ছ’বছর ধরে জেলবন্দি, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষক সম্মান পেলেন উমর খালিদ
Umar Khalid Human Rights Award: এ বছর তাঁর সঙ্গে আরও চার জন মানবাধিকারকর্মী এই সম্মান পেয়েছেন। তাঁরা হলেন ইরানের মৃত্যুদণ্ড-বিরোধী আন্দোলনকর্মী আহমদরেজা হায়েরি, অ্যাঙ্গোলার গণতন্ত্রকর্মী লরিন্ডা ম্যানুয়েল গুভেইয়া, ব্রাজিলের ব্ল্যাক ট্রান্স নারী ও অধিকারকর্মী আদ্দা ভিক্টোরিয়া কায়েতানো এবং সার্বিয়ার শান্তি ও নারীবাদী আন্দোলনের কর্মী লিলিয়ানা নেশিচ।
দীর্ঘ ছ’বছর ধরে জেলবন্দি ছাত্রনেতা ও মানবাধিকারকর্মী উমর খালিদকে ২০২৬ সালের ‘অ্যাওয়ার্ড ফর হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স অ্যাট রিস্ক’ সম্মানে ভূষিত করল আয়ারল্যান্ডের মানবাধিকার সংগঠন ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স। ৮ অক্টোবর ডাবলিনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই সম্মান দেওয়া হয়। তবে জেলে থাকার কারণে অনুষ্ঠানে নিজে উপস্থিত থাকতে পারেননি উমর।
২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লির দাঙ্গার ঘটনায় ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল উমর খালিদকে। তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত বিচার শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ইউএপিএ-সহ একাধিক আইনে মামলা রয়েছে। ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সের বক্তব্য, উমরের দীর্ঘদিনের কারাবাস ভারতে ভিন্নমতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস-বিরোধী আইন ব্যবহারের ‘বাড়তে থাকা প্রবণতা’র একটি উদাহরণ।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই ঘটনায় ৫৩ জনের মৃত্যু হয় এবং কয়েকশো মানুষ আহত হন। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম। পুলিশের অভিযোগ, এই হিংসা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন পরিকল্পিত ভাবে এই হিংসার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। সেই মামলাতেই উমর খালিদ, ছাত্রনেতা শারজিল ইমাম-সহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইউএপিএ, আর্মস অ্যাক্ট, প্রিভেনশন অব ড্যামেজ টু পাবলিক প্রপার্টি অ্যাক্ট এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Umar Khalid: ফলত, প্রান্তিক মানুষদের ভোটার তালিকায় আনার যে চেষ্টা, দেশের নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অধিকার- তার একেবার মূলে গিয়ে আঘাত করা হচ্ছে।
তবে উমর খালিদের পাশে দাঁড়িয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সের দাবি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের অধিকার প্রয়োগ করার কারণে মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং ছাত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্তও অনেক সময় বিচার শেষ হওয়ার আগেই শাস্তির মতো কাজ করছে বলে অভিযোগ সংগঠনটির।
উমর খালিদের বিরুদ্ধে মামলায় বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে তাঁর দেওয়া একটি বক্তৃতার কথা। সেই বক্তৃতাকে তদন্তকারী সংস্থা বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখেছে। কিন্তু ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সের দাবি, ওই বক্তৃতায় হিংসায় উস্কানি দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। বরং উমর সেখানে সিএএ-বিরোধী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের প্রশংসা করেছিলেন। ‘ইনকিলাবি সালাম’ এবং ‘ক্রান্তিকারি ইস্তিকবাল’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করার পাশাপাশি তিনি মহাত্মা গান্ধীর কথা উল্লেখ করে অহিংস আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন।
উমরের কারাবাস নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষজ্ঞদের একটি যোগাযোগে তাঁর দীর্ঘদিনের বিচারবিহীন আটক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচার ছাড়াই বন্দি রাখা এবং ফের জামিনের আবেদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষার শর্ত তাঁর স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অধিকারের প্রশ্ন তুলছে। একই সঙ্গে ইউএপিএ-র প্রয়োগ নিয়েও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিনের আবেদন খারিজ করেছিল। আদালত জানিয়েছিল, সুরক্ষিত সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে অথবা এক বছর পর, যে সময়টি আগে আসে, তখন তাঁরা ফের জামিনের আবেদন করতে পারবেন। এর পর ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লি হাই কোর্টও দু’জনের জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়। হাই কোর্ট জানায়, সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশের কারণে তারা সেই শর্ত পরিবর্তন করতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতেই উমর খালিদকে দেওয়া হলো ২০২৬ সালের ‘অ্যাওয়ার্ড ফর হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স অ্যাট রিস্ক’। এ বছর তাঁর সঙ্গে আরও চার জন মানবাধিকারকর্মী এই সম্মান পেয়েছেন। তাঁরা হলেন ইরানের মৃত্যুদণ্ড-বিরোধী আন্দোলনকর্মী আহমদরেজা হায়েরি, অ্যাঙ্গোলার গণতন্ত্রকর্মী লরিন্ডা ম্যানুয়েল গুভেইয়া, ব্রাজিলের ব্ল্যাক ট্রান্স নারী ও অধিকারকর্মী আদ্দা ভিক্টোরিয়া কায়েতানো এবং সার্বিয়ার শান্তি ও নারীবাদী আন্দোলনের কর্মী লিলিয়ানা নেশিচ।
ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সের মতে, উমর খালিদের ক্ষেত্রে এই সম্মান শুধু একজন ব্যক্তির স্বীকৃতি নয়। তাঁর দীর্ঘ কারাবাসকে সংগঠনটি ভারতে মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং ভিন্নমতের উপর চাপের বৃহত্তর ছবির অংশ হিসেবেও দেখছে। জেলে থেকেই আন্তর্জাতিক এই সম্মান পেলেন উমর। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিচার এখনও শুরু হয়নি। ফলে পুরস্কার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বিচারবিহীন কারাবাসও ফের আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এল।







