ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?
US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?
আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড়সড় ধাক্কা খেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসন, তাঁর অর্থনৈতিক নীতি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই এই ফলাফলকে দেখা হচ্ছে। সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে কিছুটা আসন হারায়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের মাত্রা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। কেন এমন ফলাফল? বিশ্লেষণে উঠে এসেছে পাঁচটি কারণ।
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে মূল্যবৃদ্ধি। আমেরিকার সাধারণ মানুষ গত কয়েক মাস ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাবার, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান দামের চাপে রয়েছেন। মূল্যবৃদ্ধির এই পরিস্থিতির জন্য অনেকেই সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে দায়ী করেছেন।
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে আমেরিকায় মূল্যবৃদ্ধির হার পৌঁছেছে ৩.৭ শতাংশে। অক্টোবরের শুরুতে ডিজেলের দামও রেকর্ড দামের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। একটি ভোটার সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রায় ৭৯ শতাংশ মানুষ গত এক বছরে মূল্যবৃদ্ধির কারণে কমবেশি আর্থিক সমস্যার মুখে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি এই পরিস্থিতির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন।
উত্তর ক্যারোলিনার এক ভোটার বিবিসিকে জানিয়েছেন, জ্বালানি থেকে খাবার, সবকিছুর দামই বাড়ছে। এই কারণে তিনি এবার রিপাবলিকানদের বদলে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের খরচ এবারের নির্বাচনে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং তার অর্থনৈতিক প্রভাব
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আমেরিকাকে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে না দেওয়া। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংঘাত সেই প্রতিশ্রুতিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। তার প্রভাব পড়েছে আমেরিকার সাধারণ মানুষের পকেটে।
এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিতে বিশ্বাসী তাঁর নিজের সমর্থকদের একাংশও এই যুদ্ধ নিয়ে অসন্তুষ্ট। একটি সমীক্ষায় ৬৩ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া আমেরিকার ভুল সিদ্ধান্ত। প্রায় ৭৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, এই যুদ্ধ তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ফলে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে রিপাবলিকানদের।
ডেমোক্র্যাটদের প্রচারে সাধারণ মানুষের সমস্যার গুরুত্ব
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রচারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জীবনযাত্রার খরচ, স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যয় এবং দুর্নীতির মতো বিষয়কে সামনে রেখেছেন তাঁরা। টেক্সাসে জেমস তালারিকো, কানসাসে অ্যাডাম হ্যামিলটন এবং সাউথ ক্যারোলিনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজের মতো প্রার্থীরা স্থানীয় মানুষের সমস্যার সঙ্গে নিজেদের প্রচারকে যুক্ত করতে পেরেছেন।
মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদ রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের পকেটে অর্থ ফেরানোর কথা বলেছেন। জর্জিয়ায় জন অসফের প্রচারের অন্যতম বিষয় ছিল মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্নীতি। অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থীদের একাংশ ট্রাম্পকেন্দ্রিক প্রচারেই বেশি জোর দিয়েছেন। ফলে ভোটারদের প্রকৃত সমস্যাগুলি অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে চলে গিয়েছে।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা
এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। মূল্যবৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সরাসরি তাঁর প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভোটারদের ক্ষোভের কেন্দ্রে চলে এসেছেন প্রেসিডেন্ট নিজেই।
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প বারবার সমর্থকদের বলেছেন, তাঁকে যেন ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবে কল্পনা করে ভোট দেওয়া হয়। কিন্তু এই কৌশল কার্যকর হয়নি। বরং নির্বাচনটি অনেকাংশে তাঁর শাসনের উপর গণভোটে পরিণত হয়েছে। শেষ নির্বাচনী প্রচারেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার পরিবর্তে ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কারের প্রসঙ্গ নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন তিনি। এতে ভোটারদের অগ্রাধিকারের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন হারানো
২০২৪ সালের নির্বাচনে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একাংশের সমর্থন পেয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই সমর্থনই তাঁর জয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই প্রবণতা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তের হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ তিনটি আসনেই জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলিতে ২০২৪ সালের তুলনায় রিপাবলিকান সেনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশেরও বেশি কমেছে। অভিবাসন দফতর আইসিই-র কঠোর অভিযান নিয়ে ক্ষোভও এর অন্যতম কারণ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষায় ৫৬ শতাংশ আমেরিকান আইসিই সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। একইভাবে কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলিতেও ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেড়েছে।
মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধ, জনবিচ্ছিন্নতা, দুর্বল নির্বাচনী প্রচার এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমর্থন হারানো—এই পাঁচটি বিষয় একসঙ্গে ট্রাম্পের দলের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। ২০২৪ সালে যে জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন ট্রাম্প, দু'বছরের মধ্যেই সেই জনপ্রিয়তায় বড়সড় ফাটল দেখা গেল। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই ফলাফল তাই ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সতর্কবার্তা।






