আজও বাঙালির 'গুরু', উত্তমকুমার বেঁচে রইলেন মধ্যবিত্ত আবেগে

উত্তমকুমার তাঁর মস্ত শরীরটাকে সঙ্গে নিয়ে মনের ভেতর হাজার হাজার প্রাণকে লালন করতে করতে বেড়ে উঠেছেন, বুড়ো হয়েছেন। তাঁর জয় আসলে আমাদের জয়, তাঁর হার আসলে আমাদের হার আর তাঁর মৃত্যু আসলে সময়ের মৃত্যু।

Shrabanti Mitra
৩ মিনিট
আজও বাঙালির 'গুরু', উত্তমকুমার বেঁচে রইলেন মধ্যবিত্ত আবেগে

সদ্য চলে গেল ২৪ জুলাই। এই দিনটা যে উত্তমকুমারের মৃত‍্যুদিন, তা এককথায় বলে দিতে পারে বাঙালি। কেন উত্তমকুমারের মৃত্যুদিনটা বেশি জনপ্রিয় জন্মদিনের চেয়ে? যত সংখ্যক মানুষ উত্তমকুমারের মৃত্যুদিনটাকে মনে রাখেন, শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাঁকে, তাঁর কাজকে স্মরণ করেন, তার কত সংখ্যকই বা তাঁর জন্মদিনে তাঁকে একইভাবে মনে রাখেন? পৃথিবীতে কয়েকজনই আছেন যাঁরা তাঁদের মৃত্যু দিয়ে মনে গেঁথে গেছেন মানুষের। এঁদের মধ্যে যে দু'জন মানুষ আমবাঙালির সংসারজীবনে ঢুকে পড়েছিলেন ভীষণ ভাবে, তাঁরা উত্তমকুমার এবং ঋতুপর্ণ ঘোষ।

বিভিন্ন মানুষ, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পরিসরে উত্তমকুমারকে নিয়ে অসামান্য কিছু আলোচনা করে গেছেন, গবেষণা করে গেছেন এবং এখনও করছেন। কিন্তু তাও তাকে নিয়ে আসলে কিছুই বলার নেই। কারণ, কেউ যখন আত্মীয়-স্বজনের মতো চৌকাঠ পেরিয়ে, সদর ঘর টপকে, শোবার ঘরের খাটের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে বসে বলেন, "এই মাথা ধরেছে ওষুধ দে, আর আজ রাতে একটু মুড়িঘন্ট বানাবি, রুটি দিয়ে খাবো", তখন তাঁকে নিয়ে আলাদা করে আর কিছুই বলার থাকে না। কারণ তিনি তখন আমাদের মননে, চেতনায় আর আত্মায় বড় প্রাত্যহিক হয়ে যান। তাঁকে আপন বলে জড়িয়ে ধরতে গেলে আর কোনও অতিরঞ্জিত বাতুলতার প্রয়োজন হয় না আমাদের।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বুকে ব্যথা নিয়েও শট দিয়েছিলেন, ফিরে দেখা মহানায়কের শেষ দিন

চিরদিনের মতো বাঙালিকে ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন তার রূপকথার নায়ক? অবশেষে উত্তমকুমারের বাড়ির লোকের তরফে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হল। সারা কলকাতা যেন মুহূর্তের মধ্যে শোকস্তব্ধ হয়ে গেল।

উত্তম সেরকমই একজন মানুষ, যাকে পাড়ার লাল্টুদা থেকে শ্যামলীপিসিমা সবাই চেনে এক ডাকে। তাই কোনও এক বৃষ্টিমুখর শ্রাবণের সকালে তাঁর চলে যাওয়ার খবর পেলে, আমাদের বাড়িতে হাঁড়ি চাপে না। পাড়াপড়শি স্তব্ধ হয়ে যায় কয়েকদিনের জন্য। চূড়ান্ত হুল্লোড়বাজ সত্যদাও পাড়ার চায়ের দোকানে এসে শুধু সিগারেট আর চা খেয়ে বাড়ি চলে যায়, কোনও কথা বলতে পারে না। সকালবেলা টিউশনি করিয়ে ফিরে সেই যে সুজাতা ঘরে ঢুকে দোরে খিল দিয়েছিল, তারপর থেকে টানা একটা গোটা দিন তাকে আর ডেকে ডেকে সাড়া পাওয়া যায় না। তারপর থেকে ক'দিন বিকেলবেলা পাড়ার মোড়ের আড্ডা বন্ধ হয়ে যায়। চোখের জল মুছতে মুছতে রাঙাপিসির তরকারি পুড়ে যায়, হঠাৎ হঠাৎ ভুবনকাকা একটা ফাঁকা দেওয়ালের সামনে গিয়ে চিৎকার করে আর ঘুঁষি মারে।

এসবের মধ্যেই দেখা যায়, লাখ লাখ মানুষ কাদামাখা পথ ধরে হাঁটছেন মৃত্যুমিছিলের সঙ্গে সঙ্গে। কারও জামা ছিঁড়ে যায়, কারও পা হড়কে যায়, কারও মাথা ফেটে রক্ত ভেসে যায় সাদা রজনীগন্ধার পুষ্পরথের ওপর। এসবের মাঝেই কালো কালো মাথাগুলো শ্রাবণের কালো মেঘ-ছোঁয়া বিশাল আকাশটাকে সাক্ষী রেখে এগিয়ে নিয়ে চলেন একটা শবদেহ, সেই মানুষটার, যাকে তাঁরা ভালবেসে 'গুরু' বলে ডাকেন। গুরুকে মাথায় নিয়ে অনন্ত যাত্রাপথের দিকে এগিয়ে যাওয়াই যে শিষ্যদের কাজ! তাই সে পথ যতই কন্টকময় হোক, ফের উঠে দাঁড়িয়ে শিরদাঁড়া শক্ত করে এগিয়ে যেতে হয়। যাতে ৪১ বছর পরেও মানুষ তাঁকে 'গুরু' বলে প্রণাম করতে পারেন, নতজানু হতে পারেন তাঁর কাঙাল করা ভালবাসার কাছে।

একটা কথা মাঝে-মধ্যেই মনে হয়, অরুনকুমার একা উত্তমকুমার হয়ে ওঠেননি। তাঁকে আদর, ভালবাসা, আঘাত, শিক্ষা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, সাহচর্য আর আশীর্বাদ দিয়ে গড়ে তুলেছেন এই বাংলার প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষ। উত্তমকুমার তাঁর মস্ত শরীরটাকে সঙ্গে নিয়ে মনের ভেতর হাজার হাজার প্রাণকে লালন করতে করতে বেড়ে উঠেছেন, বুড়ো হয়েছেন। তাঁর জয় আসলে আমাদের জয়, তাঁর হার আসলে আমাদের হার আর তাঁর মৃত্যু আসলে সময়ের মৃত্যু।

মানুষের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম, তাঁকেই বুঝি আমরণ ভালবাসা যায়। প্রতিবার নতুন করে অসম্ভবের প্রেমে পড়ার মতো করে, নিজের কপালকে দোষ দিয়ে বলা যায়, "ও মুখপুড়ি, তোর আবার মরণ হলো?" তাই কোনও প্রত্যাশা ছাড়াই সেই দিনটা এক স্বঘোষিত 'অমরত্ব যাপন' দিবস। যে দিনে প্রতিবার নতুন করে একটা মৃত্যুদিনকে জন্ম দিই আমরা।

লিখেছেন
Shrabanti Mitra
Shrabanti Mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।