পুলিশি এনকাউন্টার কি ন্যায়বিচার? যা বলছে সুপ্রিম কোর্ট
Justice or Execution: সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান স্পষ্ট, এনকাউন্টার কোনো ‘বিচার’ নয়। আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাউকে হত্যা করা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ (এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কিলিং), যা সরাসরি সংবিধানের ২১ নং ধারার লঙ্ঘন।
(চিত্রঋণ: আজকাল)
পুলিশি এনকাউন্টার শব্দটি এখনও ভারতীয় গণমাধ্যম ও জনমনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। অপরাধ যত নৃশংসই হোক অভিযুক্তের মৃত্যু কি আইনের চোখে ‘ন্যায়বিচার’, নাকি তা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’? এই প্রশ্নে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান বহু দশক ধরেই স্পষ্ট থেকেছে। আদালত বারবার বলেছে, সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার), রাষ্ট্রের পক্ষেও লঙ্ঘনযোগ্য নয়। এনকাউন্টারকে কেবল পুলিশের ‘আত্মরক্ষা’ বলে দাবি করলেই তা বৈধ হয়ে যায় না। প্রতিটি মৃত্যুর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত আবশ্যিক।
পিইউসিএল মামলা, ২০১৪
সুপ্রিম কোর্টের এনকাউন্টার-বিরোধী অবস্থানের মূল ভিত্তি হলো, ২০১৪ সালের ‘পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (পিইউসিএল) বনাম মহারাষ্ট্র রাজ্য’ মামলা। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে মুম্বই পুলিশের বিরুদ্ধে আনা প্রায় ৯৯টি এনকাউন্টারে ১৩৫ জনের মৃত্যুর ঘটনার অভিযোগের তদন্তের নির্দেশ দিতে গিয়ে আদালত বলেছিল,
“পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুর তদন্ত স্বাধীনভাবে হওয়া প্রয়োজন, কারণ তা আইনের শাসন ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে”
বিচারপতি আর.এম. লোধার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট বলেছিল,
“অপরাধী যত বিপজ্জনকই হোক, তাকে আইনের শাসন মেনেই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে; পুলিশের কাজ তাকে গুলি করে হত্যা করা নয়”
এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ১৬টি বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা জারি করে, যা আজও এনকাউন্টার বিষয়ক তদন্তের ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি)’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
নির্দেশিকাটির মূল বিষয়গুলি হলো:
আগাম খবর নথিভুক্ত করা: কোনো গুরুতর অপরাধের খবর পেলে পুলিশকে তা থানার জেনারেল ডায়েরি বা কেস ডায়েরিতে অবশ্যই লিখতে হবে।
এফআইআর বাধ্যতামূলক: এনকাউন্টারে মৃত্যু হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নয় বরং পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআর রুজু করতে হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Double encounter: একই দিনে গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হলো দুই অভিযুক্তের। উত্তরপ্রদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কি এবার বাংলায়? অপরাধ দমনের নামে পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যু কি আইনের শাসন ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে?
স্বাধীন তদন্ত: তদন্ত হবে সিআইডি বা অন্য থানার পুলিশ অফিসারদের দ্বারা; ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ অফিসারদের দিয়ে নয়।
ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তদন্ত: মৃত্যুর ঘটনায় অবশ্যই ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তদন্ত (ম্যাজিস্ট্রিয়াল ইনকোয়ারি) করাতে হবে।
ফরেনসিক প্রমাণ: ঘটনাস্থলের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করতে হবে।
মানবাধিকার কমিশনকে জানানো: ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন এবং এনএইচআরসিকে (জাতীয় মানবাধিকার কমিশন) রিপোর্ট পাঠাতে হবে।
পুরস্কার ও পদোন্নতিতে নিষেধাজ্ঞা: এনকাউন্টারের সত্যতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত জড়িত পুলিশ অফিসারদের ‘আউট-অব-টার্ন’ পদোন্নতি বা বীরত্বের পুরস্কার দেওয়া যাবে না।
সুপ্রিম কোর্ট ২০২৫ সালের একটি রায়ে স্পষ্ট বলেছে যে, এগুলি বাধ্যতামূলক এবং ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ না করলেও রাষ্ট্রকে এগুলি পালন করতে হবে।
২০২৫-এর আসাম মামলা
২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট, নিজের এনকাউন্টার-বিরোধী অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে। আসামে, ২০২১ সালের মে মাস থেকে ২০২২ সালের অগাস্ট মাসের মধ্যে ১৭১টি এনকাউন্টারে ৫৬ জনের মৃত্যুর, ১৪৫ জনের আহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এই রায়ে আদালত আরও একবার স্পষ্ট করে বলেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Baruipur case: বারুইপুরের পুলিশি এনকাউন্টার আইন, বিচার এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। অপরাধ যতই ভয়াবহ হোক, আদালতের বিচার ছাড়া কাউকে হত্যা করা কি ঠিক?
“এনকাউন্টারে মৃত্যু হলে কেবল ‘আত্মরক্ষা’র দাবি যথেষ্ট নয়; তদন্তে প্রমাণ করতে হবে যে পুলিশের পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল”
আদালত আরও নির্দেশ দেয়, অভিযুক্তদের আইনি সহায়তা দিতে আসাম রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষকে (এএসএলএসএ) কাজে লাগাতে হবে।
বদলাপুর মামলা, ২০২৫
২০২৫ সালের মে মাসে বদলাপুর এনকাউন্টার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রাখে। একজন পকসো (পিওসিএসও) অভিযুক্তের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনায় বোম্বে হাইকোর্ট পাঁচ পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে এফআইআর করার ও এসআইটি (বিশেষ তদন্ত দল) গঠনের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলে, দ্বিতীয় এফআইআর রুজু করার প্রয়োজন নেই, কারণ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই এফআইআর হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব থাকবে রাজ্য পুলিশের ডিজিপি (ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ) দ্বারা গঠিত এসআইটির উপর। আদালতের মূল বক্তব্য ছিল যে, তদন্ত প্রক্রিয়াকে ‘একাধিক এফআইআর’ দিয়ে জটিল না করে একটি স্বাধীন তদন্ত কাঠামোর মধ্যে রাখতে হবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকার পাশাপাশি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) ১৯৯৭ এবং ২০১০ সালে এই বিষয়ে নিজস্ব নির্দেশিকা জারি করেছে। এতে এনকাউন্টারে মৃত্যু হলে বাধ্যতামূলক এফআইআর, ম্যাজিস্ট্রিয়াল তদন্ত এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এনএইচআরসিকে রিপোর্ট পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও একাধিক রায়ে বলেছে, এনকাউন্টার বিষয়ক তদন্তে ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘জবাবদিহি’ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু রিপোর্ট জমা দিলেই হবে না, তার যথাযথ পর্যালোচনাও করতে হবে।
‘বিচার’ বনাম ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’র সীমারেখা
সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান স্পষ্ট, এনকাউন্টার কোনো ‘বিচার’ নয়। আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাউকে হত্যা করা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ (এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কিলিং), যা সরাসরি সংবিধানের ২১ নং ধারার লঙ্ঘন। আদালত বারবার বলেছে, পুলিশের কাজ অপরাধীকে ‘শাস্তি’ দেওয়া নয়, বরং তাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে বিচারের মুখোমুখি করা।
তথ্যসূত্র
১। বার অ্যান্ড বেঞ্চ। ২০১৯, ৬ ডিসেম্বর। ইভেন স্টেট হ্যাজ নো অথরিটি টু ভায়োলেট আর্টিকেল ২১: হোয়াট দ্য সুপ্রিম কোর্ট সেড অ্যাবাউট এনকাউন্টার কিলিংস ব্যাক ইন ২০১৪।
২। ইন্ডিয়ান কানুন। ২০১৪, ২৩ সেপ্টেম্বর। পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ বনাম দ্য স্টেট অব মহারাষ্ট্র।
৩। কমন কজ ইন্ডিয়া। ২০২৬। প্যানেল ডিসকাশন: প্রকাশ সিং, ফরমার ডিজিপি।
৪। সুপ্রিম কোর্ট অবজারভার। ২০২৫, ২ জুন। এনফোর্সমেন্ট অব পিইউসিএল গাইডলাইনস নট কন্টিনজেন্ট অন ডাইরেক্ট ভিকটিম পার্টিসিপেশন।
৫। দ্য হিন্দু। ২০২৫, ২৮ মে। সুপ্রিম কোর্ট ডাইরেক্টস আসাম হিউম্যান রাইটস কমিশন টু প্রব অ্যালিগেশনস অব পুলিশ এনকাউন্টার্স।
৬। এশিয়ান এজ। ২০২৫, ২৮ মে। এসসি আস্কস আসাম হিউম্যান রাইটস কমিশন টু প্রব অ্যালিজড ফেক এনকাউন্টার্স।
৭। দ্য হিন্দু। ২০২৫, ৫ মে। প্রব অন বাদলাপুর ‘এনকাউন্টার’: সুপ্রিম কোর্ট ডাইরেক্টস মহারাষ্ট্র ডিজিপি টু পিক এসআইটি।
৮। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। ২০২৫, ৮ মে। বাদলাপুর এনকাউন্টার: সেকেন্ড এফআইআর নট নিডেড, সেজ সুপ্রিম কোর্ট ইন আপডেটেড অর্ডার।
৯। ডেকান হেরাল্ড। ২০২৫, ২৮ মে। ‘টু এনশিওর জাস্টিস টু ভিকটিমস, ফ্যামিলিজ’: এসসি ডাইরেক্টস আসাম রাইটস প্যানেল টু ইনকোয়ায়ার ইনটু ফেক এনকাউন্টার চার্জেস ইন স্টেট।







