কেন সুদান গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে অরক্ষিত মহিলারা?
War Strategy in Sudan: আরএসএফ নামে পরিচিত সুদানের আধা সামরিক বাহিনী যুদ্ধে কেবল সামরিক ভাবে লড়াই করছে তাই নয়, তারা সুদানের নারীদের উপর যৌন সহিংসতাকে একটি পরিকল্পিত ও সাংগঠনিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে।

সুদানের দীর্ঘ চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে এক মানবাধিকার সংস্থা সম্প্রতি একটি খুবই গুরুতর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (RSF) নামে পরিচিত সুদানের আধা সামরিক বাহিনী যুদ্ধে কেবল সামরিকভাবে লড়াই করছে তাই নয়, তারা সুদানের নারীদের উপর যৌন সহিংসতাকে একটি পরিকল্পিত ও সাংগঠনিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। এই সহিংসতা এতটাই ব্যাপক যে এটি এক-দু'টি ঘটনা নয়, রীতিমতো নিয়মিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে, এমনটাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
রিপোর্টটি প্রকাশ করেছে স্ট্র্যাটেজিক ইনিশিয়েটিভ ফর ওমেন ইন দ্য হর্ন অব আফ্রিকা (Strategic Initiative for Women in the Horn of Africa) নামের একটি সংস্থা, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এই গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে নারী ও মেয়েদের উপর সংঘটিত যৌন ও লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার মতো ঘটনাগুলি নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছিল। তাদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে ১৪টি রাজ্যে প্রায় ১,৩০০টি ঘটনা ধরা পড়েছে যেখানে হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করা গিয়েছে। এই ঘটনাগুলি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আরএসএফের দায়ী থাকার হার প্রায় ৮৭ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, অনেক ক্ষেত্রেই যৌন সহিংসতা ছাড়াও শিশুদেরও আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে।
এগুলো কোনোটি হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া এলোমেলো ঘটনা ছিল না। ওই প্রতিবেদনে আরএসএফের কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট ধরন তুলে ধরা হয়েছে: প্রথমে যখন তারা কোনো শহর বা গ্রামে প্রবেশ করে, সেখানকার ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ডাকাতির পাশাপাশি নারীদের ধর্ষণ ও নিপীড়ন শুরু হয়; এরপর তারা নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলার পর জনসমক্ষে বা রাস্তার মতো খোলা জায়গাতেও এই ধর্ষণগুলি চালিয়ে যায়; এবং অনেক ক্ষেত্রে নারীদের আটক করে রেখে তাদের উপর আরও ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়, গণধর্ষণ এবং জোরপূর্বক ‘বিয়ে’ করিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sudan Massacre: দারফুরের অনেকেই মনে করেন, আরএসএফ ও তাদের মিত্র মিলিশিয়ারা অঞ্চলটিকে পুরোপুরি আরবদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে।
এই সব কিছু ঘটছে এমন সময় যখন সুদানের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা এল-ফাশির মতো জায়গাগুলিতে আরএসএফ নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধ, অপহরণ ও অত্যাচারের হাত থেকে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক নারী ও মেয়েরা পালানোর সময় অথবা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই আরএসএফের সদস্যদের হাতে তাদের উপর যৌন অত্যাচারের শিকার হয়েছেন বলে স্থানীয় চিকিৎসকদের দল নিশ্চিত করেছে, এমনকি বেশ কিছু নারী গর্ভবতী ছিলেন বলেও জানান তাঁরা।
এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি যাঁরা সংঘাতকালে যৌন সহিংসতার বিষয়ে কাজ করেন তাঁরা এই ধরণের অপরাধকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন এবং এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, শুধুমাত্র কিছু কাগজ লিখে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসব বন্ধ হবে না, বাস্তবে যেভাবে নারীদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে, তা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন আন্তর্জাতিক মহল আরএসএফের বিরুদ্ধে নানা রকম জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। যুক্তরাজ্য-সহ কিছু দেশ আরএসএফের সিনিয়র কমান্ডারদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং এই সংঘাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিকল্পিতভাবে, ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত এই যৌন সহিংসতা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধবিধির সরাসরি লঙ্ঘন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে শুধু বর্তমান প্রজন্মই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ও সামাজিক কাঠামোও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এই প্রতিবেদন কেবল অভিযোগের তালিকা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সমাজের জন্য এক জোরালো সতর্কবার্তা। দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সংঘাত বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন আর নৈতিক আহ্বান নয়, বরং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মানবিক দায়িত্ব।






