ডাবল ইঞ্জিনের প্রথম বাজেট: তৃণমূলের পথ থেকে কতটা আলাদা বিজেপি সরকারের পরিকল্পনা?
West Bengal Budget 2026-27: দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে নবগঠিত ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন প্রথম 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত বাজেট পেশ করেছেন। কিন্তু এই দেড় দশকের শাসক তৃণমূল সরকারের পূর্বতন ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেটের সঙ্গে রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটের পার্থক্য ঠিক কী কী?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। একটি ছিল দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চলা তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের শাসনের একটি ধারাবাহিক রূপরেখা, যা পেশ করেছিলেন তদানীন্তন অর্থ প্রতিমন্ত্রী (স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত) চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। আর অন্যটি হলো এক বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত নবগঠিত ভারতীয় জনতা পার্টির 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট, যা পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত।
এই দুটি বাজেট শুধুমাত্র দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, বরং রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মডেল বা দর্শনের প্রতিফলন।
১. বাজেটের আকার
বাজেটের মোট আকার এবং রাজ্যের মোট উৎপাদন (GSDP)-এর লক্ষ্যমাত্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
২০২৫-২৬ বাজেট (তৃণমূল সরকার): চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পেশ করা এই বাজেটের মোট আকার ছিল ঋণ পরিশোধ বাদে প্রায় ৩.৪১ লক্ষ কোটি টাকা (সর্বমোট প্রায় ৩.৮৯ লক্ষ কোটি টাকা)। সে বছর রাজ্যের জিএসডিপি প্রজেকশন বা অনুমিত হিসাব ধরা হয়েছিল ২০,৩১,৮০৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১২% বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রেখেছিল।
২০২৬-২৭ বাজেট (বিজেপি সরকার): নতুন অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত বাজেটের আকার আরও বড় করে নিট বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করেন ৪,৩৮,৭৭৫.২৯ কোটি টাকা।
তৃণমূল সরকারের বাজেটটি তৈরি হয়েছিল ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে, যেখানে খরচ বাড়ানোর উপর জোর ছিল। অন্যদিকে, বিজেপি সরকারের বাজেটটি তৈরি হয়েছে কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আরও বড় পুঁজিনির্ভর বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়ে।
২. রাজকোষীয় শৃঙ্খলা ও ঋণের বোঝা
২০২৫-২৬ বাজেট: এই বাজেটে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ রাখা হয়েছিল জিএসডিপির প্রায় ১.৭%। জনকল্যাণমুখী প্রকল্পগুলিতে বিপুল ব্যয়ের কারণে রাজকোষের উপর চাপ তৈরি হলেও গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখাই ছিল এর লক্ষ্য।
২০২৬-২৭ বাজেট: নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে দাবি করে, তারা পূর্বতন জমানার থেকে ৮,১৫,৮৯১ কোটি টাকার এক বিশাল ঋণের বোঝা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এই ঋণের চাপ সামলাতে নতুন বাজেটে রাজকোষীয় শৃঙ্খলা ফেরানোর কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। নতুন বাজেটে রাজস্ব ঘাটতি জিএসডিপির ১.৭% থেকে আরও কমিয়ে ১.০২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক ঘাটতিকেও ৩.৪০% থেকে কমিয়ে ২.৯১ শতাংশের মধ্যে বেঁধে রাখার ছক কষা হয়েছে।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের বাজেট মডেলে লক্ষ্য ছিল বাজারে টাকার জোগান বাড়িয়ে গ্রামীণ চাহিদা তৈরি করা। অন্যদিকে, স্বপন দাশগুপ্তের মডেলটি হলো আর্থিক ঘাটতি কমিয়ে রাজকোষকে স্থিতিশীল করা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Budget 2026: অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাজ্যের আগের সমস্ত সামাজিক প্রকল্পগুলি অব্যাহত বা চালু থাকবে, তবে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া এবং দুর্বল শ্রেণি যাতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায়, এই বাজেটে সেদিকেই বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
৩. নারী কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষা
দুই সরকারের বাজেটেই মহিলাদের সুরক্ষাকবচ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তবে তাদের কর্মপদ্ধতি ছিল আলাদা।
তৃণমূলের মডেল (২০২৫-২৬): চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি বরাদ্দ ছিল মহিলা ও শিশু কল্যাণে। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ছাড়াও গ্রামীণ আবাসন প্রকল্প ‘বাংলার বাড়ি’-র দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৬ লক্ষ পরিবারকে ঘর দেওয়ার জন্য ৯,৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, যার প্রথম কিস্তির ৬০,০০০ টাকা সরাসরি মহিলাদের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি আশা ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের স্মার্টফোন দেওয়ার জন্য ২০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছিল।
বিজেপির মডেল (২০২৬-২৭): নতুন সরকার আগের সমস্ত সামাজিক প্রকল্প চালু রাখার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি নিয়ে আসে 'অন্নপূর্ণা যোজনা'। যেখানে ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি মহিলাদের মাসে সরাসরি ৩,০০০ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার জন্য ৩৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। এছাড়া ছাত্রীদের ড্রপ-আউট কমাতে এককালীন ৫০,০০০ টাকা এবং নারীদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবার ('পিংক কার্ড') মতো নতুন মাত্রা যোগ করা হয়েছে।
পূর্বতন সরকার গ্রামীণ আবাসন ও তৃণমূল স্তরের কর্মীদের ডিজিটাল ক্ষমতায়নে জোর দিয়েছিল। নতুন সরকার সরাসরি আর্থিক অনুদানের অঙ্ক বাড়িয়ে নারীদের ক্রয়ক্ষমতা এক ধাক্কায় অনেকখানি বাড়ানোর নীতি নিয়েছে।
৪. গ্রামীণ পরিকাঠামো বনাম ভারী শিল্প ও নগরোন্নয়ন
২০২৫-২৬ বাজেট: তৃণমূল সরকারের ফোকাস ছিল মূলত গ্রামীণ ভারতের সংযোগ ও পরিকাঠামোয়। গ্রামীণ রাস্তাঘাট পুনর্নির্মাণে ‘পথশ্রী’ প্রকল্পে ১,৫০০ কোটি টাকা এবং কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত করতে ‘কর্মশ্রী’ প্রকল্পের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। নদীভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে (ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানসহ) প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছিল।
২০২৬-২৭ বাজেট: নতুন সরকার গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি ভারী শিল্প ও মেগা পরিকাঠামোকে মূল চালিকাশক্তি করেছে। শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর ও আসানসোলে মেট্রো সংযোগের পরিকল্পনা, কল্যাণীর কাছে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ার জন্য জমি চিহ্নিতকরণ এবং পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে একটি নতুন গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ার বৈপ্লবিক প্রস্তাব আনা হয়েছে। কালনা-শান্তিপুরের মধ্যে ভাগীরথী নদীতে ১২০০ কোটি টাকার মেগা সেতু এবং চিংড়িঘাটা-নিউটাউন উড়ালপুলের মতো প্রকল্প এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেটটি যেখানে ছিল সম্পূর্ণ গ্রামীণ ও কৃষি-ভিত্তিক পরিকাঠামো নির্ভর। সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটটি গ্রামীণ পরিকাঠামো বজায় রেখেও রাজ্যকে একটি লজিস্টিক ও শিল্প হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বড় পুঁজির বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেছে।
৫. কর্মসংস্থান
২০২৫-২৬ বাজেট: তৃণমূল সরকার গ্রামীণ স্তরে ১০০ দিনের কাজের বিকল্প হিসেবে ‘কর্মশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের কাজের দিন বা কর্মদিবস তৈরির উপর জোর দিয়েছিল।
২০২৬-২৭ বাজেট: নতুন বিজেপি সরকার বড়সড় প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগের দিকে হেঁটেছে। রাজ্য সরকারি অফিসে ১ লক্ষ শূন্যপদ পূরণের ঘোষণা করা হয়েছে (যার ৩৩% পদ মহিলাদের সংরক্ষিত)। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, সব নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ইউপিএসসি (UPSC) মডেলে একটি স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার ঘোষণা করা হয়েছে।
একটি মডেল অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক গ্রামীণ কর্মসংস্থান তৈরিতে বিশ্বাসী ছিল, অন্য মডেলটি স্থায়ী সরকারি নিয়োগ এবং পরীক্ষার স্বচ্ছতা বাড়িয়ে যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করার নীতি নিয়েছে।
৬.মহার্ঘ ভাতা (DA)
২০২৫-২৬ বাজেট: চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সরকারি কর্মচারীদের অসন্তোষ মেটাতে এপ্রিল ২০২৫ থেকে কার্যকর করে ৪% মহার্ঘ ভাতা (DA) বৃদ্ধির ঘোষণা করেছিলেন।
২০২৬-২৭ বাজেট: নতুন অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত কর্মচারীদের ক্ষোভের স্থায়ী সমাধানে বর্তমান ১৮ শতাংশ ডিএ-র উপর এক ধাক্কায় আরও ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির ঘোষণা করেন। ফলে রাজ্যে মোট ডিএ-র পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৮ শতাংশ, যা ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
সরকারি কর্মচারীদের পাওনা মেটানোর ক্ষেত্রে নতুন সরকার অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও বড় আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
৭. নতুন সামাজিক ও কর সংস্কার নীতি
২০২৫-২৬ বাজেট: চা শিল্পে চাঙ্গা ভাব আনতে কৃষি আয়কর মকুবের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। বিবেকানন্দ হাউসের রক্ষণাবেক্ষণে বার্ষিক ৫০ লক্ষ টাকা দেওয়ার মতো কিছু সামাজিক নীতি নেওয়া হয়েছিল।
২০২৬-২৭ বাজেট: নতুন বাজেটে বৃত্তিকর বা প্রফেশনাল ট্যাক্সে বড় ছাড় দিয়ে মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দেওয়া হয়েছে (যেমন কর মকুবের মাসিক আয়ের সীমা ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার করা হয়েছে)। তাছাড়া, ধর্মীয় স্থানের ১ কিলোমিটারের মধ্যে মদের দোকান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার মতো এক কড়া নীতি নেওয়া হয়েছে।
দুই বাজেটের মূল তুলনামূলক খতিয়ান

২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের তৃণমূল সরকারের বাজেটটি ছিল মূলত একটি জনমুখী ও বণ্টনভিত্তিক বাজেট, যা সাধারণ মানুষের হাতে সরাসরি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে টাকা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের নতুন বাজেট একটি উৎপাদনশীল ও পুঁজিনির্ভর পরিকাঠামোর বাজেট, যা রাজ্যের ঋণের বোঝা কমিয়ে কেন্দ্রের যৌথ শক্তিতে বড় বড় শিল্প ও স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরির দিকে বেশি ঝুঁকেছে।






