শুভেন্দু ক্যাবিনেটের চমক! কারা পেলেন মন্ত্রিত্ব, কারা রইলেন বাইরে?
রাজভবনে নতুন করে আরও ৩৫ জন মন্ত্রী শপথ নিলেন। এর ফলে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে রাজ্যে মোট মন্ত্রীসংখ্যা দাঁড়াল ৪১।
গত ৯ মে মুখ্যমন্ত্রীসহ মাত্র ৬ জন সদস্য নিয়ে প্রাথমিক মন্ত্রিসভা যাত্রা শুরু করে, আজ ১ জুন রাজভবনে তার পরিধি আরও বাড়ল।
রাজভবনে নতুন করে আরও ৩৫ জন মন্ত্রী শপথ নিলেন। এর ফলে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে রাজ্যে মোট মন্ত্রীসংখ্যা দাঁড়াল ৪১। রাজ্যে বিজেপি সরকারের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে ১৩ জন, স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে ৩ জন এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ১৯ জন শপথ নিলেন।
নতুন সরকারের প্রশাসনিক রাশ শক্ত রাখতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রথম থেকেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। স্বরাষ্ট্র, অর্থ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কৃষির মতো নীতিগত ও জরুরি বিভাগগুলি আপাতত মুখ্যমন্ত্রী নিজেই সামলাচ্ছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, সরকারের শুরুর দিনগুলিতে কাজের গতি বজায় রাখতে এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অবশ্য আগামী দিনে কাজের চাপ বাড়লে এর কিছু দপ্তর অন্য মন্ত্রীদের দেওয়া হতে পারে।
এর আগে গত ১১ মে প্রথম দফার ৫ জন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মধ্যে দপ্তর বণ্টন করা হয়েছিল। সেই তালিকায় দিলীপ ঘোষকে দেওয়া হয়েছে পঞ্চায়েত ও গ্রাম উন্নয়ন, প্রাণিসম্পদ বিকাশ এবং কৃষি বিপণন দপ্তর। অগ্নিমিত্রা পাল সামলাচ্ছেন মহিলা ও শিশু কল্যাণ, সমাজকল্যাণ এবং পুরসভা ও নগর উন্নয়ন দপ্তর। খাদ্য ও সরবরাহ এবং সমবায় দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছেন অশোক কীর্তনিয়া। অন্যদিকে, অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ, আদিবাসী উন্নয়ন এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের ভার দেওয়া হয়েছে ক্ষুদিরাম টুডুকে। আর নিশীথ প্রামাণিকের হাতে রয়েছে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন এবং যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া দপ্তর।
রাজভবনে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে নতুন ৩৫ জন মন্ত্রী শপথ গ্রহণ করেন। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এই সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক, সামাজিক ও আঞ্চলিক ভারসাম্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল, রাঢ়বঙ্গের মতো বিভিন্ন অঞ্চলের মেলবন্ধন ঘটানোর পাশাপাশি মতুয়া, আদিবাসী ও গোর্খা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে এই তালিকায়। একই সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতাদের জ্যেষ্ঠতা বা সিনিয়রিটিকেও।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
RSS in West Bengal: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পর রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে দ্রুত বাড়ছে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলির সক্রিয়তা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধির দাবি সামনে এসেছে।
সামগ্রিক মন্ত্রিসভাকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে— পূর্ণ ক্যাবিনেট মন্ত্রী, স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং সাধারণ প্রতিমন্ত্রী।
আজকের নতুন পূর্ণ ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের তালিকায় রয়েছেন স্বপন দাশগুপ্ত, তাপস রায়, ডা. শঙ্কর ঘোষ, অর্জুন সিং, দীপক বর্মন, গৌরীশঙ্কর ঘোষ, মনোজ কুমার ওরাওঁ, জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, কল্যাণ চক্রবর্তী, অজয় পোদ্দার, দুধকুমার মণ্ডল এবং অনুপ কুমার দাসের মতো অভিজ্ঞ নেতৃত্ব।
পাশাপাশি সরকারের কাজে তরুণ ও নতুন মুখদের যুক্ত করতে একঝাঁক প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে স্বাধীন দায়িত্বসহ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ইন্দ্রনীল খাঁ, মালতী রাভা রায় এবং রাজেশ মাহাতো।
আর বিজেপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শান্তনু প্রামাণিক, পূর্ণিমা চক্রবর্তী, উমেশ রাই, জুয়েল মুর্মু, অশোক দিন্ডা, আনন্দময় বর্মন, কৌশিক চৌধুরী, গার্গী দাস ঘোষ, ভাস্কর ভট্টাচার্য, দিবাকর ঘরামি, সুমনা সরকার, মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র, নদিয়ারচাঁদ বাউড়ি, অমিয় কিস্কু, কলিতা মাজি, বিরাজ বিশ্বাস, বিশাল লামা, দীপঙ্কর জানা এবং হরেকৃষ্ণ বেরা।
চর্চায় থেকেও বাদ যাঁরা
আজকের এই মেগা সম্প্রসারণে যেমন অনেক নতুন মুখ জায়গা পেয়েছেন, তেমনই বেশ কিছু হেভিওয়েট ও চর্চিত নাম মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ায় রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। নির্বাচনের আগে ও পরে যাঁরা বিজেপির প্রচারের মূল মুখ ছিলেন, সংবাদমাধ্যমের ডিবেট থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত ঝড় তুলেছেন, তাঁদের অনেককেই আজ রাজভবনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি।
সবচেয়ে বেশি চর্চা হচ্ছে রূপা গাঙ্গুলি (সোনারপুর দক্ষিণ), রুদ্রনীল ঘোষ (শিবপুর), পাপিয়া অধিকারী (টালিগঞ্জ) এবং রত্না দেবনাথকে (পানিহাটি) নিয়ে। টলিউডের জনপ্রিয় মুখ রূপা গাঙ্গুলি দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য লড়ছেন। রুদ্রনীল ঘোষও শিবপুরে বড় ব্যবধানে জিতেছেন। টালিগঞ্জে হেভিওয়েট বিদায়ী মন্ত্রীকে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দেওয়া পাপিয়া অধিকারী কিংবা আরজি কর কাণ্ডের আবহে পানিহাটি থেকে জয়ী হওয়া রত্না দেবনাথ— এঁরা প্রত্যেকেই টিকিট পাওয়ার পর থেকে লাইমলাইটে ছিলেন। বিশেষ করে আরজি করের নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথের জয়কে কেন্দ্র করে মানুষের আবেগ জড়িয়ে ছিল এবং তাঁর মন্ত্রিত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রবল আলোচনা চলছিল। এছাড়া টলিউড অভিনেতা হিরণ চট্টোপাধ্যায়, দলের প্রবীণ নেতা রিতেশ তিওয়ারি এবং সন্দেশখালি আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় থাকা আইনজীবী প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের মতো পরিচিত নামগুলিও এই তালিকায় স্থান পাননি।
কেন বাদ পড়লেন এই হেভিওয়েটরা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর নেপথ্যে মূলত কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল কাজ করেছে। প্রথমত, সংবিধানে মন্ত্রীসংখ্যার একটি নির্দিষ্ট সীমা (সর্বোচ্চ ৪১ জন) থাকায় সবাইকে জায়গা দেওয়া সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয়ত, শুভেন্দু অধিকারীর সরকার উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং মতুয়া ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলির সামাজিক ও আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় বেশি জোর দিয়েছে। ফলে কলকাতা, হাওড়া বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো শহুরে অঞ্চলের তারকা প্রার্থীদের অনেকেই বাদ পড়েছেন।
পাশাপাশি, সাংগঠনিক দক্ষতাকে এবার বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। রূপা, রুদ্রনীল বা হিরণদের মতো তারকাদের সম্ভবত টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে 'পরিবর্তন' আনার বিশেষ কাজে ব্যবহার করতে চায় দল। রুদ্রনীল ঘোষ অবশ্য নিজেই আগে জানিয়েছিলেন যে তিনি মন্ত্রিত্বের দৌড়ে নেই, সংগঠনের কাজই করতে চান।
আজ শপথগ্রহণ পর্ব মিটলেও নতুন ৩৫ জন মন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট দপ্তর বণ্টনের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি নবান্ন বা সরকারি গেজেট মারফত এই প্রতিবেদন লেখার সময় অব্দি প্রকাশিত হয়নি। অন্যদিকে, যাঁরা আজ বাদ পড়লেন, দলের কর্মীদের একাংশের মধ্যে তা নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ থাকলেও মনে করা হচ্ছে আগামী দিনে বিভিন্ন সরকারি বোর্ড, কর্পোরেশন বা উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এঁদের বড় দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।






