বেশি ভোট পড়লেই বদলায় সরকার, নাকি তৃণমূলই আবার এগিয়ে থাকবে?
West Bengal Election 2026: বিজেপি কি সত্যিই ১৭০ আসনের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে বাংলায়? অমিত শাহের ‘সুনামি’ দাবি কতটা বাস্তব, নাকি রাজনৈতিক কৌশল? উত্তরবঙ্গে শক্তি বাড়লেও দক্ষিণে কি এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে? বেশি ভোট পড়লেই কি বদলাবে সরকার, নাকি তৃণমূলই আবার এগিয়ে থাকবে?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান গত এক দশকে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি করেছে। একসময় দলটি ছিল প্রান্তিক শক্তি, এখন তারা নিজেদের রাজ্যের ক্ষমতার লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক ভোটের ফলাফল, সংগঠনের বিস্তার এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয় উপস্থিতি।
২০১১ সালে যখন ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে লড়েছিল, তখন তাদের প্রাপ্তি ছিল মাত্র ৩টি আসন। সেই সময় রাজ্যে মূল লড়াই ছিল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টের মধ্যে। বিজেপি তখনও বাংলার রাজনীতিতে বড় কোনো ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেনি। তবে ২০১৬ সালে দলটি কিছুটা জমি পায়, ৩টি আসন পেলেও ভোট শতাংশ বাড়ে এবং সংগঠন বিস্তারের ইঙ্গিত মেলে।
পরিস্থিতির বড় বদল আসে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে বিজেপি ৭৭টি আসন জিতে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে আসে। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ২০০-র বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখে, তবুও বিজেপির এই উত্থান বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং কিছু শহুরে অঞ্চলে বিজেপির প্রভাব চোখে পড়ার মতো হয়।
২০২৬ সালের প্রথম দফা বিধানসভা নির্বাচনে সারাদিনে রাজ্য জুড়ে ৯২.৩৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই পটভূমিকে সামনে রেখে বিজেপির বিভিন্ন স্তরে মূল্যায়ন এবং বিশ্লেষণ সামনে আসছে। বিজেপি-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক পিনাকপাণি ঘোষ এই সমীকরণকে আরও ব্যাখ্যা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এবারের নির্বাচনে দলটি প্রায় ৯০টির মতো আসন পেতে পারে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গে বিজেপির ফল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ৩০ থেকে ৩৭টি আসন পেতে পারে দলটি। পাশাপাশি কংগ্রেস এবং অন্যান্য দল মিলিয়ে প্রায় ১২টি আসন পেতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলার ভোট মানেই এক বিশাল রণক্ষেত্র, আর সেই রণক্ষেত্রে ভোটারদের মগজধোলাই করতে এখন আর শুধু বড় বড় ভাষণ বা ইশতেহার যথেষ্ট নয়। দরকার এমন কিছু যা মানুষের চোখে আটকাবে, যা চায়ের আড্ডায় চর্চা হবে।
জেলার ভিত্তিতেও এই ধরনের হিসাব সামনে এসেছে। পূর্ব মেদিনীপুরে বিজেপি ১৪টি আসন, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৭টি, বীরভূমে ৫টি, বাঁকুড়ায় ১০টি এবং পশ্চিম বর্ধমানে ৪ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে বলে একাংশের মত। এই বিশ্লেষণ মূলত বিজেপির গত নির্বাচনের ফল, সংগঠনগত শক্তি এবং স্থানীয় ইস্যুগুলির উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।
তবে সব বিশ্লেষণই বিজেপির পক্ষে যাচ্ছে না। সাংবাদিক সম্বিত পাল অন্য দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধু বেশি ভোট পড়লেই সরকার পরিবর্তন হয় না। তাঁর কথায়, “বিহারের মতো রাজ্যে গত বিধানসভা ভোটে বিপুল ভোট পড়লেও সরকার বদলায়নি।” অর্থাৎ, ভোটের শতাংশ বা উপস্থিতি যতই বাড়ুক, তা সরাসরি ক্ষমতার পালাবদলের নিশ্চয়তা দেয় না।
তৃণমূলের অন্দরের খবর নন্দীগ্রামে শুভেন্দু জিতলেও, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তৃণমূলের পুরনো নেতৃত্বরা মানছেন, ভোট করাতে জানে শুভেন্দু। তবে পবিত্রও কম যান না।
বিজেপির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নও সামনে এসেছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, দলটি মোট ১৭০টি আসন জয়ের লক্ষ্যে এগোচ্ছে। এর মধ্যে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নিজে ১২৫টি আসনের সম্ভাবনার কথা বলেছেন, এবং বাকি নেতৃত্বরা ১০০টি আসনের হিসাব তুলে ধরছেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে কমপক্ষে ৪০টি আসন জয়ের ব্যাপারে বিজেপি আশাবাদী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Samsherganj voting: সামশেরগঞ্জে এত বেশি ভোট পড়ল কেন, যখন বহু নাম এসআইআর-এ বাদ যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে? যারা ভোট দিতে পারেননি, তাঁদের জন্যই কি অন্যরা ভোট দিচ্ছেন?
এই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যেও। ২৪ এপ্রিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরে এক জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কড়া ভাষায় তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন। তিনি দাবি করেন, রাজ্যে পরিবর্তনের ‘তুফান’ বইছে এবং মানুষ এবার পরিবর্তনের পক্ষেই রায় দেবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, বিজেপি এই নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী এবং ভোটারদের কাছে ‘ভয়মুক্ত পরিবেশে’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
এর পরের দিন, ২৫ এপ্রিল, কলকাতার নিউ টাউনের এক হোটেলে সাংবাদিক বৈঠক করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দলের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই বিজেপির জন্য কঠিন রাজ্য ছিল, কিন্তু এবার পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। তাঁর কথায়, “আমরা আপাতত ৭৭টি আসনে বসে আছি। সরকার বিজেপি বানায় না, সরকার বানায় জনগণ। আমি সুনামি দেখতে পাচ্ছি।”
অমিত শাহ আরও দাবি করেন, রাজ্যে প্রবল প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া রয়েছে। তাঁর মতে, আগে ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে বাধা দেওয়া হতো, কিন্তু এবার কেন্দ্রীয় বাহিনী ও প্রশাসনের ব্যবস্থায় সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। ফলে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারছে, এবং সেই কারণেই বিজেপি ভালো ফলের আশা করছে।
তিনি আরও বলেন, প্রথম দফার ভোটেই বাংলার মানুষ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষ ‘বিকাশ’ বা উন্নয়নের পক্ষে রায় দিচ্ছে এবং নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সেই উন্নয়নের ধারায় শামিল হতে চাইছে বাংলা।
বিজেপির একাংশের মধ্যে এমনও বিশ্বাস রয়েছে যে, এবারের নির্বাচন ২০১১ সালের মতো ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারে। যেমন ২০১১ সালে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে, তেমনই এবারও এক বড় রাজনৈতিক পালাবদল সম্ভব বলে তাঁরা মনে করছেন।
তবে বাস্তবতা হলো, এই সবই এখনও পূর্বাভাস এবং রাজনৈতিক বক্তব্য। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বরাবরই বহুস্তরীয়। এখানে স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থী নির্বাচন, সংগঠনের শক্তি, এবং ভোটের দিন পরিস্থিতি সব কিছু মিলিয়ে ফল নির্ধারিত হয়। বিজেপি যেমন আত্মবিশ্বাসী, তেমনই তৃণমূল কংগ্রেসও নিজেদের সংগঠন ও জনসমর্থনের উপর ভরসা রাখছে।






