শেখ হাসিনার দিল্লি প্রেস কনফারেন্স নিয়ে কী লিখল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম?
Sheikh Hasina's Delhi Press Conference: দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল প্রেস কনফারেন্সকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কীভাবে দেখেছে? বাংলাদেশের সরকার কী বলেছে, আর ঢাকার সংবাদমাধ্যমই বা কোন দিকগুলিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে?
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ছাড়েন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর কেটে গিয়েছে দু'বছর। এই সময়ে তিনি একাধিকবার অডিও বার্তা ও সাক্ষাৎকার দিলেও, সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সরাসরি প্রশ্নোত্তরে অংশ নেননি। সেই পরিস্থিতি বদলাল দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে। সেখানে দেশে ফেরার ঘোষণা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার নিয়ে নানা মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। আর এই একটি অনুষ্ঠান ঘিরেই নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ভারত–বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক। ঢাকা তীব্র প্রতিবাদ জানায়, নয়াদিল্লি জানায় এটি একটি বেসরকারি আয়োজন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে বাংলাদেশের সংবাদপত্র—প্রত্যেকে ঘটনাটিকে কী দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে? দিল্লির সেই সংবাদ সম্মেলনকে কে কীভাবে দেখল? সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট এরপর থেকে তিনি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও বার্তা দিয়েছেন এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। কিন্তু দিল্লির প্রেস ক্লাবে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছিল একেবারেই নতুন ঘটনা।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরবেন। যদিও নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাননি। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন এবং নিজের বিরুদ্ধে হওয়া বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, এমন একটি দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যখন বাংলাদেশ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে। ঢাকা অভিযোগ করে, এই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি অবমাননা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
India-Bangladesh Relations After Political Change: আম, ইলিশ আর কূটনীতি—এই প্রতীকী সৌজন্য কি সত্যিই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বরফ গলাতে পারে? সীমান্তে উত্তেজনা, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, অনুপ্রবেশ বিতর্ক ও রাজনৈতিক মতভেদের মাঝেও কি সফট ডিপ্লোম্যাসি নতুন আস্থার পথ খুলতে পারে?
বাংলাদেশ একই সঙ্গে ভারতকে আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ বহুবার জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ঢাকার মতে, এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।
অন্যদিকে ভারতের অবস্থান ছিল ভিন্ন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সংবাদ সম্মেলনের আগেই স্পষ্ট করে দেন, এটি একটি বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠান। এর সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। অনুষ্ঠানে ব্যক্ত হওয়া মতামতও ভারত সরকার সমর্থন করে না।
এই অবস্থান অবশ্য বাংলাদেশের উদ্বেগ দূর করতে পারেনি। সংবাদ সম্মেলনের আগের দিনই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ঢাকায় ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতারা যাতে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দিতে না পারেন কিংবা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা না করেন, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম এই ঘটনাকে মূলত কূটনৈতিক টানাপোড়েনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে দুই দেশের অবস্থান পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে। তারা লিখেছে, বাংলাদেশ আগেই ভারতকে সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করেছিল। একই সঙ্গে ভারতের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে, এটি বেসরকারি উদ্যোগ এবং সরকার এর সঙ্গে যুক্ত নয়। বিবিসি দুই পক্ষের সরকারি অবস্থানকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bangladesh Adani Power deal: ২০১৭ সালে তদানীন্তন হাসিনা সরকার আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে বিদ্যুৎচুক্তি স্বাক্ষর করে, যার আওতায় ঝাড়খণ্ডে আদানিদের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে শুধু সরকারি বিবৃতি নয়, কূটনৈতিক সূত্রের তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে। সেখানেও বলা হয়েছে, গত ২৯ জুলাইয়ের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকে শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ জানানো হয়েছিল।
কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলেছে, এই সংবাদ সম্মেলন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে। তাদের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্ষোভ, প্রত্যর্পণের দাবি এবং ভারতের অবস্থানের মতো বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল জাজিরা মনে করিয়ে দিয়েছে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই শেখ হাসিনা ভারতে রয়েছেন এবং বাংলাদেশ তাকে ফেরত চেয়ে আসছে। একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেছে, এই ঘটনা শুধু একটি সংবাদ সম্মেলন নয়; বরং ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক, প্রত্যর্পণ ইস্যু এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
ডয়চে ভেলে বিষয়টিকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতির প্রেক্ষাপটে দেখেছে। তাদের মতে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে প্রত্যর্পণের দাবি, তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক—সব মিলিয়ে এটি এখন অন্যতম আলোচিত কূটনৈতিক ইস্যু। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, দুই দেশের সম্পর্কের সংবেদনশীলতা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবার সামনে এসেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ নিয়েছে। সেখানে মূল গুরুত্ব পেয়েছে শেখ হাসিনার বক্তব্য। তিনি বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকলেও ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবেন। নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েই তিনি বেশি উদ্বিগ্ন বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, দেশের মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অধিকার রাখে এবং সেই কারণেই তিনি দেশে ফিরতে চান।
গার্ডিয়ান তাদের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের তথ্যও উল্লেখ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের সময় প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল। শেখ হাসিনা অবশ্য সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তার বিরুদ্ধে হওয়া বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রতিবেদনে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যও রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ভারতে শেখ হাসিনাকে সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গার্ডিয়ানও ভারতের সরকারি অবস্থান তুলে ধরে বলেছে, দিল্লির ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।
লক্ষণীয় বিষয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলি এই ঘটনাকে প্রত্যেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, প্রত্যর্পণ চুক্তি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকে প্রতিবেদনের অংশ করেছে। এতে সংবাদ সম্মেলনের খবরটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের সব সংবাদমাধ্যম কি সমান গুরুত্ব দিয়ে এই সংবাদ প্রকাশ করেছে? অনেক গণমাধ্যমে সরকারি বিবৃতি এবং কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াই প্রধান শিরোনাম হয়েছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো, শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার নিয়ে বাংলাদেশে আইনি ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট (PID)-এর আগেই জানিয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT) নির্দেশ অনুযায়ী শেখ হাসিনার বক্তব্য, সাক্ষাৎকার, অডিও-ভিডিও বার্তা প্রচার বা প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সরকার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আবারও সব প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ওই নির্দেশ মেনে চলার আহ্বান জানায়।
দিল্লির এই ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন ফের প্রমাণ করে করল, শেখ হাসিনা এখনও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয়। একদিকে তিনি দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশ তাকে প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে। ভারত আবার পুরো ঘটনাকে একটি বেসরকারি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবে এই একটি সংবাদ সম্মেলনই প্রমাণ করেছে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক এখন আর শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি, প্রতিবেশী সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।








