যে মানুষটি পাইলটই হতে চাননি, তিনিই মাঝআকাশে বাঁচালেন ১৭৪ জীবন
Captain Smit Machchhar: স্পাইসজেটে থাকাকালীন তাঁর ৯,৫০০ ঘণ্টার বেশি উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছিল, যার মধ্যে ৬,৪০০ ঘণ্টার বেশি সময় তিনি পাইলট-ইন-কমান্ড হিসেবে ছিলেন। ২০২২ সালের জুন মাসে অভিজ্ঞ পাইলট হিসেবে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ‘ফ্লাইদুবাই’-তে ডাইরেক্ট-এন্ট্রি ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন এবং দুবাইয়ে বসবাস শুরু করেন।
ভারতের মুম্বই শহরের পূর্ব ঘাটকোপারের তিলক নগর ও সংলগ্ন স্বস্তিক হাইটস এলাকায় বড় হয়েছেন স্মিত মাচ্ছার। তাঁর বাবা ভূপেন্দ্রভাই এবং মা গীতাবেহেন এখনও সেখানেই থাকেন।
১৯৯৩ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত মুম্বইয়ের গুরুকুল হাই স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করেন স্মিত। তাঁর শৈশববন্ধু প্রতীক গান্ধীর কথায়, স্মিত ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত শান্ত, গোছানো স্বভাবের ছিলেন এবং পাড়ার মাঠে নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন।
তবে বিমান চালানো তাঁর ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল না। স্কুলজীবনের পর তিনি প্রযুক্তিগত শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হন। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মুম্বইয়ের ‘স্যাসমিরা ইনস্টিটিউট অফ ম্যান-মেড টেক্সটাইলস’ থেকে ম্যান-মেড টেক্সটাইল কেমিস্ট্রিতে ডিপ্লোমা করেন। এরপর পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ‘ওয়েলিংকার ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট’ থেকে বিবিএ ডিগ্রি নেন।
উনিশ বছর বয়সে একটি এভিয়েশন সেমিনারে অংশ নেওয়ার পর তাঁর ভাবনার মোড় ঘুরে যায়। এরপরই তিনি পাইলট হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের ডুনেডিন শহরের ‘মেইনল্যান্ড এয়ার’ এভিয়েশন কলেজে কমার্শিয়াল পাইলট ট্রেনিংয়ে যোগ দেন। পরবর্তীতে গুরুগ্রামের মানেসারের ‘এফএসটিসি’ (FSTC) থেকে বোয়িং ৭৩৭ টাইপ রেটিং সম্পন্ন করেন।
২০১১ সালের জুন মাসে ভারতীয় বিমান সংস্থা স্পাইসজেটে কমার্শিয়াল পাইলট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন স্মিত মাচ্ছার। দীর্ঘ ১১ বছর তিনি সেখানে কাজ করেন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে তিনি সিনিয়র কমান্ডার ও লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্পাইসজেটে থাকাকালীন তাঁর ৯,৫০০ ঘণ্টার বেশি ওড়ার অভিজ্ঞতা ছিল, যার মধ্যে ৬,৪০০ ঘণ্টার বেশি সময় তিনি পাইলট-ইন-কমান্ড হিসেবে ছিলেন।
২০২২ সালের জুন মাসে অভিজ্ঞ পাইলট হিসেবে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ‘ফ্লাইদুবাই’-তে ডাইরেক্ট-এন্ট্রি ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন এবং দুবাইয়ে বসবাস শুরু করেন। তাঁর লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ও ম্যাক্স ফ্লিট মিলিয়ে তাঁর মোট উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ৯,৭৫০ ঘণ্টারও বেশি।
গত বছর 'বোনা-ফাইড ব্যন্টার' নামের একটি পডকাস্টে ক্যাপ্টেন মাচ্ছার নিজের কাজের দর্শন নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি জানান, পাইলটের ইউনিফর্ম পরলে তিনি কাজের ক্ষেত্রে শতভাগ মনোযোগী ও আপসহীন থাকতেন। এর আগে মাঝআকাশে যাত্রীর অকাল প্রসবের মতো জটিল পরিস্থিতি সফলভাবে সামলানোর কথাও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel flight emergency: ককপিটে পাইলটের উপর ছুরি হামলার পর কীভাবে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেল ইজরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান? আহত অবস্থাতেও কী ভূমিকা নিলেন ভারতীয় পাইলট? কীভাবে এক প্লাম্বার, দন্ত চিকিৎসক এবং কয়েকজন যাত্রী মিলে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে সাহায্য করলেন? শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাঁচল বিমানে থাকা ১৭৪ জনের প্রাণ?
ঘটনার খবর পাওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মুম্বইয়ে থাকা ক্যাপ্টেনের বাবা ভূপেন্দ্রভাই, মা গীতাবেহেন এবং স্ত্রী সোনালবেহেনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং সব ধরনের সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন।
ক্যাপ্টেনের পরিবার প্রথমে দুবাই এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবের তাবুকে পৌঁছন। রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। ঘাটকোপার পূর্বের বিধায়ক পরাগ শাহ জানান, পুরো পরিবার অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হলেও স্মিতের এমন সাহসিকতায় গর্বিত।
সেদিন মাঝআকাশে ঠিক কী ঘটেছিল?
স্থানীয় সময় সকাল ০৭:০৫ মিনিটে (০৩:০৫ জিএমটি) দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইজরায়েলের তেল আবিভের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ফ্লাইদুবাইয়ের বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটি (ফ্লাইট FZ1073)। বিমানে প্রায় ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন, যার মধ্যে ২৭টি শিশু ছিল। যাত্রীদের বড় অংশই ছিলেন ইজরায়েলি।
ওড়া শুরুর প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর সৌদি আরবের আকাশসীমায় পৌঁছলে ককপিটের ভিতরে ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের উপর অতর্কিতে হামলা চালান তাঁর সহ-পাইলট, যিনি একজন ওমানি নাগরিক। ধারালো ছুরি দিয়ে মাচ্ছারকে আঘাত করা হয়।
রক্তাক্ত ক্যাপ্টেন মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে আক্রমণকারী কো-পাইলট বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেটি মাটিতে আছড়ে ফেলার চেষ্টা করেন। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটর্যাডার২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভোর প্রায় ০৫:২১ মিনিটে দুই মিনিটেরও কম সময়ে বিমানটি ১৭,০০০ ফুটের বেশি নিচে নেমে যায় (অন্য সূত্রে দাবি, মাত্র ২৯ সেকেন্ডে ১৪,১২৫ ফুট পতন ঘটে)।
বিমানটি প্রথমে জরুরি সংকেত ‘স্কোয়াক ৭৭০০’ এবং পরে বিমান ছিনতাইয়ের সংকেত ‘স্কোয়াক ৭৫০০’ প্রেরণ করে।
গুরুতর আহত অবস্থাতেও ক্যাপ্টেন মাচ্ছার উপস্থিত বুদ্ধি হারাননি। তিনি হাত বাড়িয়ে ককপিট দরজার জরুরি আনলক রিলিজ সক্রিয় করে দেন। ৯/১১-পরবর্তী নিয়মে ককপিট ডোর বাইরে থেকে খোলা অসম্ভব হলেও ভিতরের এই রিলিজের কারণে দরজা খুলে যায়।
দরজা খুলতেই কেবিন ক্রু এবং ইয়ানিভ হায়ুন নামের এক ইজরায়েলি যাত্রী ভিতরে ঢুকে পড়েন। তাঁরা আক্রমণকারী কো-পাইলটকে চেপে ধরে কাবু করেন। এরপর বিমানে থাকা অন্য ক্রুরা বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং সকাল ০৬:৫৮ মিনিটে উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে বিমানটিকে জরুরি অবতরণ করান।
ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের বীরত্বের খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিশ্বনেতারা তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেন। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, মাচ্ছার ১৭৪ জনের প্রাণ বাঁচিয়েছেন এবং "মাঝআকাশে এক প্রলয়ংকরী বিপর্যয় রুখে দিয়েছেন।" ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সোশ্যাল মিডিয়া 'এক্স'-এ লেখেন, গুরুতর আহত হয়েও মাচ্ছার "অন্যদের জীবন বাঁচাতে অসাধারণ সাহস ও অটল সংকল্প দেখিয়েছেন।"
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, "পাইলটের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, কিন্তু সেই অবস্থাতেও তিনি দরজা খুলে দিতে পেরেছিলেন—এক অর্থে তিনি একজন সত্যিকারের নায়ক।" ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চরম বিপদের মুখে ক্যাপ্টেনের অসাধারণ উপস্থিতি বুদ্ধি ও সাহসের প্রশংসা করেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ আক্রমণকারী ওমানি কো-পাইলটকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ককপিটে কীভাবে ধারালো অস্ত্র পৌঁছল এবং আক্রমণের নেপথ্যে কী কারণ ছিল, তা খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে সবকিছুর মাঝে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির হয়ে থাকল মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এই ভারতীয় ক্যাপ্টেনের নাম।







