২০ দিনে চিনির দাম বেড়েছে ২০ টাকা! ই-২০ নীতি নয়, এর পিছনে রয়েছে অন্য কারণ
sugar price hike: হঠাৎ কী এমন ঘটল যে দেশজুড়ে চিনির ভাঁড়ারে এমন টান পড়ল? বাজারে কান পাতলেই একটা বড় অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এবং বেশ কিছু ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবি—এই সংকটের মূল খলনায়ক নাকি কেন্দ্রীয় সরকারের ‘E-20 পেট্রোল নীতি’।
পুজোর আর মোটে কটা দিন বাকি। বাজারে বাজারে যখন নতুন জামাকাপড়ের ভিড় উপচে পড়ার কথা, ঠিক তখনই মধ্যবিত্তের মুখে মুখে হেঁশেলের অপরিহার্য এক খাদ্যদ্রব্য নিয়ে চলছে চর্চা। মিষ্টির দোকান থেকে পাড়ার চায়ের ঠেক—সর্বত্রই এখন একটাই আলোচনা, চিনির দামের এই লাগামছাড়া দৌড়।
পরিস্থিতিটা ঠিক কতটা উদ্বেগজনক, তা বুঝতে বেশি পিছনে যেতে হবে না। মাত্র এক মাস আগেও, অর্থাৎ জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে যে খুচরো চিনি বাজারে বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায়, অগাস্টের তৃতীয় সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই কলকাতার মানিকতলা বা লেক মার্কেটের মতো জায়গায় সেই দাম পৌঁছে গিয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকার ঘরে। উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র বা কর্ণাটকেও একই ছবি—এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা।
চিনির দামের এই আচমকা লাফে শুধু চিনির বয়ামই ফাঁকা হচ্ছে না, ঘা পড়ছে নিত্যদিনের আরও অনেক জিনিসে। চিনির হাত ধরে চড়চড় করে দাম বাড়ছে বাতাসা, নকুলদানা, গুড় এবং গুঁড়োদুধের। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসে লেগেছে মিষ্টির দোকানে। পুজোর মুখে রসগোল্লা, সন্দেশের দাম না বাড়িয়ে উপায় থাকছে না কারিগরদের। এমনকী পাড়ার মোড়ের যে চায়ের দোকানে বসে মানুষ রাজনৈতিক তক্কো জমাত, সেখানেও এক কাপ দুধ-চায়ের দাম ১২ টাকা থেকে এক লাফে বেড়ে হয়ে গিয়েছে ১৪ টাকা। টান পড়ছে মধ্যবিত্তের মাসের নির্দিষ্ট বাজেটে।
কিন্তু হঠাৎ কী এমন ঘটল যে দেশজুড়ে চিনির ভাঁড়ারে এমন টান পড়ল?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dimagi Naxal: ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঠিক কী ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছেন? এটি শুধুই সশস্ত্র নকশালবাদের বিরুদ্ধে সতর্কতা, নাকি ভিন্নমতাবলম্বী, বুদ্ধিজীবী ও প্রতিবাদীদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করার কৌশল? ভাষা, ক্ষমতা, লেবেলিং ও ‘অন্য’ নির্মাণের রাজনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়?
বাজারে কান পাতলেই একটা বড় অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এবং বেশ কিছু ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবি—এই সংকটের মূল খলনায়ক নাকি কেন্দ্রীয় সরকারের ‘E-20 পেট্রোল নীতি’। পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ আখের রস ও চিনি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে জ্বালানি তৈরিতে। ফলে বাজারে চিনির কৃত্রিম আকাল তৈরি হয়েছে।
কিন্তু সত্যিই কি চিনির এই আকাশছোঁয়া দামের জন্য দায়ী ইথানল প্রকল্প? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনো জটিল অঙ্ক?
সরকারি তথ্য ও বাস্তব পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বিষয়টা একেবারেই এত সরল নয়।
প্রথমত, আমাদের অনেকের মনেই একটা ভুল ধারণা রয়েছে যে ইথানল তৈরি করতে বুঝি কেবল আখের রস বা চিনিই লাগে। বাস্তব কিন্তু তা বলে না। ইথানল তৈরির বহু বিকল্প কাঁচামাল রয়েছে। এখন ভারতে উৎপাদিত মোট ইথানলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ (প্রায় ৬৮ থেকে ৭৫ শতাংশ) তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন খাদ্যশস্য থেকে—বিশেষ করে ভুট্টা, ভাঙা চাল এবং ফুড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার অতিরিক্ত মজুত খাদ্যশস্য থেকে। সরাসরি আখের কাঁচামাল থেকে আসছে মাত্র ৩২ শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে দেশের মোট চিনির যেখানে প্রায় ১২ শতাংশ ইথানল তৈরিতে যেত, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ শতাংশে। ফলে ইথানলের জন্য চিনির বাজারে বিরাট টান পড়েছে, এই দাবি বাস্তবসম্মত নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pellet Gun Use in Delhi Protest: ২০ জুলাই দিল্লির প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে ২১ অগাস্ট এফআইআর দায়ের হওয়া পর্যন্ত কী কী ঘটল? আন্দোলনকারীদের শরীরে কীভাবে ছররার আঘাত লাগল, পুলিশ ও RAF-এর ভূমিকা নিয়ে কী তথ্য সামনে এল, হাসপাতালের নথি ও পুলিশের জেনারেল ডায়েরিতে কী উল্লেখ ছিল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে এফআইআর দায়ের হলো?
তাহলে চিনির দামে এই ‘আগুন’ লাগার আসল কারণটা কী?
খতিয়ে দেখলে বোঝা যাচ্ছে, আসল সংকটের কারণ প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা এবং মানুষের অতিরিক্ত মুনাফালোভী মানসিকতা।
১. প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন: চলতি মরশুমে দেশে চিনি উৎপাদনের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৩৪৩ লক্ষ মেট্রিক টন। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৩০৬ থেকে ৩০৯ লক্ষ টনে। অর্থাৎ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩৪ থেকে ৩৭ লক্ষ টন।
২. অতি-বৃষ্টি ও ফসলে রোগ: গত বছর মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের মতো প্রধান আখ উৎপাদক রাজ্যগুলিতে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে দীর্ঘ সময় জল জমে ছিল জমিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ‘রেড রট’ ও ‘টপ বোরার’-এর মতো পোকা ও রোগের প্রকোপ। ফলে আখের ফলনে তার প্রভাব পড়েছে এবং আখ থেকে চিনি পাওয়ার হারও কমে গিয়েছে।
৩. বিশ্ববাজারের টান: শুধু ভারত নয়, খরা ও আবহাওয়ার কারণে ব্রাজিল-সহ আন্তর্জাতিক বাজারেও চিনির সংকট দেখা দিয়েছে। গত দু’মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম প্রতি টনে ৪৭৪ ডলার থেকে বেড়ে ৫৫২ ডলার ছাড়িয়েছে।
৪. মজুতদারি ও কালোবাজারি: সবচেয়ে বড় কারণ এটাই। উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা এবং সামনেই দুর্গাপুজো ও দীপাবলির মতো বড় উৎসবে চিনির চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে একাধিক বড় চিনিকল ও পাইকারি মজুতদার বিপুল পরিমাণ চিনি গুদামে আটকে রেখে বাজারে জোগানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে মিলগুলির দরপত্রে—মাত্র ৭ থেকে ১০ দিনের ব্যবধানে চিনির এক্স-মিল (কারখানা থেকে বেরোনোর) দাম কেজিপ্রতি ৪৭-৪৮ টাকা থেকে লাফিয়ে পৌঁছে গিয়েছে ৬০-৬২ টাকায়। সাধারণ অর্থনীতির কোনো সরল নিয়ম দিয়ে এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
শুধু তাই নয়, আর্থিক টানাটানিতে থাকা কিছু মিল সরকারের বেঁধে দেওয়া মাসিক কোটার অতিরিক্ত চিনি আগেই বেআইনিভাবে বাজারে ছেড়ে দিয়েছিল। ফলে কাগজে-কলমে খাতায় মজুত দেখা গেলেও বাস্তবে বহু মিলের গুদাম খালি ছিল। আর সেই ফাঁক গলে সুযোগসন্ধানী বড় ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই মাল মজুত করে ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাতে শুরু করে।
মোদ্দাকথা হলো, পেট্রোলে ইথানল মেশানোর নীতি দেশের তেল আমদানির বিপুল খরচ বাঁচিয়েছে এবং কৃষকদের আখের বকেয়া টাকা পাওয়ার পথ সুগম করেছে ঠিকই, কিন্তু উৎসবের মুখে চিনির বাজারে সাধারণ মানুষের যে ‘ছ্যাঁকা’, তার আসল কারণ প্রকৃতি ও ফসলের ক্ষতি, আর তার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের কালোবাজারির খেলা। সরকার কড়া হাতে এই মজুতদারি রুখতে কতটা সফল হয়, তার উপরই নির্ভর করছে বাঙালির আসন্ন পুজোর মিষ্টিমুখ কতটা মিষ্টি থাকবে।






