বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরএসএসের দ্রুত বিস্তার, তৎপরতা যাদবপুরেও?

RSS in West Bengal: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পর রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে দ্রুত বাড়ছে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলির সক্রিয়তা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধির দাবি সামনে এসেছে।

inscript
৩ মিনিট
বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরএসএসের দ্রুত বিস্তার,  তৎপরতা যাদবপুরেও?

পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাজ্যের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দীর্ঘদিন ধরে যেখানে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদের প্রভাব ছিল প্রবল, সেখানে এখন দ্রুত সংগঠন বিস্তার করছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সংগঠন। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক সংগঠন এবং শিক্ষা-সংক্রান্ত নানা মঞ্চে এই পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় জয়ের পর থেকেই এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলের পর্যবেক্ষণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলার শিক্ষা ক্ষেত্রকে বামপন্থী চিন্তাধারার অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে দেখা হতো। পরে তৃণমূল কংগ্রেসও ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ক্ষেত্রের উপর নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই পুরনো সমীকরণে ফাটল ধরতে শুরু করেছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বা এবিভিপি। সংগঠনের নেতাদের দাবি, নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের মাত্র ৯৬টি কলেজে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। কিন্তু ফল ঘোষণার দু'সপ্তাহের মধ্যেই সেই সংখ্যা ৪০০-র বেশি হয়ে গিয়েছে। শুধু আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ নয়, বহু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নতুন ইউনিট গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করা হচ্ছে বলেও দাবি তাদের।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দে অ্যালার্জি! কাদের, কেন?

Constitution of India: সঙ্ঘের তরফে দত্তাত্রেয় হোসাবলে বলেছেন, সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ দু'টি জরুরি অবস্থার সময় যোগ করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, বিআর অম্বেদকরের তৈরি মূল সংবিধানে এই শব্দ ছিল না।

এবিভিপির নেতাদের বক্তব্য, বহু ছাত্র তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংগঠনের শাখা খোলার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। এমনও দাবি করা হয়েছে, আগ্রহ দেখানো ছাত্রদের মধ্যে কেউ কেউ আগে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ বা এসএফআইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যদিও এই দাবির স্বাধীন যাচাই এখনও হয়নি।

শুধু ছাত্র সংগঠন নয়, শিক্ষকদের মধ্যেও আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলির কার্যকলাপ বাড়ছে বলে খবর। ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল এবং অখিল ভারতীয় জাতীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের মতো সংগঠনগুলিও নতুন সদস্য ও সমর্থকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছে বলে দাবি করেছে। এই সংগঠনগুলির মতে, নির্বাচনের ফলাফলের পর বহু শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

এই পরিস্থিতিকে আরএসএস নেতৃত্ব একটি বৃহত্তর আদর্শগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছে। তাঁদের মতে, বাংলা এমন একটি অঞ্চল যেখানে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে। কিন্তু কয়েক দশক ধরে সেই ঐতিহ্য আড়ালে চলে গিয়েছিল। এখন রাজ্যের মানুষ নিজেদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের দিকে ফিরে যেতে চাইছেন বলে তাঁদের দাবি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'আমিত্ব' ভারতীয় সংবিধানের মূল নয়, মনমোহনের জয় ও পরাজয় সেই মূলেই লুকিয়ে

Manmohan Singh Death: ১০ বছরের শাসনকালে মনমোহন সিংহ জননেতা বা তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা বা একনায়ক হয়ে উঠতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু নিজের ও সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করেছেন একজন শিক্ষিত ও রুচিশীল ব্যক্তি হিসেবে।

সংগঠনের নেতারা আরও বলছেন, অতীতে বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাঁরা কঠিন ক্ষেত্র বলে মনে করতেন। কারণ সেখানে বামপন্থী প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল এবং পরে তৃণমূলও নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন সেই বাধা ভেঙে দিয়েছে। ফলে যেসব জায়গায় আগে সংগঠন বিস্তার করা কঠিন ছিল, সেখানেও এখন নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিবর্তন কেবল সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে বাংলার শিক্ষা ক্ষেত্রের আদর্শগত চরিত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলন, গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং প্রতিবাদী সংস্কৃতির জন্য পরিচিত বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন নতুন রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে।

এরই মধ্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে আরএসএসের কার্যকলাপ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বহু বছর ধরে যাদবপুরকে বাম-উদারপন্থী চিন্তার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়েছে।

তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই প্রবণতাকে ভিন্নভাবে দেখছে। তাঁদের মতে, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর অনেকেই নতুন শাসক দলের ঘনিষ্ঠ সংগঠনের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আদর্শগত চরিত্র স্থায়ীভাবে বদলে যাচ্ছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসাহও কমে যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত কয়েক দশক ধরে আরএসএস বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা করেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্য সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টাকে নতুন গতি দিয়েছে।

এখন দেখার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই নতুন সাংগঠনিক বিস্তার কতটা স্থায়ী হয় এবং আগামী দিনে ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষক সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির উপর এর কী প্রভাব পড়ে। তবে এটুকু স্পষ্ট, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত ইতোমধ্যেই শ্রেণিকক্ষ, ক্যাম্পাস ও শিক্ষাঙ্গনের করিডরে পৌঁছে গিয়েছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল।

ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ থেকে কী শিখবে বিশ্ব?

France student protest: বিদ্যালয়ের দুরবস্থা ও পারকুরসুপ ব্যবস্থা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ল দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ?

চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।

পুজোয় বইয়ের স্টলে বুলডোজার, যাদবপুরে রাতভর প্রতিরোধ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।

বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই চোরবাগানে ছিলেন সম্পূর্ণা

পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে ভিড় সামলানোর অব্যবস্থা দেখে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণার মনে। হাওড়ার বেলুড়ের বাসিন্দা, ৩০ বছর বয়সি সম্পূর্ণার কথায়, চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

যা ঘটেছিল চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে

Chorbagan Durga Puja incident: এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল।

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।