কী অবস্থায় আছে পাকিস্তানের হিন্দু মন্দিরগুলি?
ভারতে বাবরি মসজিদ থেকে শুরু করে গুজরাত বা ২০২০-র দিল্লি দাঙ্গা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও নিধনের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে বারবার, একইভাবে পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের ক্ষতও দগদগে হয়ে উঠেছে মাঝেমধ্যেই।

মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান
মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ
কাজী নজরুল ইসলাম
কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতা আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয় জাতিভেদ, বর্ণভেদের, দেশভাগের কঠোর বাস্তবতা। ১৯৪৭-এর আগস্ট ১৪র শেষ রাত আর আগস্ট ১৫র ভোররাতে ঘোষণা হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা। সেই সময় থেকেই আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রকাশ করেছিল দুই দেশ। কিন্তু এই দুই দেশের মধ্যে বিচ্ছেদের সুর বেজেছিল অনেক আগে থেকেই। স্বাধীনতার পরেও সেই ধারা, দুর্ভাগ্যবশত আজও অব্যাহত রয়েছে। ভারত-পাকিস্তান মানেই দ্বন্দ্ব, সে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ম্যাচ হোক বা কার্গিল যুদ্ধ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ, সিয়াচেন বর্ডার থেকে উরি, ২৬/১১ থেকে পুলওয়ামা, নদী নিয়ে বিরোধ- কী নিয়ে না দ্বন্দ্ব নেই দুই দেশের। দুই রাষ্ট্রই সময়বিশেষে সামরিক ঝোঁকের বশে আক্রমণ শানিয়েছে অপরের প্রতি।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচিত দেশ পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান মূলত মুসলিম ধর্মাবলম্বী দেশ হলেও এই দেশের জনসংখ্যার ২ শতাংশ হিন্দু ধর্মের মানুষ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরেও দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বেশ কিছু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ রয়ে গিয়েছেন সেই দেশে। ২০১৭ সালের জনগণনা অনুযায়ী পাকিস্তানে ৮০ লক্ষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাস করে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দুদের প্রতিনিয়ত হিংসা, অত্যাচারের মুখে পড়তে হয়। তাদের অত্যাচার থেকে বাদ যায় না মন্দিরও। ভারতে বাবরি মসজিদ থেকে শুরু করে গুজরাত বা ২০২০-র দিল্লি দাঙ্গা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও নিধনের ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে বারবার, একইভাবে পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের ক্ষতও দগদগে হয়ে উঠেছে মাঝেমধ্যেই।
হিন্দু মন্দির ধ্বংসের ঘটনা
হিন্দু মন্দির ধ্বংসের কথা উঠলেই সবার প্রথম মনে পড়ে কালাপাহাড়ের নাম, একজন ব্রাহ্মণ, হিন্দু সন্তান মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে ধ্বংস করেছিল একের পর এক হিন্দু মন্দির। আর তারই নজির যেন ফিরে আসে পাকিস্তানের হিন্দু মন্দির ভেঙে ফেলার ঘটনাগুলিতে। ২০১৯ সালে এক সাংবাদিক বৈঠকে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন "ভারতে সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।" তাঁর এই মন্তব্যের মধ্যেই আভাস ছিল, সংকটের মধ্যে বসবাস করছে সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মের মানুষ। ২০১৯-এর ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, ভারতের মতো পাকিস্তানেও ক্ষেত্রবিশেষে নিরাপদ বোধ করছেন না অন্য ধর্মের মানুষ।
২০১৯ সালে পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের খাইরপুর জেলার কুম্ব এলাকায় একটি হিন্দু মন্দিরের ওপর হামলা চালায় কিছু দুষ্কৃতী। মন্দিরের বিগ্রহ এবং হিন্দু ধর্মগ্রন্থ গীতা-সহ বেশ কিছু ধর্মীয় গ্রন্থ পুড়িয়ে দিয়েছিল তারা। এরপর সেখান থেকে পালিয়ে যায় তারা। ইমরান খান এই ঘটনার নিন্দা করলেও আজ পর্যন্ত কেউ সেই দুষ্কৃতীদের ধরতে পারেনি। অধরাই থেকে গেছে তারা। স্থানীয় কিছু হিন্দু ধর্মের মানুষ পুলিশের কাছে অভিযোগও দায়ের করেন, কিন্তু তাতেও কোনও ফল হয়নি।
২০২০ সালের অতিমারীর সময়। জায়গায় জায়গায় চলছে লকডাউন। সেই অবস্থাতেও বাদ যায়নি সংখ্যালঘু নির্যাতন। এক আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের ঘটনা আগের থেকে অনেক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারই এক নমুনা পাওয়া গিয়েছিল পাকিস্তানের লিয়ারি জেলায়। দেশভাগের আগে থেকেই করাচির লিয়ারি জেলায় রয়েছে হনুমান মন্দির। দেশভাগের পর তা পাকিস্তানের অংশে চলে আসে। সেই হনুমান মন্দিরেই হামলা চালায় কিছু মুসলিম। মন্দিরের আশপাশে বাস করতেন ২০টির বেশি হিন্দু পরিবার। এক সূত্র থেকে জানা যায়, স্থানীয় এক প্রোমোটার মন্দির ও তার আশপাশের জায়গা কিনে নিয়েছেন, এবং তিনি সেখানে এক বহুতল বিল্ডিং বানাবেন। তখনও বিপদের আঁচ পাননি কেউই। সেই প্রোমোটার মন্দিরের পাশে বসবাসকারী হিন্দুদের আশ্বস্তও করেন যে, মন্দির ভাঙা পড়বে না এবং হিন্দু মানুষজনদেরও উচ্ছেদ করা হবে না। কিন্তু লকডাউন চালু হলে কিছুদিনের জন্য মন্দির বন্ধ রাখা হয়। সেই সময় মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা হলে সেই সুযোগে ওই প্রোমোটার শুধু হনুমান মন্দিরটি নয়, তার পাশে বাস করা ২০টির বেশি হিন্দু পরিবারকে বুলডোজার চালিয়ে নিঃশেষ করে দেন বলে অভিযোগ। স্থানীয় এক বাসিন্দার মতে, প্রশাসন আগে থেকে সব জেনেও চুপ করে বসেছিল।
এরপর ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ঘটে আরও এক ঘটনা। কাতারের সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ফের এক হিন্দু মন্দিরে হামলা চালায় কয়েকশো দুষ্কৃতী। ৩০ ডিসেম্বর মৌলানা ও মৌলবাদী গোষ্ঠী জমিয়ত-উলেমা-ই-ইসলাম মন্দিরের ওপর হামলা চালায়। পাকিস্তানের পেশোয়ার থেকে ১০০ কিমি দূরে একটি গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধ্বংসের ভিডিও পোস্ট করা হয়। তাতেই দেখা যায়, কীভাবে স্থানীয় কিছু ধর্মীয় নেতার উসকানিতে ১২০০ জন মুসলিম হাতুড়ি, বাটালি দিয়ে মন্দিরের গায়ে বারবার আঘাত করছে। মন্দিরের ভেতরে থাকা মূর্তি এনে রাস্তার ওপর ভেঙে ফেলা হয়। এক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, আরেকটি দল মন্দিরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তার কথায়, মন্দির ভাঙার এই পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই ভেবে রাখা। জেলা পুলিশ ভিডিও দেখে ১২০০ জনের মধ্যে থেকে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মন্দির ধ্বংসের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, উনিশ শতকের শুরুতে নির্মিত এই মন্দিরটি আরেকবার ১৯৯৭ সালে ভাঙা হয়েছিল। এরপর ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই মন্দির পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। এই কারণে ২০২০ সালে সরকারি ছাড়পত্র পেয়ে হিন্দুরা সেই মন্দির সংস্কারের কাজে হাত দিলে উগ্র মৌলবাদীদের তা সহ্য হয়নি, তাই এই ঘটনা।
চলে আসা যাক ২০২১ সালের আগস্ট মাসে। লাহোর থেকে ৫৯০ কিমি দূরে পাঞ্জাব প্রদেশের ভোঙ্গ শরিফ গ্রামের সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির ধ্বংস করে ফেলা হয়। মন্দিরের ভেতর ভাঙচুর চালানো হয়। মন্দিরের ভেতরের একাংশও ভেঙে ফেলা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় এই ভিডিও। পুলিশ সূত্রের খবরে জানা যায়, ওই এলাকায় একটি হিন্দু বালকের মাদ্রাসা সম্পর্কে খারাপ আচরণের কারণে ক্ষেপে ওঠে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ, তারই ফলস্বরূপ মন্দির ভাঙচুর। ওই এলাকায় ১০০টির মতো সংখ্যালঘু পরিবার বাস করে, অভিযোগ ছিল, হামলা চালানো হয় তাদের বাড়িতেও।
এছাড়াও ২০২০ সালের আগস্টের ৩০ তারিখে পাকিস্তানে হিন্দুদের কৃষ্ণ মন্দির ধ্বংস করে ফেলা হল। ঘটনাটি ঘটে সিন্ধ প্রান্তের ক্ষিপ্রোতে। কিছু কট্টরপন্থী মন্দিরে হামলা চালায় এবং কৃষ্ণের মূর্তি ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ। এই বছরেই অক্টোবর মাসে আরেকটি মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কিন্তু এইবার মন্দির ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগও আছে। পাক গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাতের বেলা কিছু অজ্ঞাত হামলাকারী হায়দরাবাদের (পাকিস্তান) জামশোরোর কোটরির দরিয়া ব্যান্ড এলাকার শিব মন্দিরে তালা ভেঙে ঢুকে পড়ে। অজ্ঞাত হামলাকারীরা প্রথমে দেবতাদের গলা এবং গা থেকে মহামূল্য গয়না নিয়ে নেয় এবং দান পেটি থেকে টাকা নেয়, সঙ্গে শিবলিঙ্গও ভেঙে দিয়ে যায়। ২০২২ সালের জুন মাসে করাচির সিন্ধ প্রদেশে আবার হামলা চালিয়েছে উগ্রবাদীরা। 'দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন'-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করাচি শহরের কোরাঙ্গি এলাকার শ্রী মারি মাতা মন্দিরে হামলা চালানো হয়। মন্দিরের ভেতরেই বাস করতেন মন্দিরের পুরোহিত। তিনি দেখেন, হঠাৎ করে জনা ৭-৮ হামলা চালায় মন্দিরে। তাঁকে আর তাঁর পরিবারকেও রেহাই দেয়নি। কয়েক মুহূর্তে তছনছ হয়ে যায় পুরো মন্দির। এক নির্মীয়মাণ মন্দির থেকে বেশ কিছু বিগ্রহ মন্দিরের পুরোহিত নিজের বাড়িতে রেখেছিলেন, সেইসবও তারা ভেঙে ফেলে। হামলার কারণ কী, তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।
ভারতের ইতিহাসে কলঙ্ক হয়ে রয়েছে ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদের ঘটনা। নতুন করে বিতর্ক বাধছে কাশী-মথুরার মসজিদ নিয়ে। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে কেন, এই প্রশ্ন উঠে আসছে।







