এক বছরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ প্রায় ৬ কোটি নাম কমিশনের ব্যাখ্যা, বিরোধীদের প্রশ্ন
SIR: নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) অভিযানে এক বছরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ৬ কোটি নাম। কমিশনের দাবি, মৃত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট ভোটারদের সরানো হয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, বহু প্রকৃত ভোটারের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়ায় দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
দেশজুড়ে ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) কর্মসূচি শুরু হওয়ার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে মিলিয়ে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৫.৮ কোটি নাম বাদ পড়েছে। কমিশনের দাবি, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল মৃত, স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া, একই ব্যক্তির একাধিক নাম বা অযোগ্য ভোটারদের তালিকা থেকে সরিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ করা। তবে এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ায় বিরোধী রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন এবং ভোটাধিকার কর্মীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই বিশেষ সংশোধন কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এখনও এই প্রক্রিয়া চলছে। কমিশনের বক্তব্য, বহু বছর ধরে বিভিন্ন কারণে ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি জমে ছিল। মানুষের মৃত্যু, দীর্ঘদিন অন্যত্র বসবাস, একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় নাম থাকা কিংবা অযোগ্য ব্যক্তির নাম তালিকায় থেকে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলি দূর করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই, বুথ লেভেল অফিসারদের সমীক্ষা, স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য এবং নাগরিকদের জমা দেওয়া নথির ভিত্তিতেই এই সংশোধনের কাজ হয়েছে। কমিশনের দাবি, যাঁদের নাম বাদ পড়েছে তাঁদের অধিকাংশই মৃত, স্থায়ীভাবে অন্যত্র স্থানান্তরিত বা একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রকৃত যোগ্য ভোটারদের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেই বিষয়েও কমিশন সতর্ক ছিল বলে জানানো হয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় বিরোধী দলগুলি। তাঁদের অভিযোগ, এত বড় সংখ্যায় নাম বাদ পড়ার ঘটনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই জীবিত ও বৈধ ভোটারদের নামও তালিকা থেকে মুছে গিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বহু মানুষকে আবার আবেদন করে নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বহু প্রকৃত ভোটারের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Politics: পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সংরক্ষণ, সীমান্ত রাজনীতি, ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যা ও ‘গুজরাট মডেল’-এর আলোচনার মধ্যে নতুন বাংলার ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোচ্ছে?
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, তামিলনাড়ু, ছত্তীসগঢ় এবং আরও কয়েকটি রাজ্যে এই প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন বিধানসভা নির্বাচনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, সীমান্তবর্তী এলাকা, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চল এবং শ্রমিকদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, শুধুমাত্র যাচাইয়ের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশেও বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। খসড়া তালিকা প্রকাশের সময়ই লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ায় অনেকেই আপত্তি জানান। কমিশন পরে জানায়, যাঁদের নাম খসড়া তালিকায় নেই, তাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি ও আপত্তি জানিয়ে নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাবেন।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা কোনো স্থির নথি নয়। জনসংখ্যার পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর, মৃত্যু এবং নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ার কারণে নিয়মিত সংশোধন প্রয়োজন। কমিশনের মতে, পরিষ্কার ও নির্ভুল ভোটার তালিকা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অন্যতম ভিত্তি। তাই সময়ে সময়ে এই ধরনের বিশেষ সংশোধন কর্মসূচি চালানো জরুরি।
তবে ভোটাধিকার কর্মীদের একাংশ মনে করছেন, এত বড় আকারের সংশোধন কর্মসূচিতে আরও বেশি স্বচ্ছতা প্রয়োজন ছিল। তাঁদের দাবি, কোন কারণে কার নাম বাদ পড়ল, সেই তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের দ্রুত আপিল ও পুনর্নিবন্ধনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। এতে অযথা হয়রানি কমবে এবং মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য জানিয়েছে, এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য কোনো যোগ্য ভোটারকে বাদ দেওয়া নয়। বরং ভুয়ো বা অপ্রাসঙ্গিক নাম সরিয়ে প্রকৃত ভোটারদের তালিকা আরও নির্ভুল করা। কমিশনের দাবি, যাঁদের নাম ভুলবশত বাদ পড়েছে, তাঁদের জন্য আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
এক বছরের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে পারে। একদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, এই অভিযান নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের একাংশের দাবি, এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়ার প্রতিটি ঘটনায় আরও বেশি জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আগামী দিনে যেহেতু আরও কয়েকটি রাজ্যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচি চলবে, তাই এই বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গণতন্ত্রে ভোটাধিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকারগুলির একটি। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি পদক্ষেপই স্বাভাবিকভাবেই জনমত, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং প্রশাসনিক নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।








