সবচেয়ে বেশি অপরাধমূলক মামলায় জড়িত প্রার্থী বিজেপির, প্রথম দফার ভোটে বিতর্কিত মুখ কারা?

ADR report West Bengal election: প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে ৬৬টিই ‘রেড অ্যালার্ট’ কেন্দ্র, তিন বা তারও বেশি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। ভোটাররা কি এবার প্রার্থীর ভাবমূর্তির বদলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার দিকেও নজর দেবেন?

inscript
৩ মিনিট
সবচেয়ে বেশি অপরাধমূলক মামলায় জড়িত প্রার্থী বিজেপির, প্রথম দফার ভোটে বিতর্কিত মুখ কারা?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের আগে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে যে ছবি সামনে এসেছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগের। দেখা যাচ্ছে, প্রথম দফার প্রার্থীদের প্রায় প্রতি চার জন প্রার্থীর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে আবার বহু প্রার্থীর বিরুদ্ধে খুন, নারী নির্যাতন, অপহরণ বা দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা Association for Democratic Reforms এবং West Bengal Election Watch প্রথম দফার ১,৪৭৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ১,৪৭৫ জনের হলফনামা বিশ্লেষণ করেছে। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, ৩৪৫ জন প্রার্থী নিজেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকার কথা স্বীকার করেছেন। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর ২৩ শতাংশের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২৯৪ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে, যা মোট প্রার্থীর ২০ শতাংশ।

এই গুরুতর মামলার তালিকায় রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ, দুর্নীতি, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো এবং অর্থ তছরুপের মতো অভিযোগ। রিপোর্ট বলছে, ৯৮ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। ১৯ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে খুনের মামলা রয়েছে। এছাড়া অনেকের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টা, দাঙ্গা, হামলা বা চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি অপরাধমূলক মামলায় জড়িত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী সুব্রত ঘোষ, যাঁর বিরুদ্ধে ৩২টি মামলা রয়েছে। তাঁর পরেই রয়েছেন বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা রয়েছে। এই মামলাগুলির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, হিংসা, বিক্ষোভ বা প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে গুরুতর ফৌজদারি ধারাও।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সাজোয়া গাড়ি থেকে সশস্ত্র বাহিনীর টহল, বাংলা যেন কাশ্মীর

নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২,৪০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (CAPF) মোতায়েন করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রায় ২.৪ লক্ষ জওয়ান রাজ্যের প্রতিটি বুথ ও অলিগলি পাহারা দেবেন। ২০২১ সালে যেখানে ৮৪৫ কোম্পানি বাহিনী ছিল, এবার তা প্রায় তিন গুণ বাড়ানো হয়েছে।

দলভিত্তিক হিসেবেও ছবিটা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধান দলগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপরাধমূলক মামলায় জড়িত প্রার্থী রয়েছে বিজেপির তালিকায়। বিজেপির ১৫২ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। শতাংশের হিসেবে যা ৭০। তৃণমূল কংগ্রেসের ১৪৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। শতাংশের হিসেবে তা ৪৩। সিপিএমের ক্ষেত্রেও এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাদের ৪৪ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল ক্ষেত্রে এই হার ২৬ শতাংশ।

এই রিপোর্টে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘রেড অ্যালার্ট’ কেন্দ্র। যে সব কেন্দ্রে তিন বা তার বেশি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে, সেই কেন্দ্রগুলিকে ‘রেড অ্যালার্ট’ বলা হয়। প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে ৬৬টি আসন এই তালিকায় পড়েছে। অর্থাৎ মোট আসনের ৪৩ শতাংশেই এমন অবস্থা, যেখানে ভোটারদের সামনে একাধিক অপরাধমূলক মামলায় জড়িত প্রার্থী রয়েছেন। আগের নির্বাচনের তুলনায় এই ধরনের আসনের সংখ্যা ১৭ শতাংশ বেড়েছে।

তবে এই ছবির আরেকটি দিকও রয়েছে। সব ফৌজদারি মামলাই সমান নয়। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আন্দোলন, বিক্ষোভ, অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। বিশেষ করে রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকা অস্বাভাবিক নয়। ফলে শুধুমাত্র মামলার সংখ্যা দেখেই কোনো প্রার্থীর চরিত্র বিচার করা কঠিন। মামলার প্রকৃতি, অভিযোগের গুরুত্ব এবং আদালতে তার অবস্থাও দেখা জরুরি।

এই প্রশ্নটাই এখন ভোটারদের সামনে বড় হয়ে উঠছে। একজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে যদি ২০-৩০টি মামলা থাকে, তাহলে কি তিনি স্বাভাবিকভাবে জননেতা হতে পারেন? নাকি সেই মামলাগুলির অনেকটাই রাজনৈতিক সংঘর্ষের ফল? আবার একই সঙ্গে এটাও ঠিক, খুন, নারী নির্যাতন বা দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলি কেন সেই প্রার্থীদের টিকিট দেয়, সেই প্রশ্নও এড়ানো যায় না।

অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলি যুক্তি দেয়, জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিরোধীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করে। আবার ভোটের অঙ্কে জেতার সম্ভাবনা থাকলে দলগুলি সেই প্রার্থীদেরই অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু এর ফলে রাজনীতিতে অপরাধমূলক পটভূমির মানুষের প্রবেশ আরও বাড়ে এবং গণতন্ত্রের উপর মানুষের আস্থা কমে।

ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় এখন প্রার্থীদের হলফনামা বাধ্যতামূলক হওয়ায় ভোটাররা অন্তত জানতে পারছেন, তাঁদের এলাকার প্রার্থী কারা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের মামলা রয়েছে। কিন্তু শুধু তথ্য জানলেই হবে না, ভোটারদেরও সেই তথ্য বিচার করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রে ভোটই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর সেই ভোট যদি অপরাধের বিরুদ্ধে না যায়, তাহলে রাজনীতিতে অপরাধীদের দাপট কমানো সম্ভব নয়।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।

রামলীলার সভার জন্য ক্ষতি হয়েছে ছোট দোকানদারদের, কতটা প্রচার, কতটা সত্যি?

loss claim for Ramlila rally: রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে ছোট দোকানদারদের ‘২.৫ লক্ষ দোকান বন্ধ’ ও ‘১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’র দাবি আসলে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠন সিটিআই-এর অনুমান আসলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিজেপি-কংগ্রেস পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই সংখ্যাগুলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার।