এক বছরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ প্রায় ৬ কোটি নাম কমিশনের ব্যাখ্যা, বিরোধীদের প্রশ্ন

SIR: নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) অভিযানে এক বছরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ৬ কোটি নাম। কমিশনের দাবি, মৃত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট ভোটারদের সরানো হয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, বহু প্রকৃত ভোটারের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়ায় দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

inscript
৩ মিনিট
এক বছরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ প্রায় ৬ কোটি নাম কমিশনের ব্যাখ্যা, বিরোধীদের প্রশ্ন

দেশজুড়ে ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) কর্মসূচি শুরু হওয়ার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে মিলিয়ে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৫.৮ কোটি নাম বাদ পড়েছে। কমিশনের দাবি, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল মৃত, স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া, একই ব্যক্তির একাধিক নাম বা অযোগ্য ভোটারদের তালিকা থেকে সরিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ করা। তবে এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ায় বিরোধী রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন এবং ভোটাধিকার কর্মীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই বিশেষ সংশোধন কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এখনও এই প্রক্রিয়া চলছে। কমিশনের বক্তব্য, বহু বছর ধরে বিভিন্ন কারণে ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি জমে ছিল। মানুষের মৃত্যু, দীর্ঘদিন অন্যত্র বসবাস, একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় নাম থাকা কিংবা অযোগ্য ব্যক্তির নাম তালিকায় থেকে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলি দূর করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই, বুথ লেভেল অফিসারদের সমীক্ষা, স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য এবং নাগরিকদের জমা দেওয়া নথির ভিত্তিতেই এই সংশোধনের কাজ হয়েছে। কমিশনের দাবি, যাঁদের নাম বাদ পড়েছে তাঁদের অধিকাংশই মৃত, স্থায়ীভাবে অন্যত্র স্থানান্তরিত বা একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রকৃত যোগ্য ভোটারদের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেই বিষয়েও কমিশন সতর্ক ছিল বলে জানানো হয়েছে।

তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় বিরোধী দলগুলি। তাঁদের অভিযোগ, এত বড় সংখ্যায় নাম বাদ পড়ার ঘটনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই জীবিত ও বৈধ ভোটারদের নামও তালিকা থেকে মুছে গিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বহু মানুষকে আবার আবেদন করে নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বহু প্রকৃত ভোটারের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০২৬ বিধানসভা ভোট: এ কেমন নির্বাচন, এ কেমন পরিবর্তন?

West Bengal Politics: পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সংরক্ষণ, সীমান্ত রাজনীতি, ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যা ও ‘গুজরাট মডেল’-এর আলোচনার মধ্যে নতুন বাংলার ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোচ্ছে?

বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, তামিলনাড়ু, ছত্তীসগঢ় এবং আরও কয়েকটি রাজ্যে এই প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন বিধানসভা নির্বাচনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, সীমান্তবর্তী এলাকা, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চল এবং শ্রমিকদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, শুধুমাত্র যাচাইয়ের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উত্তরপ্রদেশেও বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। খসড়া তালিকা প্রকাশের সময়ই লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ায় অনেকেই আপত্তি জানান। কমিশন পরে জানায়, যাঁদের নাম খসড়া তালিকায় নেই, তাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি ও আপত্তি জানিয়ে নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাবেন।

নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা কোনো স্থির নথি নয়। জনসংখ্যার পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর, মৃত্যু এবং নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ার কারণে নিয়মিত সংশোধন প্রয়োজন। কমিশনের মতে, পরিষ্কার ও নির্ভুল ভোটার তালিকা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অন্যতম ভিত্তি। তাই সময়ে সময়ে এই ধরনের বিশেষ সংশোধন কর্মসূচি চালানো জরুরি।

তবে ভোটাধিকার কর্মীদের একাংশ মনে করছেন, এত বড় আকারের সংশোধন কর্মসূচিতে আরও বেশি স্বচ্ছতা প্রয়োজন ছিল। তাঁদের দাবি, কোন কারণে কার নাম বাদ পড়ল, সেই তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের দ্রুত আপিল ও পুনর্নিবন্ধনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। এতে অযথা হয়রানি কমবে এবং মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে।

নির্বাচন কমিশন অবশ্য জানিয়েছে, এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য কোনো যোগ্য ভোটারকে বাদ দেওয়া নয়। বরং ভুয়ো বা অপ্রাসঙ্গিক নাম সরিয়ে প্রকৃত ভোটারদের তালিকা আরও নির্ভুল করা। কমিশনের দাবি, যাঁদের নাম ভুলবশত বাদ পড়েছে, তাঁদের জন্য আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

এক বছরের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে পারে। একদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, এই অভিযান নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের একাংশের দাবি, এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়ার প্রতিটি ঘটনায় আরও বেশি জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আগামী দিনে যেহেতু আরও কয়েকটি রাজ্যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচি চলবে, তাই এই বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গণতন্ত্রে ভোটাধিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকারগুলির একটি। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি পদক্ষেপই স্বাভাবিকভাবেই জনমত, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং প্রশাসনিক নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ব্রাজিলে লুলার জয় ও সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলন: বামপন্থার প্রত্যাবর্তন, নাকি গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের নতুন অধ্যায়?

Brazil election analysis and Serbia student movement: ব্রাজিলে জয়ী হয়েছেন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পন্ন বামঘেঁষা শ্রমিকনেতা; সার্বিয়ায় জয়ী হয়েছে ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনপুষ্ট একটি নির্বাচনী শক্তি, যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিকে এখনই সুসংহত বামপন্থী বলে চিহ্নিত করা যায় না। দুই দেশের সামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক সংগ্রামের চরিত্র এবং নির্বাচনী ফলাফলের তাৎপর্য তাই আলাদা করে বিচার করা জরুরি।

তাজির, শরিয়া ও মসজিদে আচরণ নিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা, মনুষ্যত্বের চেয়ে ধর্ম বড়?

Religious dogmatism and human rights: ডগম্যাটিজম বলতে এমন এক মানসিকতাকে বোঝায় যেখানে কোনো বিশ্বাস, মতবাদ বা নিয়মকে প্রশ্নহীনভাবে, কঠোরভাবে এবং চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। সেখানে যুক্তি, প্রমাণ, পরিস্থিতি বা মানবিক বিবেচনা গৌণ হয়ে পড়ে।

অরুণাচলে ফের মুখোমুখি ভারত-চিন সেনা, বিরোধের নেপথ্যে কী?

India-China Border: সীমান্ত বিরোধ মেটাতে একের পর এক বৈঠক, সামরিক স্তরে আলোচনা এবং শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অরুণাচলে ভারত-চিন উত্তেজনা কেন কমছে না? প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে বিরোধের ইতিহাস কী? চিনের সামরিক আধুনিকীকরণের মোকাবিলায় ভারতের প্রস্তুতি কতটা, আর কূটনীতি কি আদৌ স্থায়ী শান্তির পথ দেখাতে পারবে?

মণিপুরে কেন কুকি শিবিরের নিয়ন্ত্রণ নিল যৌথ বাহিনী?

Manipur SoO camp raid: মণিপুরে SoO চুক্তির আওতায় থাকা কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর শিবিরে ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও ১৭ জনের গ্রেফতারি কি শান্তিচুক্তির নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনছে?

১৩ দিন ধরে অনশনে পড়ুয়ারা, কী হচ্ছে জামিয়ায়?

Jamia Millia Islamia protest: ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে পড়ুয়াদের অনশন ও উত্তেজনার জেরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ক্লাস অনলাইনে সরিয়ে নেওয়ায় ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা কি আদৌ কাটবে, নাকি প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে?

জঁ দ্রেজ, কে আপনি?

Jean Dreze Economic Philosophy: দ্রেজের কাছে দারিদ্র্য দূরীকরণ মানে শুধু দরিদ্র পরিবারকে কিছু আর্থিক সাহায্য দেওয়া নয়। প্রয়োজন কাজের সুযোগ, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যা মানুষকে নিজের জীবন গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ দেয়। দুই প্রশ্নের সময়ক্ষেত্র আলাদা হলেও দুটির দর্শনগত দিক একই—যেখানে শিক্ষা আনে চেতনা, আর চেতনা আনে বিপ্লব।

অরুণাচলে বাঁধবিরোধী আন্দোলনে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাসে আহত একাধিক মহিলা

Arunachal Pradesh: সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতায় ২৩ অক্টোবর, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।

পুজোর আচার না মানলে... তিন খ্রিস্টান পরবিবারের উপর চড়াও বজরং দল

১৯ অক্টোবর লক্ষ্মী মণ্ডল, তাঁর স্বামী, বনশ্রী মণ্ডল ও তাঁর স্বামী গোপাল মণ্ডল-সহ কয়েকজনকে জোর করে ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।