একদিনে জোড়া এনকাউন্টার: গাইঘাটা থেকে সামশেরগঞ্জ, কী ঘটেছিল?
Double encounter: একই দিনে গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হলো দুই অভিযুক্তের। উত্তরপ্রদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কি এবার বাংলায়? অপরাধ দমনের নামে পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যু কি আইনের শাসন ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে?
একদিকে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা, অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ। ২৭ অক্টোবর, একই দিনে রাজ্যের দুই প্রান্তে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হলো দুই অভিযুক্তের। একজনের বিরুদ্ধে এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ ছিল, অন্যজন বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় মূল অভিযুক্ত বলে পরিচিত। দুটি ঘটনাতেই অপরাধের পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয় বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে ঘটল এই জোড়া এনকাউন্টার?
গাইঘাটার ঘটনাটি শুরু হয় এক কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার খবর দিয়ে। ১৭ বছরের ওই কিশোরী একাদশ শ্রেণিতে পড়ত। পরিবারের সদস্যদের দাবি, শনিবার রাতে বাড়ির কাছেই একটি জলসা দেখতে গিয়েছিল সে। সেখানে তার বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের পরিচিতরাও ছিলেন। অনুষ্ঠান চলাকালীন রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ একটি ফোন আসে কিশোরীর কাছে। ফোন পাওয়ার পর সে অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু তারপর আর বাড়ি ফেরেনি। রাত বাড়তে থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের লোকজন। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। পরদিন সকালে এক আত্মীয়ের বাড়ির পিছনে শৌচাগারের কাছ থেকে কিশোরীর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কিশোরীর এক আত্মীয় প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেফতার করা হয়।
গভীর রাতে কীভাবে গুলি চলল গাইঘাটায়?
তদন্তের অংশ হিসেবে প্রহ্লাদকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে যায় পুলিশ। সোমবার গভীর রাতে তাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ফেরার পথেই গুলি চলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, প্রহ্লাদ এক পুলিশকর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদের লক্ষ্য করে পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালায়। আচমকা এই ঘটনায় এক পুলিশকর্মী আহত হন। প্রাণ বাঁচাতে এক পুলিশকর্মী রাস্তার পাশের জলাশয়ে ঝাঁপ দেন।
এরপর পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। পুলিশের দাবি, মোট চার রাউন্ড গুলি চালানো হয় এবং তার মধ্যে একটি গুলি প্রহ্লাদের গায়ে লাগে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করে। আহত পুলিশকর্মীরও চিকিৎসা করা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Maoist encounter: অতীতে বাস্তারে একাধিক এনকাউন্টার ভুয়ো বলে প্রমাণিত হয়েছে। গত ২৫ বছরে বাস্তারে যে হাজার হাজার এনকাউন্টার হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র দু'টি বিচার বিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি হয়েছে।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই কিশোরীর পরিবারের প্রতিক্রিয়া সামনে আসে। মেয়েকে হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে তাঁর বাবা বলেন, মেয়েকে তো আর ফিরে পাবেন না। পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করেন। তবে প্রহ্লাদের ভাইয়ের দাবি, ঘটনার রাতে প্রহ্লাদ বাড়িতেই ঘুমোচ্ছিল এবং পরে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়।
সামশেরগঞ্জে সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় দ্বিতীয় এনকাউন্টার
গাইঘাটার ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ থেকে আরও একটি এনকাউন্টারের খবর সামনে আসে। এবার মৃতের নাম সামাউন শেখ। বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় তাকে মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
সুজিত মণ্ডল ২৮ অগাস্ট নিখোঁজ হয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা তাঁর খোঁজ না পেয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হন। পরে ২ সেপ্টেম্বর তাঁর দেহের কিছু অংশ উদ্ধার হয়। অভিযোগ, তাঁকে খুন করার পর দেহ টুকরো করে ভাগীরথীর ফিডার ক্যানেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব পরে সিআইডির হাতে যায়। মামলায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সুজিতকে খুন করার অভিযোগে সামাউনকে মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Maoist Leader Chalpati: চালাপতির কাছে বাস্তারের ঘন, দুর্ভেদ্য বন ছিল হাতের তালুর মতো চেনা। ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তিগত রক্ষী থাকত তাঁর নিরাপত্তায়।
ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার পর কী ঘটল?
মঙ্গলবার সিআইডির একটি দল সামাউনকে নিয়ে সুজিত মণ্ডলকে খুনের ঘটনাস্থলে যায়। সামশেরগঞ্জের পুরনো ডাকবাংলা এলাকার ভুটু মার্কেটের একটি ভাড়াবাড়িতে সুজিতকে খুন করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছিল। ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য সেই জায়গা পরিদর্শন করা হচ্ছিল। তদন্তকারীরা ওই এলাকার পাশাপাশি ফিডার ক্যানেলও ঘুরে দেখেন এবং সুজিতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন।
সিআইডির দাবি, সেই সময় সামাউন পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং গুলি চালায়। পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ। তাতে গুরুতর আহত হয় সামাউন। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করে।
একই দিনে, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজ্যের দুই প্রান্তে পরপর দুটি এনকাউন্টার। গাইঘাটায় প্রহ্লাদ দাস এবং সামশেরগঞ্জে সামাউন শেখ, দু’জনের বিরুদ্ধেই গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ছিল। দুই ক্ষেত্রেই পুলিশের দাবি, অপরাধের পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্তরা অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালানোর চেষ্টা করে, আর তার জেরেই পাল্টা গুলি চালাতে হয় পুলিশকে।
এর আগে বারুইপুরের ১১ বছরের নাবালিকা যৌন নির্যাতন ও খুন মামলার অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু হয়েছে। এই একের পর এক এনকাউন্টারের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই উত্তরপ্রদেশের পুলিশি এনকাউন্টার মডেলের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। কারণ, ২০১৭ সালে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই উত্তরপ্রদেশ সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথা বলে আসছে। সেই নীতির অন্যতম আলোচিত দিক হলো পুলিশি এনকাউন্টার। প্রশ্ন উঠছে, বিচারের আগেই কেন এনকাউন্টার? পশ্চিমবঙ্গেও কি তবে উত্তরপ্রদেশের মতো পুলিশি এনকাউন্টারের নতুন সংস্কৃতির সূচনা হলো?
ভারতীয় সংবিধানের ১৪ ও ২১ ধারা আইনের শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর। ১৪তম ধারা আইনের সামনে সমতা ও আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে ২১তম ধারা এই অধিকার প্রদান করে যে-আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুযায়ী ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
মেনকা গান্ধী বনাম ভারতীয় ইউনিয়ন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অবশ্যই 'ন্যায্য, ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসঙ্গত' হতে হবে এবং তা 'অন্যায় বা স্বেচ্ছাচারী' হতে পারে না। কর্তার সিং বনাম পাঞ্জাব রাজ্য মামলায় প্রতিষ্ঠিত হয় যে একটি পদ্ধতি ন্যায্য, ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসঙ্গত হওয়ার জন্য, তাকে অবশ্যই প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতিগুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে, যার মূল নীতি 'অডি আলটেরাম পার্টেম' অর্থাৎ শুনানির অধিকার।
এনকাউন্টারে হত্যাকাণ্ড এই সাংবিধানিক নিশ্চয়তাগুলিকে মৌলিকভাবে লঙ্ঘন করে।






