বিজ্ঞাপনের আকাল, কী অবস্থায় রয়েছে চিৎপুরের যাত্রাপাড়া?

এই শহরে বাগবাজারের মাঠ, দমদম, বারাসত বা সল্টলেকেও বছরের পর বছর জমেছে যাত্রাপালা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে যাত্রার জন্য নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। হঠাৎ আসা করোনা কাবু করেছে যাত্রাশিল্পীদের।

tiasa gupta
৪ মিনিট
বিজ্ঞাপনের আকাল, কী অবস্থায় রয়েছে চিৎপুরের যাত্রাপাড়া?

সবে মাসির বাড়ি গেল জগন্নাথের রথ, কিন্তু এই বছরও খবরের কাগজে দেখা মিলল না পুরনো চেনা ছবির। সে এক দিন ছিল, তখন রথের তারিখে খবরের কাগজ হয়ে উঠত ঢাউস। মূল কাগজ যদি ১৬ পাতার, সঙ্গে ক্রোড়পত্র নিয়ে ২৪ পাতার কাগজ। ঢাউস ঢাউস ফুল পেজ অ্যাড। সেসব ছবি জুড়ে নায়ক-নায়িকাদের পমেটমমাখা মুখ, কাজলটানা চোখ। শুরু হতো যাত্রার মহরত। এবার অবশ্যই করোনার দমক কাটিয়ে লড়াইটা ঘুরে দাঁড়ানোর। কীভাবে?

রথযাত্রার সঙ্গে যাত্রাশিল্পের নাড়ির টান। রথের দিন খবরের কাগজ পাতা জুড়ে থাকত বিভিন্ন অপেরার বড় বড় বিজ্ঞাপন। একাধিক সংবাদপত্র যাত্রা নিয়ে আলাদা সাপ্লিমেন্ট প্রকাশ করত। এখন সেসব অতীত। এবার রথেও দেখা মিলল না যাত্রার ঢাউস ঢাউস বিজ্ঞাপন।

যাত্রার এদিন

করোনার দাপটে এই শিল্প একেবারে থমকে দাঁড়িয়েছিল। আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে চিৎপুর। গত দু’বছর করোনার কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যাত্রাপাড়া। সেই অবস্থা কাটিয়ে ভালো বাজার পাওয়ার আশায় চিৎপুরে শুরু তোড়জোড়। যাত্রা অপেরাগুলোর বক্তব্য, নয়া মরশুমের প্রথম থেকে তারা সবরকমের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। আগামী মরশুমে ভালো বাজার পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। গত ২ বছর করোনার জন্য রাজ্য যাত্রা একাডেমির অনেক অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে। যাত্রা উৎসবও পরিপূর্ণভাবে করা হয়নি। এবার পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। ফলে একাডেমি একগুচ্ছ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়েছে। রথের দিন থেকে বাগবাজার যাত্রামঞ্চে ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শিবির শুরু হয়েছে। প্রতিটি জেলা থেকে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে আসছেন শিল্পীরা। রথের দিন বাগবাজার ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদ মঞ্চ প্রাঙ্গণে বিভিন্ন স্টল থেকে শুরু হলো যাত্রাপালার বুকিং।

রথের দিনটি যাত্রাশিল্পীদের কাছে দুর্গাপুজোর সমান। ওইদিন থেকে শুরু হয় নতুন বছরের যাত্রার মহরত। যাত্রার জন্য দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। গত দু’বছর দুঃসময় গেছে, যাত্রার কলাকুশলীদের বক্তব্য, করোনার কারণে থমকে ছিল যাত্রা শিল্প, মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে।

যাত্রা শিল্পের অন্তর্জলি যাত্রার বড় কারণ করোনা, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়, কারণ ঘরে ঘরে টিভি সিরিয়ালের দাপট, হাতে হাতে স্মার্ট ফোন- কিছুটা হলেও বদলে দিয়েছে সংস্কৃতির ধারা। তাই মূলত গ্রামীণ এই শিল্পে এসেছে কিছুটা ভাটার টান।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোথায় হারিয়ে গেল উত্তর কলকাতার বিখ্যাত সিনেমা হলগুলো?

মিত্রা ভাঙা হচ্ছে শপিং মলের জন্য। তালা পড়ে গেছে দর্পণায়। রাধা, উত্তরা, শ্রী ইতিহাস।

ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে চিৎপুরে আর আগের উৎসবের মেজাজ চোখে পড়েছে না। কেন? যাত্রাশিল্পে ১৯৭০-৮০-র এই পরিবেশের কোনও তুলনাই হয় না। এই মন্দার কারণ কি শয়ে শয়ে সিরিয়াল, রিয়েলিটি শো? আসলে বোকাবাক্সর পর্দার চ্যালেঞ্জ কীভাবে সামলানো যায়, চিৎপুর এর উত্তর খুঁজে পেল না। এটাই এই শিল্পের সংকটের প্রধান কারণ।

যাত্রার সেদিন

আটের দশকের শুরুতে গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলেছিল 'মরমী বধূ’ নামের এক যাত্রাপালা। জসিমউদ্দিনের `সোজন বাদিয়ার ঘাট’–কেও নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছিল। নট ও নাট্যকার নির্মলকুমার, মীনাকুমারীরা তখন গ্রামের পর গ্রামে রাত জেগে অভিনয় করেছেন। 'মরমী বধূ' পালা দেখতে ১০-১৫ কিলোমিটার ভ্যান রিকশা ভাড়া করে যেতেন বাড়ির মেয়েরা। আত্মীয়র বাড়ি থেকেও যাত্রাপালা দেখতেন সেকালের মানুষ।

নিখাদ প্রেমের পালা 'দেবদাস'। প্যান্ডেল থেকে চোখ মুছতে মুছতে বের হতেন না, এমন নারী-পুরুষের সংখ্যা মেলা ছিল ভার।

এর আগে অবশ্য 'বিবি আনন্দময়ী', 'নটী বিনোদিনী', 'গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম', 'মা মাটি মানুষ'- বাংলা দাপিয়ে বেড়াত। তখন জনপ্রিয়তা বিচার হতো টিকিট বিক্রির নিরিখে। হাটে-বাজারে, মাঠে-ঘাটে বিভিন্ন যাত্রাপালা নিয়ে আলোচনা হতো বিস্তর।

'গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম', 'মীরার বধুঁয়া' ছিল পৌরাণিক পালা। হিন্দু, এমনকী মুসলমানরাও এই দুই যাত্রাপালা দেখতে ছুটতেন। এর একটা বড় কারণ, বীণা দাশগুপ্ত আর বেলা মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়। তবে এই দুই নায়িকাকে ছাপিয়ে মীনাকুমারী হয়ে উঠেছিলেন গ্রামবাংলার পার্বতী বা লায়লা-মজনুর লায়লী।

আটের দশকে নামকরা পালা দেখতে মানুষ ছুটতেন প্যান্ডেলে। গ্রামে হতো 'মনসার ভাসান', 'বনবিবি চম্পা', বেহুলা-লখিন্দর, লায়লা-মজনুর মতো জনপ্রিয় যাত্রাপালা। গ্রামে খেটে খাওয়া মানুষ হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সন্ধের পর একসঙ্গে বসতেন রিহার্সালে। এক এক দল দু'-তিনটে করে পালা নামাত। সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রীকে বহু মানুষ খুশি হয়ে পুরস্কার দিতেন। তাঁদের নাম ঘোষণা করা হতো মাইকে। গ্রামের মানুষ মনে করতেন, এতে শিল্পীদের সম্মান বাড়ে।

যাত্রা কি এখন শুধু গ্রামে?

না, এই শহরে বাগবাজারের মাঠ, দমদম, বারাসত বা সল্টলেকেও বছরের পর বছর জমেছে যাত্রাপালা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে যাত্রার জন্য নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। হঠাৎ আসা করোনা কাবু করেছে যাত্রাশিল্পীদের। তাঁরা এখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। ইদানীং, প্রথম সারির যাত্রা দলের শো-পিছু বুকিং হতো ৭৫ থেকে ৮০ হাজারে। দ্বিতীয় সারির দল পায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার। বাকিরা ৪০ হাজার করে শো। ৮০ হাজার টাকার ৭০টি শো বাতিল মানে একটি দলের ক্ষতি ৫০ লাখের ওপর। বুকিং ক্যানসেল মানে এই শিল্পকে গঙ্গাপ্রাপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়া।

সেসব দিন আর নেই, এর কারণ কী? এখন মানুষের সময় কম। সবাই ছুটছেন বিকল্প আয়ের জন্য। সন্ধেবেলাতেও ফুরসত কম। কিছুটা ধর্মীয় কারণও কাজ করেছে। শহরতলি ছাপিয়ে এই প্রবণতা গ্রামেও। আগে দেখা যেত বেহুলা সাজছেন মুসলমান মেয়ে, হিন্দুর ছেলে সাজছেন লখিন্দর। সেসব দিন আর নেই। ধর্মের বেড়াজাল আটকে দিয়েছে অনেক কিছুই। তবে একটা কথা পরিষ্কার, যে শিল্পের ঐতিহ্য এত সম্ভ্রান্ত, এবারও রথের দিনে তার ঘুরে দাঁড়ানোর উত্তর খুঁজল চিৎপুর। উত্তর মিলল কি না, সময়ই বলবে।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।