মহিষাসুরমর্দিনীর আরাধনা হয় পাকিস্তানেও! পুরাণ আর ইতিহাস কথা বলে এই মন্দিরগুলিতে

পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের শত্রু-শত্রু খেলা যতই চলুক, একসময় পাকিস্তানই ছিল আর্য সভ্যতার ভিত্তিভূমি। যার কিছু নিদর্শন আজও পাকিস্তানের আনাচকানাচে ছড়িয়ে আছে।

 

পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের শত্রু-শত্রু খেলা যতই চলুক, একসময় পাকিস্তানই ছিল আর্য সভ্যতার ভিত্তিভূমি। যার কিছু নিদর্শন আজও পাকিস্তানের আনাচকানাচে ছড়িয়ে আছে। রক্ত, হানাহানি আর সন্ত্রাসের ঊর্ধ্বে আজও ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে তারা উজ্জ্বল, স্বমহিমায় বিরাজমান।

হিংলাজ মাতা মন্দির
স্বামী মহাদেবের অপমানের ফলস্বরূপ সতীর দেহত্যাগের কথা সকলেই জানি। দেবী সতীর দেহের অংশ পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হলে তা সতীপীঠ বলে পরিচিতি পায়। একান্নটি পীঠের আলাদা মাহাত্ম্য। বর্তমানে পাকিস্তানেই রয়েছে এমন একটি সতীপীঠ। করাচি থেকে ২৫০ কিমি উত্তর-পশ্চিমে এবং আরব সাগর থেকে ১৯ কিমি দূরে ও সিন্ধু নদ থেকে ৮০ কিমি দূরে হিংগুল নদীর তীর। এই নদীর তীরেই এক দুর্গম গুহায় বসবাস করছেন বালুচিস্তানের জগদ্বিখ্যাত নানী। সারা পাকিস্তানের মুসলিমরা একে ‘নানী কি হজ’ নামে চেনে। বালুচিস্তান প্রদেশের এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে নানা রকম মিথ আর রহস্য। তার টানেই দুর্গম এই মন্দিরে পাড়ি জমান পর্যটকেরা।

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, এই স্থানে দেবী সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র পড়েছিল তাই দেবী এখানে কোট্টারী ও ভৈরব ভীমলোচন-রূপে পূজিত হয়। এখানে হিংলাজ মাতা নামেই পূজিত হন তিনি। এই মন্দিরের নামেই গোটা গ্রামের নাম হিংলাজ হয়েছে। এই মন্দিরটি আসলে একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের অগ্নিকুণ্ড। এই অগ্নিজ্যোতিকেই হিংলাজ দেবীর রূপ বলে মান্য করা হয়। পাকিস্তানে অবস্থিত এই মন্দিরের বেশিরভাগ তীর্থযাত্রীই আসেন ভারত থেকে। অত্যন্ত দুর্গম এই মন্দিরে আসতে হলে উট ছাড়া পথ নেই। প্রাচীনকাল থেকেই এই ব্যবস্থা। নদীর পাশ দিয়ে প্রায় একমাস ধরে উটের পিঠে চড়ে পুজো দিতে যেত ভক্তরা।

আরও পড়ুন: কী অবস্থায় আছে পাকিস্তানের হিন্দু মন্দিরগুলি?

এই মন্দিরের ভক্তদের আরাধনার ব্যাপারটিও অন্যরকম। মন্দিরে পৌঁছে বেশ কয়েক ধাপে মায়ের আরাধনা করা হয়। বাবা চন্দ্রগুপের (রানি মাড ভলক্যানো) কাছে উঠে দেবীর কাছে নিজেদের মনোবাঞ্ছা জানান ভক্তরা। তারপর গায়ে কাদা মেখে নেন। এরপর হিঙ্গল নদীতে নেমে স্নান করে শুদ্ধ হন। এভাবেই চলে আসছে ঐতিহ্য। প্রতি বছর হিংলাজ যাত্রার সময় ভারত থেকে প্রায় ২.৫ লাখ মানুষ পাকিস্তানে আসে মায়ের দর্শন পাওয়ার জন্য।

শিবহরকরায়
পাকিস্তানের অত্যন্ত পুরনো মন্দিরগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। শিবহরকরায় বা করবীপুর হল মাতা সতীর আরেকটি শক্তিপীঠ। এটি পাকিস্তানের করাচির পারকাই রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থিত। পুরাণ অনুসারে, মাতা সতীর তৃতীয় চক্ষু এই স্থানে পতিত হয়েছিল।

এই মন্দিরে মা দুর্গাকে মহিষাসুরমর্দিনী-রূপে পূজো করা হয়। যিনি ছিলেন মহিষাসুর নামক অসুরের সংহারক। আবার অন্যদিকে এই মন্দিরে দেবাদিদেব মহাদেবকে রাগী অর্থাৎ ক্রোধীশ-রূপে পূজো করা হয়। নবরাত্রি বা দুর্গাপুজোর সময় ৯ দিন ধরে এখানে উৎসব হয়।

সারদা পীঠ
একসময় এই পীঠ ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। মনে করা হয়, সাক্ষাৎ দেবী সরস্বতী বিরাজ করতেন সেখানে। কিন্তু এখন এর হাল চোখে দেখা যায় না। পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে নীলম নদীর তীরে পাহাড়ি গ্রাম শারদা। কাশ্মীরের রাজধানী মুজফরবাদ থেকে ১৫০ কিমি দূরে অবস্থিত এই মন্দির। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এই স্থানে সতীর ডানহাত পড়েছিল। তবে শুধু হিন্দু ধর্ম নয়, ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায়, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই পীঠ হয়ে উঠেছিল বৌদ্ধদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।

চতুর্দশ শতক থেকে এই মন্দিরের পতন ঘটতে থাকে। হানা দেয় মুসলিম আক্রমণকারী। কিন্তু কাশ্মীরের রাজা গুলাম সিং ফের মন্দির গড়ে তোলেন। তাতেও লাভ হয়নি। ১৯৪৭-'৪৮ সালে যুদ্ধের সময় থেকে ভারতের সঙ্গে এই পীঠের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। ২০০৫ সালে হওয়া এক ভূমিকম্পে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই মন্দির। এখন শুধু কিছু ভগ্নাংশ পড়ে আছে।

কটসরাজ মন্দির
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের চকওয়াল জেলার কটসগ্রামে এই মন্দির অবস্থিত। পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর থেকে প্রায় ২৭০ কিমি দূরে। মনে করা হয়, এই মন্দিরেই নাকি প্রথম শিবের পূজো করা হয়েছিল। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার জ্বলন্ত উদাহরণ এই মন্দির। এই মন্দির কিছু পৌরাণিক কাহিনিও আছে।

বলা হয়, কৌরবদের কাছে পাশা খেলায় হেরে বনবাস ও অজ্ঞাতবাসে কাটানোর সময় এই মন্দিরে পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী বাস করেছিলেন। আর এই স্থানেই নিজের ভাইদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য যক্ষের কাছে পরীক্ষা দিয়েছিলেন যুধিষ্ঠির। আবার অনেকের মতে, এই মন্দিরের মধ্যে যে লেক রয়েছে, তার জল নাকি শিবের চোখের জল। সতীর মৃত্যুর পর শোকে মহাদেবের চোখের জলে যে দু'টি হ্রদ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে একটি রাজস্থানের পুষ্কর আর অন্যটি কটসরাজ মন্দিরের হ্রদ।

ঐতিহাসিকদের মতে, এই শিব মন্দির অন্তত ৯০০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল। আবার অনেকের মতে, এই মন্দির তার থেকেও বেশি পুরনো। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর মন্দিরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু পরে তা আবার খুলে দেওয়া হয়। দূষণের কারণে একসময় এই মন্দিরের হ্রদের জল শুকিয়ে গিয়েছিল পরে তা আবার ভরে দেওয়া হয়।

মনসেহরা শিব মন্দির
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মন্দিরের মধ্যে অন্যটি হল এই মনসেহরা শিব মন্দির। অনুমান করা হয়, এই মন্দিরের শিবলিঙ্গটি আসলে ২০০০-৩০০০ বছরের পুরনো। এটি পাকিস্তানের একটি প্রাচীন শিব মন্দির, যা ইতিহাসের সাক্ষ্য বয়ে চলেছে। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মনসেহরা জেলা থেকে ১৫ কিমি দূরে অবস্থিত চিত্তি পাত্তিতে এই মন্দির অবস্থিত। প্রত্যেক বছর শিবরাত্রিতে এই মন্দিরে শুধু পাকিস্তানের হিন্দু নয় বহু বিদেশি পর্যটকও ভিড় জমান এখানে।

১৮৩০ সালে জম্মুর রাজা এই মন্দিরটি নিজের ভক্তির পরিচয়স্বরূপ পুনরুদ্ধার করেন। ১৯৪৮-২০০৮ সাল পর্যন্ত এই মন্দিরটি বন্ধ ছিল। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত হিন্দুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল এই মন্দিরে‌‌।

পঞ্চমুখী হনুমান মন্দির
শুধু যে ভারতেই রামভক্ত হনুমান বাস করেন তা নয়। তার বিরাজ সর্বত্র। করাচির সোলজার বাজারেই রয়েছে ১৫০০ বছরের পুরনো হনুমান মন্দির। পাকিস্তানের হিন্দুদের কাছে এই মন্দিরের গুরুত্ব অনেক। প্রতিদিন নিষ্ঠার সঙ্গে এই মন্দিরে হনুমানের পুজো করা হয়।

বলা হয়ে থাকে, এই মন্দিরের হনুমান মূর্তি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক অর্থাৎ কোনও মানুষ এই মূর্তি তৈরি করেনি। নিজে থেকেই পাথরের গায়ে আবির্ভূত হয়েছিল এই বিগ্রহ। নীল ও সাদা রঙের এবং ৮ ফুট উঁচু এই মূর্তিটি পাওয়া গিয়েছিল বহু শতাব্দী আগে। এখানে পঞ্চমুখী হনুমানের ৫টি রূপই বর্তমান, অর্থাৎ, হনুমান, নরসিংহ, গরুড়, বরাহ ও হয়গ্রীব বা অশ্বরূপ।

মন্দির নিয়ে আছে কিছু কাহিনিও। প্রচলিত কথা অনুযায়ী, এই মন্দিরের সামনে ধ্যানে বসেছিলেন এক সন্ন্যাসী। হনুমান তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন যে, এই স্থানেই মাটির নিচে তার মূর্তি আছে। তিনি সন্ন্যাসীকে নির্দেশ দেন ওই মূর্তি উদ্ধার করে প্রতিস্থাপন করতে। সেইমতো পরের দিন সন্ন্যাসী ওই স্থানের মাটি ১১ বার খোঁড়ার পরই হনুমানের পঞ্চমুখী মূর্তি খুঁজে পান। তারপর সেই সন্ন্যাসী ওখানেই মূর্তি স্থাপন করে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকের মতে, অযোধ্যার রাজা রামও নাকি এই মন্দিরে প্রবেশ করেছেন। বলা হয়ে থাকে, কেউ যদি এই মন্দির ১১ বা ২১ বার প্রদক্ষিণ করেন, তাহলে তাদের সমস্ত বাধাবিপত্তি ও কষ্ট দূর হয়ে যায়। ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে পাকিস্তানের এই মন্দিরটি অনন্য।

মুলতানের সূর্য মন্দির
এই মন্দিরের ইতিহাস নাকি ৫০০০ বছরের পুরনো। কৃষ্ণের সঙ্গে এই মন্দিরের যোগ আছে। কৃষ্ণের পুত্র শাম্ব ছিল স্বৈরাচারী ও দাম্ভিক। পিতার মতো রূপ পেয়ে সে ছিল গর্বিত। কিন্তু সে প্রায়ই তার সম্পদ আর রূপ দেখিয়ে মহিলাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করত। এইভাবেই একদিন ভগবান কৃষ্ণ তাকে কুষ্ঠ রোগের অভিশাপ দেন। পরবর্তীকালে শাম্ব নিজের ভুল বুঝতে পেরে কৃষ্ণের কাছে ক্ষমা চাইলে কৃষ্ণ তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, সূর্যদেবের উপাসনা করার জন্য। এইভাবেই শাম্বর উপাসনা করার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল মুলতানের এই সূর্য মন্দির।

আবার আরেক মতে, মুলতানের সূর্য মন্দিরকে আদিত্য সূর্য মন্দির বলা হয়। আদিত্য সূর্যের নাম, যা তিনি পেয়েছিলেন তার মা অদিতির থেকে। আবার উজ্জ্বল হওয়ার জন্য আদিত্য নামটি ভগবান শিবের সঙ্গেও যুক্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ফেরে ১০ শতকের শেষের দিকে এই মন্দিরের আদিত্য মূর্তিটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। হিউয়েন সাং-এর বর্ণনা অনুযায়ী, এই মন্দিরে একটি সোনার সূর্যের মূর্তি ছিল, যার চোখ বড় লাল রুবি পাথর দিয়ে তৈরি। প্রতিদিন হাজার হাজার হিন্দু এই মন্দিরে সূর্যের পুজো করতে আসতেন। একাদশ শতাব্দী থেকে হিন্দু তীর্থযাত্রীরা আর মন্দিরে আসতেন না। পরে ১০২৬ সালে গজনির মামুদ এই মন্দির ধ্বংস করে ফেলেন। হিন্দুরা অষ্টাদশ শতকে এই মন্দির পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি।

এইভাবেই পাকিস্তানের জায়গায় জায়গায় ছড়িয়েছিটিয়ে আছে হিন্দুদের কিছু মন্দির। যা দেখতে আজও ভিড় জমায় বহু বিদেশি পর্যটক।

 

More Articles

;