডেন্টের পদ বদলে প্রধানমন্ত্রীর পদে একই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বহাল রাখবে, নাকি ২০২৪ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া ছাত্র-নাগরিক আন্দোলন সত্যিই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোকে বদলে দিতে পারবে?
২৭ সেপ্টেম্বর পদত্যাগের পর ভুচিচের দায়িত্ব সাময়িকভাবে গ্রহণ করার কথা সংসদের স্পিকার আনা ব্রনাবিচের। ভুচিচ বলেছেন, নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ অনুষ্ঠিত হতে হবে। অর্থাৎ অক্টোবরের সংসদীয় নির্বাচন এবং পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন—দুটি আলাদা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া—সার্বিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ করবে।
এই ঘটনাকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। সেদিন নোভি সাদ রেল স্টেশনের একটি কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন মারা যান। প্রথমে এটি একটি নির্মাণ ও অবকাঠামোগত দুর্ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও খুব দ্রুত প্রশ্ন ওঠে—স্টেশন সংস্কারের কাজে দুর্নীতি, তদারকির অভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অথবা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল কি না। সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় ছাত্রদের আন্দোলন। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের সার্বিয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, এই দুর্ঘটনার পর দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাব ও সরকারি স্বচ্ছতা নিয়ে দেশজুড়ে ছাত্র ও নাগরিকদের ব্যাপক বিক্ষোভ ও বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধ শুরু হয় এবং আন্দোলনটি সমাজের গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করে। কিন্তু আন্দোলনের তাৎপর্য শুধু এই যে, একটি দুর্ঘটনার তদন্তের দাবিতে ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিল—এমন সরল ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। প্রায় দু'বছর ধরে চলা আন্দোলন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতা, দুর্নীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার বৃহত্তর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর থেকে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বেড়েছে এবং ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০১২ সাল থেকে সার্বিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ভুচিচ ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় ও শেষ পাঁচ বছরের মেয়াদ চলছিল। ফলে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাংবিধানিক পথ তাঁর সামনে ছিল না। কিন্তু পদত্যাগ করে সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মাধ্যমে তিনি আবার সরকারের কেন্দ্রে ফেরার সুযোগ তৈরি করেছেন। ভুচিচ ১২ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সার্বিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছেন এবং এখন প্রধানমন্ত্রী পদে যাওয়ার জন্য সংসদীয় নির্বাচনে লড়ছেন। সুতরাং ২৭ সেপ্টেম্বরের পদত্যাগকে শুধুমাত্র ‘পরাজয়’ বা ‘ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া’ হিসেবে দেখা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলবে। ভুচিচের সামনে এখন ক্ষমতার একটি সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাসের পথ রয়েছে। প্রেসিডেন্টের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর হাতে প্রেসিডেন্টের মতো সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধানের সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকবে না, কিন্তু সংসদে তাঁর দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সরকারের নীতি নির্ধারণে তিনি আবার কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিতে পারবেন।
আর এই নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো ছাত্র আন্দোলন নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নিয়ে সরাসরি নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রবেশ করেছে। ‘Student List – Students Win’ নামে তাদের তালিকা ১৫ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন অনুমোদন করেছে। ছাত্র আন্দোলন ৬৯,০৯৯টি বৈধ স্বাক্ষর জমা দিয়েছে, যেখানে আইনগত ন্যূনতম প্রয়োজন ১০ হাজার। ২৫০ আসনের জাতীয় সংসদের জন্য ছাত্র আন্দোলনও ২৫০ জন প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় প্রথমে রয়েছেন নোভি সাদ এর চিকিৎসক ও মেডিসিনের অধ্যাপক ইলিয়া স্রদানভিচ। তালিকায় অধ্যাপক, চিকিৎসক, আইনজীবী, শিল্পী, উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন। কারণ ছাত্র আন্দোলন শুরু থেকেই কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ছিল না। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্র-সমাবেশ, প্লেনাম, অবরোধ ও নাগরিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। এখন সেই আন্দোলনকে ভোটের রাজনীতিতে প্রবেশ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ রাস্তার আন্দোলন থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে রূপান্তর ঘটানোই তাদের সামনে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক পরীক্ষা।
শিক্ষার্থী ও সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে প্রতিবাদে অংশ নেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ রেলস্টেশনের ছাদ ধসে প্রাণহানির ঘটনার পর এই প্রতিবাদই ধীরে ধীরে দেশজুড়ে পরিবর্তনের দাবিতে বড় আন্দোলনের রূপ নেয়। ছবিটি ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ সার্বিয়ার বেলগ্রেডে তোলা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈপরীত্য রয়েছে। ভুচিচের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন তৈরি হয়েছে, সেটির নেতৃত্ব ঐতিহ্যগত বিরোধী দলগুলির হাতে ছিল না। বরং বহু ক্ষেত্রে পুরনো বিরোধী দলগুলিই ছাত্র আন্দোলনের পেছনে অবস্থান নিয়েছে। Democratic Party এবং Kreni Promeni-সহ কয়েকটি বিরোধী দল ছাত্রদের প্ল্যাটফর্মকে সমর্থন করে নিজেদের প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন একটি প্রচলিত ‘সরকার বনাম বিরোধী দল’ নির্বাচন নয়। একদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংগঠিত দলীয় যন্ত্র, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং ভুচিচের ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো; অন্যদিকে রয়েছে একটি নতুন সামাজিক আন্দোলন, যার রাজনৈতিক বৈধতার মূল উৎস তার দীর্ঘস্থায়ী জনসমাবেশ ও ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন।
তবে ছাত্র আন্দোলনের শক্তির সঙ্গে তার দুর্বলতাও জড়িত। আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে যে বিকেন্দ্রীভূত প্লেনাম-ভিত্তিক পদ্ধতি কার্যকর হয়েছে, নির্বাচিত সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সেটি কতটা কার্যকর হবে—তা এখনও অজানা। ২৫০ জন প্রার্থী নিয়ে সংসদীয় নির্বাচনে যাওয়া এক বিষয় ; বাজেট, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, বৈদেশিক নীতি, অর্থনীতি, জ্বালানি এবং কসোভো প্রশ্নে ধারাবাহিক রাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
অন্যদিকে, ভুচিচের রাজনৈতিক শক্তির একটি বড় ভিত্তি তাঁর দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা। ২০২৩ সালের সংসদীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘Aleksandar Vučić – Serbia Must Not Stop’ ১৭,৮৩,৭০১ ভোট পেয়ে ২৫০ আসনের মধ্যে ১২৯টি আসন পেয়েছিল—অর্থাৎ ৪৬.৭৫ শতাংশ ভোট। প্রধান বিরোধী ‘Serbia Against Violence’ জোট পেয়েছিল ২৩.৬৬ শতাংশ ভোট ও ৬৫ টি আসন। Socialist Party of Serbia পেয়েছিল ১৮ টি আসন। তবে ২০২৩ সালের সেই ফলাফলকে ২০২৬ সালের পরিস্থিতির সরাসরি নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ ২০২৪ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া আন্দোলনের পরে সার্বিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
২০২৬ সালের জুনেও নোভি সাদ এ হাজার হাজার মানুষ আগাম নির্বাচনের দাবিতে সমবেত হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা, গণমাধ্যমের উপর চাপ, দুর্নীতি এবং বিরোধীদের দমন করার অভিযোগ তুলেছিল; ভুচিচ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি শুধু আন্দোলনকারীদের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের Rule of Law কাঠামোতে সার্বিয়ার বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি বিরোধী ব্যবস্থা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলির পারস্পরিক ভারসাম্য নিয়ে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিচারব্যবস্থা ও প্রসিকিউশনে রাজনৈতিক চাপের সমস্যা রয়ে গিয়েছে; উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির মামলায় তদন্ত, অভিযোগপত্র ও চূড়ান্ত সাজা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন; রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের সমর্থন ও সুরক্ষায় কর্মরত আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো সংগঠন ফ্রিডম হাউস-এর ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও সার্বিয়ায় ব্যক্তি স্বাধীনতার অবস্থার অবনতি উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালে সরকার বিরোধী বিক্ষোভের সময় পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের সহিংসতার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সার্বিয়ার সামগ্রিক স্বাধীনতার মূল্যায়ন তিন পয়েন্ট কমেছে। এটি অবশ্য একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার মূল্যায়ন, সরকারি পরিসংখ্যান নয়; কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সার্বিয়ার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই রাজনৈতিক সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সার্বিয়া ২০১২ সাল থেকে ইইউ প্রার্থী দেশ এবং ২০১৪ সালে সদস্যপদ আলোচনা শুরু করে। ৩৫ টি আলোচনা কেন্দ্রিক অধ্যায়ের মধ্যে ২২টি খোলা হয়েছে, কিন্তু মাত্র দুটি অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন স্পষ্ট করেছে, সদস্যপদ আলোচনার গতি অনেকটাই নির্ভর করবে আইনের শাসন এবং কসোভোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উপর।
গর্ভবতী এক নারী সার্বিয়ার বেলগ্রেডে একটি সমাবেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার প্রস্তুতি নেওয়া পুলিশের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।
সার্বিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, কিন্তু তার অর্থনীতি গভীরভাবে ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালে সার্বিয়ার মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৫৮.৩ শতাংশের অংশীদার ছিল EU-27। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে ইইউ-র সঙ্গে সার্বিয়ার বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৫.২ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ রাজনৈতিক ভাষণে চিন বা রাশিয়ার গুরুত্ব যতই থাকুক, বাস্তব অর্থনীতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওজন অনেক বেশি। চিনের সঙ্গে সার্বিয়ার সম্পর্ক অবশ্য গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮.২৯ বিলিয়ন ইউরো; সার্বিয়া চিনে রফতানি করেছে ১.৮৭ বিলিয়ন ইউরো এবং চিন থেকে আমদানি করেছে ৬.৪২ বিলিয়ন ইউরো। চিনা প্রতিষ্ঠান Zijin, Hesteel এবং Shandong Linglong সার্বিয়ায় বড় বিনিয়োগ করেছে এবং পরিকাঠামো, খনি, ধাতু ও শিল্পক্ষেত্রে চিনা উপস্থিতি দৃশ্যমান। রাশিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বৈততা রয়েছে। সার্বিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তায় রাশিয়ার ভূমিকা এখনও উল্লেখযোগ্য। Energy Community-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত Gazprom-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে Serbia Gas তার বার্ষিক প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৭৫ শতাংশ সংগ্রহ করছিল। যদিও হাঙ্গেরি ও আজারবাইজান থেকেও বিকল্প সরবরাহের পথ তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ সার্বিয়ার ভূরাজনীতি এক সরল ‘রাশিয়া বনাম ইউরোপ’ সমীকরণ নয়। অর্থনৈতিকভাবে ইইউ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, চিন বড় বিনিয়োগকারী ও বাণিজ্য অংশীদার, আর রাশিয়া জ্বালানি ও ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইইউ সার্বিয়ার কাছ থেকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আরও বেশি সামঞ্জস্য প্রত্যাশা করছে। ফলে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাকে একই সঙ্গে ব্রাসেলস, বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে হবে। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও সার্বিয়ার বাস্তবতা দ্বিমুখী। একদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মাথাপিছু আয় ও মজুরি বেড়েছে; অন্যদিকে পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যবধান এখনও বড়। বিশ্বব্যাঙ্কোর হিসাবে ২০২৫ সালে সার্বিয়ার জিডিপি প্রায় ৯৯.৯৫ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু জিডিপি ১৫,২৬২ ডলার; একই বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২ শতাংশ এবং বেকারত্বের হার ৭.১ শতাংশ। IMF-এর জুন ২০২৬ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ২ শতাংশ বৃদ্ধির পর ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি প্রায় ২.৮ শতাংশ হতে পারে এবং ২০২৭ সালে ৪ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। মজুরিও বাড়ছে। সার্বিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে গড় নিট মাসিক মজুরি ছিল ১১৮,৩৯৮ সার্বিয়ান দিনার; এক বছর আগের তুলনায় প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬.২ শতাংশ। কিন্তু মধ্যম নিট মজুরি ছিল ৯৩,২৭৭ দিনার—অর্থাৎ গড় মজুরি এবং সাধারণ কর্মীর আয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
সার্বিয়ার সমস্যার আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি দিক জনসংখ্যা। ২০২৫ সালে দেশটির আনুমানিক জনসংখ্যা ছিল ৬৫,৪৯,৯০১। একই বছরে জন্ম হয়েছে ৫৯,৪৮৩টি, মৃত্যু হয়েছে ৯৫,২৪৭টি। অর্থাৎ প্রাকৃতিক জনসংখ্যা হ্রাস হয়েছে ৩৫,৭৬৪ জন। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শুধু স্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণেই দেশটি প্রায় ৪,৩৪,৯৪৮ জন হারিয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলির রাজনৈতিক অর্থ আছে। তরুণদের একটি অংশের বিদেশে চলে যাওয়া, কম জন্মহার, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে অসন্তোষ—এসবই রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ছাত্র আন্দোলনের বিস্তারকে তাই শুধু একটি দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ভিত্তির একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। তবে ইউরোপের সঙ্গে সার্বিয়ার জীবনযাত্রার ব্যবধানের কথাও সতর্কভাবে বলা দরকার।
২০২৫ সালের ইউরোস্ট্যাটের ক্রয়ক্ষমতা-সমন্বিত হিসাবে EU-এর গড় মাথাপিছু GDP ছিল প্রায় ৪১,৬০০ ইউরো PPS (ইউরোপীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় Purchasing Power Standard)। সার্বিয়া ইইউ সদস্য নয়, তাই একই সিরিজে তাকে EU-27-এর সঙ্গে সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে সরাসরি তুলনা করা যায় না; তবে বিশ্বব্যাংকের মাথাপিছু GDP-র তথ্য থেকে বোঝা যায় যে সার্বিয়ার আয়স্তর এখনও ইউরোপীয় উচ্চ-আয়ের অর্থনীতিগুলির তুলনায় যথেষ্ট কম। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। কারণ ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও দুর্নীতির প্রশ্ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ মজুরি, কর্মসংস্থান, আবাসন, মূল্যবৃদ্ধি, তরুণদের বিদেশে চলে যাওয়া এবং ইউরোপীয় অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্তির সুযোগ। এখানে কসোভো প্রশ্নটিও উপেক্ষা করা যায় না। সার্বিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্যপদ প্রক্রিয়ায় কসোভোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা অন্যতম কেন্দ্রীয় শর্ত। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যস্ততা ও উত্তেজনার কারণে ২০২৩ সালের normalisation agreement বাস্তবায়নে সিদ্ধান্তমূলক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ভুচিচের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এই ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল—একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্য পদের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য বজায় রাখা, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও চিনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ধরে রাখা। নতুন সরকারকেও একই জটিল ভূ রাজনৈতিক ভারসাম্যের মুখোমুখি হতে হবে। আর এখানেই ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন শুধু সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি পশ্চিম বলকানের বৃহত্তর রাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত। সার্বিয়া এই অঞ্চলের বৃহত্তম দেশগুলির একটি এবং কসোভো, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, মন্টেনেগ্রো, উত্তর মেসিডোনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বেলগ্রেডের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন হলে কসোভো সংলাপ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বসনিয়ার সার্ব-অধ্যুষিত Republika Srpska-র সঙ্গে সম্পর্ক এবং পশ্চিম বলকানে ইউরোপীয় একীকরণের গতিপথেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে ‘ভুচিচ হেরে গেলে বলকানে উত্তেজনা কমবে’—এমন সরল সিদ্ধান্তও টানা যায় না। কারণ সার্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতি ব্যক্তির চেয়ে বড় কিছু কাঠামোগত স্বার্থ দ্বারা নির্ধারিত। কসোভো, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, চিনা বিনিয়োগ, ইইউ সদস্যপদ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতি—এসব প্রশ্নে নতুন সরকারকে কঠিন সমঝোতা করতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত নির্বাচন-পরবর্তী সময়কে ঘিরে। ভুচিচের রাজনৈতিক প্রভাব যদি সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বজায় থাকে, তাহলে তাঁর প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে যাওয়া রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃত স্থানান্তর ঘটাবে না। আবার ছাত্র আন্দোলন যদি সংসদে বড় শক্তি হিসেবে প্রবেশ করে, তাহলে তাদের সামনে থাকবে রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি সেই প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার করার কঠিন কাজ, যেগুলির বিরুদ্ধে তারা এতদিন রাস্তায় আন্দোলন করেছে। আর যদি কোনো পক্ষ স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তাহলে জোট সরকার, সমর্থন-নির্ভর সরকার বা সংসদীয় অচলাবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংকট নির্বাচনের দিন শেষ না হয়ে বরং নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে। ভুচিচ প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়েছেন, কিন্তু তাঁর দল, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ও প্রশাসনিক প্রভাবের অবসান ঘটেনি। একইভাবে ছাত্র আন্দোলন নির্বাচনে প্রবেশ করেছে, কিন্তু নির্বাচনী সাফল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ এনে দেবে না।
একদিকে ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা একজন নেতা সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন করছেন। অন্যদিকে একটি ছাত্র-নাগরিক আন্দোলন, যা নোভি সাদের ১৬টি মৃত্যুর জবাবদিহির দাবিতে শুরু হয়েছিল, এখন ২৫০ প্রার্থীর একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী তালিকা নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। ৬৯ হাজারের বেশি বৈধ স্বাক্ষর সংগ্রহ করে নির্বাচনে প্রবেশের ঘটনা দেখাচ্ছে, আন্দোলন কেবল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ নেই। সার্বিয়ার রাজনীতিতে আসল পরিবর্তন তাই শুধু প্রেসিডেন্টের নাম বদলানোয় হবে না। পরিবর্তনের গভীরতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে—নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, সংসদ ও বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠানগুলিকে কতটা কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করতে পারে তার ওপর। ইউরোপীয় কমিশনও বারবার সার্বিয়ার ক্ষেত্রে আইনের শাসন, দুর্নীতি বিরোধী ব্যবস্থা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভারসাম্যকে ইইউ-অভিমুখী অগ্রগতির কেন্দ্রে রেখেছে।
প্রসঙ্গত, ২৫ অক্টোবরের ভোট সার্বিয়ায় দীর্ঘদিনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব, ছাত্র আন্দোলনের সামাজিক শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের ক্ষমতা, ইইউ-অভিমুখী সংস্কারের ভবিষ্যৎ এবং রাশিয়া-চিন-ইউরোপের মধ্যে সার্বিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছুর উপর একটি বড় পরীক্ষা। ভুচিচ প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়েছেন; কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক যুগ শেষ হয়েছে কি না, তার উত্তর ২৭ সেপ্টেম্বরের পদত্যাগে নয়, বরং ২৫ অক্টোবরের ব্যালট বাক্স এবং তার পরের প্রতিষ্ঠানগত ক্ষমতার লড়াইয়ে খুঁজতে হবে।







