ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?
US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচনে নজর রয়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান ভোটারদের মনোভাবের দিক। দীর্ঘদিন ধরে এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অবশ্য সেই চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের একাংশ ট্রাম্পের দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু মাত্র দু’বছরের মধ্যে সেই সমর্থনের একটা বড় অংশ আবার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ফিরে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক সমীক্ষা।
অভিবাসন নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ২০২৬ সালের অক্টোবরের সমীক্ষাতেও সেই অসন্তোষের ইঙ্গিত মিলেছে। আমেরিকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১.৫ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও, তাঁদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উপস্থিতির কারণে এই ভোটব্যাঙ্কের অবস্থান দুই দলের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের একটা বড় অংশ তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য পেশাগত ক্ষেত্রে কর্মরত। তাঁদের অনেকেই এইচ-১বি (H-1B) ভিসার মাধ্যমে আমেরিকায় কাজ করতে গিয়েছেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি তাঁদের কাছে কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়, বরং ব্যক্তিগত জীবন, চাকরি এবং পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এইচ-১বি ভিসার নিয়মে কড়াকড়ি, চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, ভিসা পুনর্নবীকরণের সমস্যা এবং স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা ভারতীয় পেশাজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকার বাইরে থাকা নির্দিষ্ট কিছু নতুন এইচ-১বি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে ১ লক্ষ ডলার অর্থপ্রদানের শর্তও চালু করেছে। পাশাপাশি ভিসা নির্বাচনের ক্ষেত্রে লটারির পরিবর্তে বেশি বেতন ও দক্ষতাসম্পন্ন আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা এবং আবেদনকারীদের সামাজিক মাধ্যমের তথ্য যাচাইয়ের পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
কার্নেগির সমীক্ষা বলছে, ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি নিয়ে ৬৪ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান অসন্তুষ্ট। অর্থাৎ, যে অভিবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে বহু ভারতীয় আমেরিকায় নিজেদের পেশাগত ও পারিবারিক জীবন গড়ে তুলেছেন, সেই ব্যবস্থাতেই কড়াকড়ি তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করছে।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে অর্থনীতি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁর অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধি, করনীতি এবং সরকারি ব্যয় নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা সমর্থন করছেন না সমীক্ষায় অংশ নেওয়া অনেকেই। কার্নেগির সমীক্ষা অনুযায়ী, ৬৮ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতির বিরোধিতা করেছেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শুল্কনীতির ক্ষেত্রেও অসন্তোষ আরও বেশি। এই বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা নেতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের অনেকেরই আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে পেশাগত, ব্যবসায়িক এবং পারিবারিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক বৃদ্ধি কিংবা নিষেধাজ্ঞার মতো সিদ্ধান্ত তাঁদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের কাছে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধিকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসনে সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কার্নেগির সমীক্ষায় ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সমীক্ষায় এই অসন্তোষের কথা বলা হলেও, কত শতাংশ ভোটার শুধু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের কারণে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তার নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি আমেরিকায় ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সামাজিক পরিচয় এবং গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও সামনে এসেছে। টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী বো ফ্রেঞ্চ একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেন। ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসের দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত পড়ুয়াদের একটি ছবি প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানও কি এমন দেখতে হয়? তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে আমেরিকায় ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
কার্নেগির সমীক্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক, ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন আবার বাড়ছে। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৬৮ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটার জো বাইডেনকে সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের পক্ষে ছিলেন ২২ শতাংশ। ২০২৪ সালে কমলা হ্যারিস পেয়েছিলেন ৬২ শতাংশ সমর্থন, ট্রাম্প পেয়েছিলেন ৩০ শতাংশ।
২০২৬ সালের অক্টোবরের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেস নির্বাচনে ৬২ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন মাত্র ১৯ শতাংশ। ১২ শতাংশ এখনও সিদ্ধান্ত নেননি। সেনেট নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৬৩ শতাংশ, রিপাবলিকানদের ২১ শতাংশ।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা সবাই ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক হয়ে উঠেছেন। সমীক্ষায় ৪৬ শতাংশ নিজেদের ডেমোক্র্যাট, ১৯ শতাংশ রিপাবলিকান এবং ২৬ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার বলে পরিচয় দিয়েছেন।
অন্যদিকে, রো খান্না, অমি বেরা, সুহাস সুব্রহ্মণ্যম এবং প্রমীলা জয়পালের মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট নেতারা ফের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রিপাবলিকান শিবিরে রয়েছেন বিবেক রামস্বামী। তাঁদের উপস্থিতি আমেরিকার রাজনীতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পরিচয় দেয়।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ২০২৪ সালে ট্রাম্পের প্রতি যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তা যে স্থায়ী হয়নি, সাম্প্রতিক সমীক্ষা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি এই সমর্থনকে নিঃশর্ত রাজনৈতিক আনুগত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রতি অসন্তোষই অনেককে বিকল্প হিসেবে ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।







