পশুবলি নিয়ে সরকারের কড়া নির্দেশ: কোন আইনের ভিত্তিতে জারি হলো নতুন নির্দেশিকা?
West Bengal Animal Slaughter Control Act 1950: ইদুল আজহার আগে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫০ সালের পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর হচ্ছে। কোরবানির জন্য কি এখন ‘ফিট ফর স্লটার’ শংসাপত্র বাধ্যতামূলক? কোথায় পশু জবাই করা যাবে? কী বলা হয়েছে নির্দেশিকায়?
২৭ মে ইদুল আজাহা। এই ইদের আগেই রাজ্য সরকারের একটি নির্দেশিকা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সরকার জানিয়েছে, ১৯৫০ সালের ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যানিম্যাল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে। এই আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না হলে গরু, বলদ, মোষ বা সংশ্লিষ্ট পশু জবাই করা যাবে না। ফলে মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, এবারের কোরবানির আয়োজন জটিল হয়ে পড়তে পারে।
ইদুল আজাহা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এই দিনে সামর্থ্য থাকা মুসলিমরা পশু কোরবানি দেন। ধর্মীয় আচার হিসেবে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বহু পরিবার এবং পশু ব্যবসায়ী এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেন। পশুর হাট বসে, ব্যবসা হয়, বহু মানুষের আয়ের সুযোগও তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে সরকার নতুন কোনো আইন না আনলেও পুরনো আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, এটি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের নির্দেশ মেনে করা হচ্ছে।
১৯৫০ সালের এই আইনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল কাজের ক্ষমতা ও প্রজননের ক্ষমতা রয়েছে এমন পশুকে নির্বিচারে জবাই হওয়া থেকে রক্ষা করা। আইন অনুযায়ী, গরু বা মোষজাতীয় পশু জবাই করতে হলে আগে ‘ফিট ফর স্লটার’ বা জবাইযোগ্যতার শংসাপত্র নিতে হবে। এই শংসাপত্র তখনই দেওয়া হবে, যদি সংশ্লিষ্ট পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি হয় এবং তার আর কাজ বা প্রজননের ক্ষমতা না থাকে, অথবা পশুটি গুরুতর আহত বা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়।
শংসাপত্র দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে সংশ্লিষ্ট পুরসভা বা পঞ্চায়েত সমিতির প্রধানের সঙ্গে সরকারি পশুচিকিৎসকের যৌথ অনুমোদনের ভিত্তিতে। অর্থাৎ শুধু একজন পশুচিকিৎসকের মতামত যথেষ্ট নয়; প্রশাসনিক অনুমতিও লাগবে। এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং বাস্তবে সব জায়গায় তা সহজে সম্পন্ন করা কঠিন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সরকার আরও বলেছে, কোনো খোলা জায়গায় পশু জবাই করা যাবে না। জবাই করতে হবে অনুমোদিত পৌর কসাইখানা বা প্রশাসন নির্ধারিত স্থানে। আইন ভাঙলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে।
ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এই নির্দেশিকার ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন গ্রামীণ এলাকার মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামে অনুমোদিত কসাইখানা নেই। সেখানে কোরবানির পশু নিয়ে দূরে যেতে হতে পারে। পরিবহণ, অনুমতি, সময় এবং প্রশাসনিক জটিলতার মতো বিষয়গুলি সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয়বহুল ও কষ্টকর হতে পারে।
পশু ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কোরবানির আগে যে বিশাল পশুর বাজার গড়ে ওঠে, তা বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয়ের প্রধান উৎস। নতুন নিয়মের ফলে কোন পশু বিক্রি করা যাবে, কোন পশু নিয়ে প্রশাসনিক সমস্যা হতে পারে—এসব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মুসলিম সংগঠনগুলির একাংশের বক্তব্য, আইন মানা জরুরি হলেও প্রশাসনের উচিত ছিল উৎসবের আগে সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করা এবং বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া। যদি শংসাপত্র দ্রুত দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়, তবে উদ্বেগ অনেকটাই কমতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের যুক্তি, এটি কোনো ধর্মীয় বিধিনিষেধ নয়। বহু বছর ধরেই আইনটি রয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুসারে অবৈধ পশুজবাই, অবৈধ পশু পরিবহণ এবং অননুমোদিত কসাইখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের মতে, আইন সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।
কলকাতা হাই কোর্টের ২০১৮ সালের পশু জবাই সংক্রান্ত নির্দেশের পর থেকেই রাজ্য প্রশাসনকে এই আইন বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে আরও কিছু প্রশাসনিক নির্দেশিকা জারি হয়। এবারের বিজ্ঞপ্তি সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলেই সরকার দাবি করছে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কোরবানির মতো ধর্মীয় উৎসবের আগে হঠাৎ কড়াকড়ি বাড়ালে স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ বহু মানুষ জানেন না কীভাবে শংসাপত্র সংগ্রহ করতে হবে, কোথায় পশু নিয়ে যেতে হবে বা কোন পশু আইনি ভাবে জবাইযোগ্য।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও সেই স্বাধীনতা ‘জনশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য এবং নৈতিকতার’ শর্তসাপেক্ষ। ফলে রাজ্য সরকার পশু কল্যাণ, জনস্বাস্থ্য বা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার যুক্তিতে কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণ বাস্তবে কতটা যুক্তিযুক্ত এবং বৈষম্যহীন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পশু ব্যবসায়ী, কসাই, পরিবহণ কর্মী এবং হাটের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ এই সময়ে বাড়তি আয় করেন। ফলে আইন কার্যকরের প্রভাব ধর্মীয় আচার ছাড়িয়ে অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
প্রশাসন যদি দ্রুত শংসাপত্র প্রদান, অস্থায়ী অনুমোদিত জবাই কেন্দ্র এবং পরিষ্কার নির্দেশিকা জারি করে, তবে পরিস্থিতি অনেকটাই সহজ হতে পারে। অন্যথায় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়বেন এবং স্থানীয় স্তরে উত্তেজনার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।







