চার বছরেও থামেনি সুদানের যুদ্ধ, ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সাহায্যে বদলাবে পরিস্থিতি?

Sudan Crisis: সুদানের যুদ্ধ চার বছরে পড়লেও কেন থামছে না সংঘাত? ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি কি বদলাতে পারবে কোটি মানুষের জীবন? খার্তুম থেকে দারফুর, দুর্ভিক্ষ, শরণার্থী সংকট আর গণহত্যার অভিযোগের মাঝে সুদানের সামনে কি আদৌ শান্তির কোনো পথ খোলা আছে?

inscript
৩ মিনিট
চার বছরেও থামেনি সুদানের যুদ্ধ, ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সাহায্যে বদলাবে পরিস্থিতি?

সুদানের গৃহযুদ্ধ চতুর্থ বছরে পড়তেই আবারও সামনে এসেছে বিশ্বের অন্যতম বড় সংকটের ছবি। বার্লিনে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা মিলিয়ে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বিপুল অর্থ প্রতিশ্রুতির পরেও কি যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের পরিস্থিতি বদলাবে?

২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখনও থামেনি। একদিকে সুদানের সেনাবাহিনী, অন্যদিকে আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফ। ক্ষমতার লড়াই থেকে শুরু হওয়া সংঘাত এখন পুরো দেশকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। রাজধানী খার্তুম থেকে দারফুর— সর্বত্র চলছে বোমা, গোলাবর্ষণ, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও দুর্ভিক্ষ।

বার্লিনে আয়োজিত এই সম্মেলনে অংশ নেয় ৫০টিরও বেশি দেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আফ্রিকান ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা। সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সুদানের জন্য জরুরি মানবিক সাহায্য সংগ্রহ করা এবং আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ ফের এই যুদ্ধের দিকে টেনে আনা। কারণ ইউক্রেন, ইরান ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ভিড়ে সুদানের সংকট অনেকটাই আড়ালে চলে গিয়েছে।

জার্মান বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই সম্মেলনে ১.৫ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এসেছে। এর মধ্যে বড় অংশই দেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তার সদস্য দেশগুলি। জার্মানি একাই ২১২ মিলিয়ন ইউরো সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই অর্থ শুধু সুদানের ভিতরে নয়, প্রতিবেশী দেশগুলিতেও ব্যবহার হবে, যেখানে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন।

কিন্তু এই সাহায্যের অঙ্ক যত বড়ই হোক, বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে সুদানের প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ খাদ্য, ওষুধ, বিশুদ্ধ জল এবং আশ্রয়ের সংকটে ভুগছেন। অন্তত ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বহু মানুষ দেশ ছেড়ে চাদ, দক্ষিণ সুদান, মিশর বা ইথিওপিয়ায় পালিয়ে গিয়েছেন।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দারফুর অঞ্চলে। সেখানে আরএসএফের বিরুদ্ধে জাতিগত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ এবং গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলছেন, দারফুরে যা হচ্ছে, তার মধ্যে গণহত্যার লক্ষণ স্পষ্ট। শুধু এল-ফাশের এলাকায় কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। উপগ্রহ চিত্রে পর্যন্ত রক্তাক্ত রাস্তা ও গণকবরের ছবি দেখা গিয়েছে।

যুদ্ধের ফলে শুধু মানুষ মরছে না, ধ্বংস হচ্ছে গোটা দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোও। বহু হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি আর কাজ করছে না। চিকিৎসা, টিকাকরণ, শিশুদের পুষ্টি—সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বহু এলাকায় মানুষ দিনে একবেলা খাবারও পাচ্ছেন না। অনেকেই বাধ্য হয়ে এমন জিনিস খাচ্ছেন, যা আদৌ খাবার নয়।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই যুদ্ধকে 'দুঃস্বপ্ন' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, সুদানের মানুষকে এই নরকযন্ত্রণা থেকে বের করে আনতে হলে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে।

তবে এই সম্মেলন নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছে সুদানের সরকার। খার্তুমের বিদেশ মন্ত্রক বার্লিন বৈঠককে 'ঔপনিবেশিক অভিভাবকসুলভ মনোভাব' বলে কটাক্ষ করেছে। তাদের অভিযোগ, সুদানের সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করেই বিদেশি শক্তিগুলি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। আরএসএফ-ও এই বৈঠককে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে যুদ্ধ থামানোর রাজনৈতিক রাস্তা এখনও খুবই অনিশ্চিত।

সুদানের এই সংঘাতের পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নেই, রয়েছে আন্তর্জাতিক প্রভাবও। বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি একেক পক্ষকে সমর্থন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এই যুদ্ধ এখন শুধু সুদানের সমস্যা নয়, গোটা আফ্রিকার স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই সংঘাত আরও বহু দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি কি যথেষ্ট? বাস্তবে এখনও ২০২৬ সালের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ১৬ শতাংশ জোগাড় হয়েছে। যুদ্ধ থামানোর কোনো কার্যকর রূপরেখাও নেই।

[

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।

হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

Houthi Expansion in Yemen: ইয়েমেনে ফের কেন যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? হুথিরা কীভাবে স্থানীয় জায়দি আন্দোলন থেকে শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হল? ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর? মোখা ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখলের পর কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব? এই সংঘাতের প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়বে?