আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ
Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।
মার্কিন রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়কে হাতিয়ার করে বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা নতুন নয়। বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর থেকে আমেরিকায় মুসলিম পরিচয়কে ঘিরে সন্দেহ, নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং ইসলামবিদ্বেষী প্রচার রাজনীতির একটি পরিচিত অস্ত্র হয়ে উঠেছে। সেই আবহেই ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ঘটল। মিশিগান থেকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে সেনেটে নির্বাচিত হলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। তিনিই আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, যিনি নির্বাচনে জিতে মার্কিন সেনেটের সদস্য হতে চলেছেন।
নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল। এমনকি তাঁকে জঙ্গি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত বলেও অভিযোগ করা হয়। কিন্তু সেই প্রচারের পরেও মিশিগানের ভোটাররা তাঁকে নির্বাচিত করেছেন।
এল-সায়েদের এই জয় তাই একদিকে যেমন আমেরিকার মুসলিম নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ঘটনা, অন্যদিকে তেমনই ধর্মীয় বিদ্বেষকে নির্বাচনী প্রচারের প্রধান হাতিয়ার করে তোলার রাজনীতির বিরুদ্ধেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
চিকিৎসক থেকে রাজনীতির ময়দানে
৪২ বছর বয়সি আবদুল এল-সায়েদের রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয় বেশ কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। মিশিগানেই তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা-মা মিশর থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন। পেশায় চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এল-সায়েদ এর আগে ডেট্রয়েট ও ওয়েন কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব সামলেছেন। জনস্বাস্থ্য প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা, দারিদ্র্য এবং সামাজিক বৈষম্যের সমস্যার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত করেছে।
রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে যুক্ত। সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা, ধনকুবেরদের উপর বেশি কর আরোপ, কর্পোরেট সংস্থাগুলির রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরব। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল, চিকিৎসা পরিষেবা যেন মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের উপর নির্ভর না করে। আমেরিকার প্রতিটি নাগরিকের জন্য সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি 'মেডিকেয়ার ফর অল' কর্মসূচির সমর্থক।
এল-সায়েদের বক্তব্য, দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকা দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামোর উন্নয়নে ব্যয় হওয়া উচিত। বিদেশে যুদ্ধ চালানো এবং অন্য দেশের মানুষের উপর বোমা ফেলার জন্য সেই অর্থ ব্যবহার করা উচিত নয়। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নগুলি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।
ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচার
এল-সায়েদের নির্বাচনী লড়াইয়ের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক ছিল তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রিপাবলিকানদের প্রচার। ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিক জনসভায় তাঁকে 'জিহাদি' বলে আক্রমণ করেন। এমনকি ট্রাম্প দাবি করেন, এল-সায়েদ সেনেটে প্রবেশ করতে গেলে তাঁকে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?
রিপাবলিকানদের প্রচারে তাঁকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য বলেও অভিযোগ করা হয়। টেক্সাসের রিপাবলিকান সেনেটর টেড ক্রুজও তাঁর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তোলেন। এল-সায়েদ অবশ্য স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি কখনও মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য ছিলেন না এবং ভবিষ্যতেও হবেন না। তাঁর সঙ্গে ওই সংগঠনের কোনো সম্পর্ক থাকার প্রমাণও সামনে আসেনি।
আমেরিকার রাজনীতিতে ৯/১১-র হামলার পর থেকে মুসলিম পরিচয়কে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সেই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেশবিরোধী বা নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এল-সায়েদের ক্ষেত্রেও সেই পুরনো কৌশলই ব্যবহার করা হয়েছে।
ট্রাম্প মিশিগানের নির্বাচনী প্রচারে ৯/১১-র হামলা এবং ইউনাইটেড ফ্লাইট ৯৩-এর প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এল-সায়েদ সেনেটে গেলে আমেরিকার নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে, এমন ধারণা তৈরি করা। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না।
এই প্রচারের বিরুদ্ধে শুধু এল-সায়েদই প্রতিবাদ করেননি। আরব-আমেরিকান সমাজের একাংশও ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করে। আরব আমেরিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন তৈরিতে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা বিশারা বাহবাহও প্রেসিডেন্টের মন্তব্যকে বর্ণবাদী বলে আখ্যা দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁকে এভাবে আক্রমণ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
নিজের দলের মধ্যেও বাধার মুখে
এল-সায়েদের লড়াই শুধু রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ছিল না। ডেমোক্র্যাটিক দলের মধ্যেও তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে অস্বস্তি ছিল। ২০২৬ সালের অগাস্টে দলের প্রাথমিক নির্বাচনে তিনি হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন। স্টিভেন্স ছিলেন দলের অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী প্রার্থী। এল-সায়েদের এই জয় ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রগতিশীল অংশের শক্তি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
কিন্তু প্রাথমিক নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরেও স্টিভেন্স তাঁর রাজনৈতিক বিরোধিতা চালিয়ে যান। নির্বাচনের মাত্র দু'দিন আগে তিনি দলীয় অবস্থান অগ্রাহ্য করে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন করেন। এল-সায়েদের ইজরায়েল-বিরোধী অবস্থান এবং রাজনৈতিক সম্প্রচারক হাসান পাইকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে স্টিভেন্স আপত্তি তুলেছিলেন।
অন্যদিকে, ইজরায়েলকে মার্কিন সামরিক সাহায্য দেওয়ার বিরোধিতা করায় এল-সায়েদকে ঘিরে ডেমোক্র্যাটিক দলের মধ্যেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এবং মার্কিন সরকারের ভূমিকা নিয়ে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিনি ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছেন এবং মার্কিন অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
এই অবস্থানের কারণে ইজরায়েলপন্থী রাজনৈতিক লবি এআইপ্যাক তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার চালায়। ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাথমিক নির্বাচনে তাঁকে আটকানোর জন্য এআইপ্যাকের সঙ্গে যুক্ত একটি সুপার প্যাক বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিল। ফলে এল-সায়েদের লড়াই শুধু দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইজরায়েল প্রশ্নে মতবিরোধ, কর্পোরেট অর্থের প্রভাব এবং প্রগতিশীল রাজনীতির ভবিষ্যৎও এই নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল।
এল-সায়েদের প্রচারের কেন্দ্রে ধর্মীয় পরিচয়কে রাখতে চাননি। বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান এবং কর্পোরেট সংস্থার প্রভাবের মতো বিষয়গুলিকে সামনে এনেছিলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির খরচ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার বিপুল ব্যয় সাধারণ মানুষের কাছে বড় সমস্যা। এল-সায়েদ এই সমস্যাগুলির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি এবং কর্পোরেট স্বার্থের সম্পর্ক তুলে ধরেছিলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স ছিলেন প্রাক্তন সেনা সদস্য, এফবিআইয়ের প্রাক্তন আধিকারিক এবং সাতবারের কংগ্রেস সদস্য। ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে তিনি নির্বাচনে লড়েছিলেন। কিন্তু এল-সায়েদ তাঁকে ট্রাম্পের নীতির সমর্থক হিসেবেই তুলে ধরেন।
মিশিগানের নির্বাচনে এই কৌশল কতটা কার্যকর হয়েছে, তা তাঁর জয় থেকেই স্পষ্ট। যদিও এই ফলকে শুধুমাত্র ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ভোট হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। অর্থনৈতিক অসন্তোষ, ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তা, ইরান যুদ্ধ এবং বাণিজ্যনীতির মতো বিষয়ও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন
প্রথমত, আমেরিকার মতো দেশে একজন মুসলিম প্রার্থীর সেনেটে নির্বাচিত হওয়া রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। দ্বিতীয়ত, তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষকে হাতিয়ার করে প্রচার চালিয়েও তাঁকে পরাজিত করতে পারেনি রিপাবলিকানরা। তৃতীয়ত, ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রগতিশীল রাজনীতি যে এখনও নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করতে পারে, তাঁর জয় সেই সম্ভাবনাও সামনে এনেছে।
এল-সায়েদ তাঁর জয়ের পর বলেন, আমেরিকার মহত্ত্ব নিজেদের দুর্বলতা অস্বীকার করার মধ্যে নেই, বরং সেই দুর্বলতা সংশোধন করার সাহসের মধ্যে রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ছিল, দেশের মানুষের করের টাকা তাঁদের নিজেদের এবং তাঁদের সন্তানদের উন্নতির জন্য খরচ হওয়া উচিত, অন্য দেশের শিশুদের উপর বোমা ফেলার জন্য নয়।
তবে একজন মুসলিম প্রার্থীর নির্বাচনে জয় মানেই আমেরিকার সমাজ থেকে ইসলামবিদ্বেষ দূর হয়ে গেল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। তাঁর বিরুদ্ধে যে ধরনের প্রচার হয়েছে, তা মার্কিন রাজনীতিতে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনের গভীরতা আবারও প্রকাশ করেছে। কিন্তু সেই প্রচারের মধ্যেও ভোটারদের সমর্থন নিয়ে এল-সায়েদের জয় একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিক অযোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
এটি এমন এক রাজনৈতিক লড়াইয়ের ফল, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায় এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থানও নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।






