মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত: কে এই সুব্রত গুপ্ত?
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং নিরুপম সেনের আমলে তিনি শিল্প দপ্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সিঙ্গুরে টাটাদের জমি অধিগ্রহণের সময় তিনি ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন কালেক্টর হিসেবে কাজ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে প্রশাসনিক স্তরে তাঁর স্বচ্ছতা ও নির্ভীকতা প্রশংসিত হয়েছিল।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোয় সবথেকে বড় যে রদবদলটি নজরে এসেছে, তা হলো সুব্রত গুপ্তের নিয়োগ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর নিয়োগ কেবল একটি প্রশাসনিক পদোন্নতি নয়, বরং বাংলার পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
দীর্ঘ কেরিয়ারে বামফ্রন্ট, তৃণমূল এবং বর্তমানে বিজেপি—তিনটি ভিন্ন ঘরানার সরকারের সঙ্গেই তাঁর কাজের যোগসূত্র তৈরি হলো।
সুব্রত গুপ্ত কে?
সুব্রত গুপ্ত একজন প্রথিতযশা আইএএস অফিসার। তাঁর মেধার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর ছাত্রজীবন থেকেই। ১৯৯০ ব্যাচের পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের এই আমলা আইআইটি খড়গপুরের ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তনী। ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষায় তিনি সারা দেশে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিলেন। প্রশাসনিক কাজে তাঁর অভিজ্ঞতা বহুদিনের।
শিক্ষা ও দক্ষতা: তিনি আইআইটি (IIT) খড়গপুরের প্রাক্তনী। ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ডের পাশাপাশি তিনি যুক্তরাজ্য (UK) থেকে ম্যানেজমেন্টে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই টেকনিক্যাল ও ম্যানেজমেন্ট শিক্ষার সমন্বয় তাঁকে জটিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। সুব্রত বাবু যখন আমলা হিসেবে যোগ দেন, তখন তিনি ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইল টেকনোলজি নিয়ে পিএইচডি (PhD) করছিলেন। গবেষণার কাজ কিছুটা থমকে গেলেও তিনি হাল ছাড়েননি। অতিরিক্ত জেলাশাসকের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তিনি পিএইচডি শেষ করেন। এমনকী ভারতের ‘মিসাইল ম্যান’ তথা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের অধীনে একটি গবেষণা প্রকল্পেও কাজ করেন তিনি।
বাম জমানা: বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং নিরুপম সেনের আমলে তিনি শিল্প দপ্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সিঙ্গুরে টাটাদের জমি অধিগ্রহণের সময় তিনি ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন কালেক্টর হিসেবে কাজ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে প্রশাসনিক স্তরে তাঁর স্বচ্ছতা ও নির্ভীকতা প্রশংসিত হয়েছিল।
তৃণমূল জমানা: ২০১১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর তৃণমূল জমানায় তিনি তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে (যেমন উদ্যানপালন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) বদলি হন। তখন গুঞ্জন ছিল, তাঁর স্পষ্টবাদিতা হয়তো তৎকালীন শাসকদলের সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না।
কেন্দ্রীয় ডেপুটেশন: এরপর তিনি দিল্লিতে কেন্দ্রীয় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ (Food Processing Industries) মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলান। ৪৭ বছরের দীর্ঘ কেরিয়ার শেষে তিনি সম্প্রতি সুপারঅ্যানুয়েটেড বা অবসর গ্রহণ করেন
২০২৬-এর নির্বাচনে সুব্রত গুপ্তের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। অক্টোবর ২০২৫-এ যখন ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) কাজ শুরু হয়, কমিশন তাঁকে Special Roll Observer হিসেবে নিয়োগ করে। তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল তাঁর কাজ নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুললেও কমিশন তাঁর উপর আস্থা হারায়নি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট প্রচারের সময়ও নাম না করে তাঁকে খোঁচা দিয়েছিলেন। নির্বাচনের সময় তিনি বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ৪ মে ফল ঘোষণার দিন তিনি তাঁর সাফল্যের রহস্য ফাঁস করে বলেন— "অপরাধীদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল, হয় ঘরে থাকো, নয় শ্রীঘরে।" এই নির্ভীক বার্তার ফলেই বাংলা এক রক্তপাতহীন নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর 'সারথি'
২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। আর শপথ গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নবান্ন থেকে জারি হওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে চমক দেয় নতুন সরকার। অবসরপ্রাপ্ত আইএএস সুব্রত গুপ্তকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পরামর্শদাতা এবং প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি প্রাক্তন আমলা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় এলেন। এরপর তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে বসে রাজ্যের নীতি নির্ধারণ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের তদারকি করবেন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বাংলার অত্যন্ত মেধাবী আইএএস অফিসারদের সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। তিনি সঞ্জয় মিত্র বা মলয় দে-র মতো আমলাদের উদাহরণ টেনে বলেন, সুব্রত গুপ্তের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাহায্য ছাড়া নীতি নির্ধারণ এবং তা কার্যকর করা সম্ভব নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৪ মে সন্ধ্যার সবচেয়ে বড় চমক ছিল অন্য একটি দৃশ্য। বিজেপি সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন যখন এক বিশাল পুষ্পমাল্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে গেলেন, মোদি সেই মালা গ্রহণ না করে উল্টে নিতিনের গলাতেই পরিয়ে দিলেন। কিন্তু এখানেই দর্শকদের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কেন এই ব্যতিক্রমী আচরণ? কেন এক দুঁদে রাজনীতিকের হাত থেকে মালা নিয়ে তাঁকে পরিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী?
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) এবং নির্বাচন চলাকালীন নির্বাচন কমিশনের 'বিশেষ পর্যবেক্ষক' হিসেবে তাঁর ভূমিকা বিজেপি নেতৃত্বকে মুগ্ধ করেছে। হিংসামুক্ত ও স্বচ্ছ নির্বাচন পরিচালনার পিছনে তাঁর যে স্ট্র্যাটেজি ছিল, তাকেই নতুন সরকার কুর্নিশ জানাল এই পদের মাধ্যমে।
২০২৬-এর নির্বাচনে সুব্রত গুপ্তের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। নির্বাচন কমিশন তাঁকে দুটি পর্যায়ে নিয়োগ করেছিল:
SIR পর্যায় (ভোটার তালিকা সংশোধন): ২০২৫ সালের শেষের দিকে যখন ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে দড়ি টানাটানি তুঙ্গে, তখন সুব্রত গুপ্তকে 'স্পেশাল রোল অবজারভার' করা হয়। তিনি প্রায় লক্ষাধিক ভুয়ো নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন।
হিংসামুক্ত ভোট পরিচালনা: মূল নির্বাচনের সময় তিনি স্পেশাল অবজার্ভার হিসেবে কাজ করেন। কয়েকশো কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীর বণ্টন এবং বুথ স্তরে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করেন। তাঁর অভয়বাণী ছিল— "ভয় পাবেন না, কাকে ভোট দিচ্ছেন কেউ জানতে পারবে না।" এই সবকিছুই তাঁকে নতুন সরকারের চোখে বিশ্বস্ত করে তুলেছে।
সুব্রত গুপ্ত তাঁর কর্মজীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের নায়ক হিসেবে পরিচিত:
ডিজিটাল বাজেটের রূপকার: অর্থ দপ্তরের যুগ্ম সচিব থাকাকালীন তিনি হাতে লেখা বাজেট ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে কম্পিউটার পরিচালিত আধুনিক বাজেট ব্যবস্থার সূচনা করেন।
শিল্প ও পরিকাঠামো: রাজ্যের শিল্পোন্নয়ন নিগমের দায়িত্বে থাকাকালীন অন্ডাল বিমাননগরী এবং বিভিন্ন শিল্পতালুকের জমি অধিগ্রহণে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এ ছাড়া ‘ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো’ প্রকল্পের শুরুর দিকের অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি।
তৃণমূল আমলে ‘উপেক্ষা’: প্রশাসনের অন্দরে কান পাতলে শোনা যায়, তৃণমূল জমানায় তিনি সরকারের খুব একটা ‘সুনজরে’ ছিলেন না। ফলে পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের পর দীর্ঘ সময় তাঁকে কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাটাতে হয়েছে। তবে অবসরের ঠিক আগে তিনি দিল্লির কেন্দ্রীয় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে ডেপুটেশনে যান।
সুব্রত গুপ্তের এই নতুন ইনিংস শুরু হওয়ার পর রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সুব্রত গুপ্ত বলেন,
এটি একটি বিরাট দায়িত্ব। মুখ্যমন্ত্রী আমার উপর ভরসা রেখেছেন। আমার লক্ষ্য হবে বাংলায় কর্মসংস্থান ফেরানো এবং প্রশাসনিক কাজকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। আমি চাইব বাংলার মানুষ এবং সমস্ত কর্মীদের সহযোগিতা নিয়ে যেন একটি স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তুলতে পারি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যে দক্ষতায় তিনি নির্বাচন সামলেছেন, তাতে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনে তাঁর আসাটা ছিল কেবল সময়ের অপেক্ষা।
তবে তৃণমূল শিবিরের কিছু অন্দরের গুঞ্জন অনুযায়ী, একজন প্রাক্তন অবজার্ভারকে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা করা নিয়ে নৈতিকতার প্রশ্ন তোলা হতে পারে, যদিও সরকারিভাবে এখনও কড়া কোনো প্রতিবাদ আসেনি।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সুব্রত গুপ্তের নিয়োগ পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনে একটি 'প্যারাডাইম শিফট' বা আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
১. আমলাতন্ত্রের সংস্কার: দীর্ঘদিন সিভিল সার্ভিসের যে অংশটি স্থবির হয়ে পড়েছিল, সুব্রত গুপ্তের মতো কঠোর অনুশাসক সেখানে গতির সঞ্চার করতে পারেন।
২. শিল্প ও কর্মসংস্থান: সিঙ্গুর থেকে দিল্লি—শিল্প দপ্তরের তাঁর পুরনো অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে বড় বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা করছেন।
৩. দুর্নীতি দমন: ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং স্বচ্ছ ডেটা ব্যবস্থাপনায় তাঁর আগ্রহ প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা আনবে।
তবে সুব্রত গুপ্তের সামনে পথটা খুব একটা মসৃণ নয়।
প্রশাসনিক প্রতিরোধ: সচিবালয় থেকে ইতিমধ্যেই অনেক অফিসারকে সরানো হয়েছে। নিচের স্তরে যারা আগের সরকারের অনুগত ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে অসহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
আর্থিক সংকট: রাজ্যের কোষাগারের যা দশা, তাতে বড় কোনো উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ফান্ড জোগাড় করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সিঙ্গুরের স্মৃতি: বাম জমানায় তাঁর সিঙ্গুর ভূমিকার কথা বিরোধীরা বারবার মনে করিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
সুব্রত গুপ্ত একজন এমন একজন মানুষ যিনি কাজ করতে ভালোবাসেন নিঃশব্দে, কিন্তু তাঁর কাজের প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। শুভেন্দু অধিকারীর 'রাইট হ্যান্ড' হিসেবে তাঁর নিয়োগ এটিই প্রমাণ করে যে, নতুন সরকার আবেগের বদলে প্রশাসনিক দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলার শিল্পায়ন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা—আগামী পাঁচ বছর সুব্রত গুপ্তের মস্তিস্কই যে নবান্নের মূল চালিকাশক্তি হতে চলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।







