প্রথম দফায় কত আসন? কী কথা তৃণমূলের অন্দরে?
West Bengal Election 2026: এসআইআর বিতর্কের পর প্রথম দফাতেই ৯২% এর বেশি ভোট—এত বড় অংশগ্রহণ কি তৃণমূলের পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত, নাকি ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ? সামশেরগঞ্জের রেকর্ড ভোট কী বলছে? এই উচ্চ ভোট কি বদলের বার্তা, না শাসক দলের পক্ষে হাওয়া?
এসআইআর-এর পর এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গে প্রথম নির্বাচন। এই নিয়ে বিতর্ক, আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ ছিল স্পষ্ট। সেই প্রেক্ষাপটে প্রথম দফার ভোট শেষ হতেই শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে এক ধরনের স্বস্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে। দলীয় নেতৃত্বরা মনে করছে, ভোটের উচ্চ হার এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিক্রিয়া তাঁদের পক্ষেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়, অতীতের নির্বাচনী ফলও বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২১৩টি আসন জিতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। বিজেপি তখন ৭৭টি আসন পেয়েছিল, আর কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল। সেই ফলাফলই তৃণমূলের জয় পেতে সুবিধা করেছিল। এরপর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও রাজ্যে তৃণমূলই এগিয়ে ছিল, যদিও বিজেপি কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ফলে ২০২৬ সালের ভোটে তৃণমূলের লক্ষ্য স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতা ধরে রাখা, আর বিজেপির লক্ষ্য সেই আধিপত্য ভাঙা।
এই পরিস্থিতিতে প্রথম দফার ভোটে যে ছবি সামনে এসেছে, তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্যজুড়ে প্রায় ৯২.৩৫ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের সামসেরগঞ্জে ৯৫.৩৪ শতাংশ ভোটদানের হার নজর কেড়েছে। অথচ এই সামশেরগঞ্জই এমন একটি এলাকা, যেখানে এসআইআর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। শুধু তাই নয়, দুপুর ১টার মধ্যেই মুর্শিদাবাদে ভোট পড়েছিল প্রায় ৭১.৭ শতাংশ। গত লোকসভা নির্বাচনে এসআইআর প্রক্রিয়া ছিল না। সেই সময় দুপুর একটা পর্যন্ত যে পরিমাণ ভোট পড়েছিল, তার তুলনায় এবার অনেক বেশি ভোট পড়েছে একই সময়সীমার মধ্যে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও সারাদিনে ৭৯.৯২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ফলে স্পষ্ট, এবারের ভোটে অংশগ্রহণের আগ্রহ এবং তাগিদ দুই-ই বেড়েছে।
এই উচ্চ ভোটদানের হার শুধু পরিসংখ্যান নয়, এর মধ্যে রয়েছে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা, এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। তৃণমূল নেতৃত্বের ধারণা, এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের পরিবার-পরিজন এবং প্রতিবেশীরা এই ভোটে বড় ভূমিকা নিয়েছেন। 'ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই' হিসেবে বিষয়টিকে তুলে ধরে তাঁরা মনে করছেন, মানুষের আবেগ এবং ক্ষোভ ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বৌবাজারের সভা থেকে সরাসরি এই প্রসঙ্গ তুলে বলেন, বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার পরও এত ভোট পড়ার কারণ একটাই—মানুষ বুঝেছেন, এটি অধিকার রক্ষার লড়াই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Taranagar: তারানগরের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন পদ্মার ভাঙনে। এবার ভোটার তালিকা থেকেও বাদ পড়েছে বহু নাম। সীমান্তের এই গ্রামে নদীভাঙন, পুনর্বাসন আর নাগরিক পরিচয়ের সংকটের মধ্যে কীভাবে বেঁচে আছেন তাঁরা?
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রায় ৬০ লক্ষের মধ্যে ৩২ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি তিনি সুপ্রিম কোর্টে তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক আক্রমণ যেমন ছিল, তেমনই ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কবার্তাও ছিল। তিনি ইঙ্গিত দেন, এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ হতে পারে এনআরসি বা সীমানা পুনর্বিন্যাসের মতো পদক্ষেপ। এমনকী তিনি দাবি করেন, কেন্দ্র সরকার ভবিষ্যতে আসন সংখ্যা বাড়ানো বা ডিলিমিটেশনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।
এই বক্তব্যকে তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশলের অংশ বলেই মনে করছেন অনেকে। কারণ, ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ককে তৃণমূল একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছে। তাঁদের বক্তব্য, এটি শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং নির্দিষ্ট অংশের মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, মৃত, ডুপ্লিকেট এবং অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া একটি নিয়মিত এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া, যাতে ভোটার তালিকা আরও স্বচ্ছ হয়। বিজেপিও এই অবস্থানকে সমর্থন করছে। তাদের মতে, এই প্রক্রিয়ার ফলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়েছে।
এই দুই বিপরীত দাবির মাঝেই প্রথম দফার ভোটে যে উচ্চ হার দেখা গেল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি শুধুই স্বাভাবিক ভোটার উপস্থিতি নয়, বরং একটি নীরব প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। যাঁরা ভোট দিতে পেরেছেন, তাঁরা অনেকেই যেন ভোট দিয়েছেন তাঁদের জন্যও, যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Election 2026: বিজেপি কি সত্যিই ১৭০ আসনের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে বাংলায়? অমিত শাহের ‘সুনামি’ দাবি কতটা বাস্তব, নাকি রাজনৈতিক কৌশল? উত্তরবঙ্গে শক্তি বাড়লেও দক্ষিণে কি এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে? বেশি ভোট পড়লেই কি বদলাবে সরকার, নাকি তৃণমূলই আবার এগিয়ে থাকবে?
মাঠপর্যায়ের কিছু চিত্র এই ব্যাখ্যাকে আরও জোরালো করে। মুর্শিদাবাদের সুতি কেন্দ্রের দেবীপুর এলাকায় দেখা গিয়েছে, অনেক ভোটার কালো ব্যাজ পরে ভোট দিতে গিয়েছেন। এটি ছিল তাঁদের প্রতিবাদ জানানোর একটি প্রতীকী উপায়।
তৃণমূলের অন্দরমহলে এখন হিসেব কষা শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, তারা মনে করছে উত্তরবঙ্গে কংগ্রেস কিছুটা শক্তি বাড়াতে পারে এবং প্রথম দফায় ৩-৪টি আসন পেতে পারে। একইসঙ্গে করণদিঘি বা ডোমকলের মতো কিছু আসনে বামেদের সম্ভাবনাও তারা উড়িয়ে দিচ্ছে না। তবে নিজেদের ক্ষেত্রে তৃণমূলের হিসেব অনেকটাই আশাবাদী, তারা অন্তত ১০০টির বেশি আসনে এগিয়ে থাকবে বলে মনে করছে।
অন্যদিকে মালদহ ও মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের প্রভাব কিছুটা বাড়তে পারে বলেও তৃণমূলের অন্দরে আলোচনা চলছে। এই অঞ্চলগুলি ঐতিহ্যগতভাবেই কংগ্রেসের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, এবং এসআইআর বিতর্ক সেখানে ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে বলেই ধারণা।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রথম দফার ভোটের পর আত্মবিশ্বাসী সুরেই কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, প্রথম দফাতেই বিজেপির 'রফাদফা' হয়ে গিয়েছে। এমনকী তিনি আরও এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, বিজেপি ৭৭টি আসনও পাবে না, ৫০-এর মধ্যেই আটকে যাবে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা সবসময় সরলরৈখিক নয়। উচ্চ ভোটদানের হার যে সবসময় শাসক দলের পক্ষে যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় এটি পরিবর্তনের ইঙ্গিতও হতে পারে। ফলে এই মুহূর্তে তৃণমূল যতই আত্মবিশ্বাসী হোক, চূড়ান্ত ফলাফল না আসা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।
তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট, এই নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ নজিরবিহীন, এবং তার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক প্রচার, সামাজিক উদ্বেগ। তৃণমূল এই পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছে, আর বিজেপি চেষ্টা করছে এটিকে স্বচ্ছতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে।






