কোথায় হারিয়ে গেল উত্তর কলকাতার বিখ্যাত সিনেমা হলগুলো?

মিত্রা ভাঙা হচ্ছে শপিং মলের জন্য। তালা পড়ে গেছে দর্পণায়। রাধা, উত্তরা, শ্রী ইতিহাস।

Raktim Dey
৪ মিনিট
কোথায় হারিয়ে গেল উত্তর কলকাতার বিখ্যাত সিনেমা হলগুলো?

ছুটির দিনে বাড়িতে সবাই মিলে গল্প করছিলাম। এই সময় বড় পিসি জিজ্ঞেস করল, "হাতিবাগানে আর একটাও বড় সিনেমা হল নেই। তাই না?"

সত্যি! ছোট থেকে দেখা মিত্রা, রাধা, উত্তরা, শ্রী, দর্পণা- আজ সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সাকুল্যে বেঁচে রয়েছে স্টার এবং মিনার। যদিও স্টার থিয়েটার সরকারি অধিগ্রহণের কারণেই টিকে, এবং বেশিরভাগ সময় সিনেমা দেখানো হলেও স্টার কিন্তু মূলত থিয়েটার প্রেক্ষাগৃহ। কলকাতায় এখন বহু মাল্টিপ্লেক্স আছে ঠিকই, কিন্তু সিনেমা হল বলতে মধ্যবিত্ত আজীবন বুঝেছে সিঙ্গল স্ক্রিন।

পাঁচ-ছয়ের দশকে সাবেক কলকাতার সিনেমা হল-স‌ংস্কৃতি এক অন্য চেহারা পায়। নুন শো, ম্যাটিনি শো, ইভনিং শো, নাইট শো- এই লব্জগুলো জনজীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল তখন। পাশ্চাত্যের 'ম্যাটিনি আইডল'-এর ধারণা তখন বাঙালি জীবনে জেঁকে বসেছিল কিন্তু মূলত ম্যাটিনি শো-র সূত্র ধরেই। ঠিক দুপুর আর বিকেলের সন্ধিক্ষণের শো ছিল ম্যাটিনি শো। আবার 'নাইট শো' দেখারও চল ছিল রীতিমতো। মনে করে দেখুন, 'দেয়া নেয়া' ছবিতে উত্তমকুমার, তরুণকুমার ও লিলি চক্রবর্তী অভিনীত তিনটি চরিত্র নাইট শো দেখতে যাচ্ছে। সারাদিনের অফিসের পরেও ক্লান্ত না হয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়ার এই যাপন তো আদতে এক সংস্কৃতির অঙ্গ। 'গল্প হলেও সত্যি'-তে বাড়ির মেয়েদের সম্মিলিতভাবে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময় কিন্তু আবার ম্যাটিনি শো। বাড়ির বেশিরভাগ পুরুষ সেসময় কর্মসূত্রে বাইরে। আবার ইভনিং শো-তে প্রেমিক যুগলের গোপন পদচারণাও নানা সাহিত্যে, সিনেমায় বারবার উঠে এসেছে। আর স্কুল পালিয়ে, অফিস কেটে সিনেমা দেখার জীবনটা তো এই কয়েক দশক আগে পর্যন্তও ছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আমেরিকার বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় এই নিরামিষ ভারতীয় আইসক্রিম

সব ধরনের মানুষের কথা মাথায় রেখে রকমারি স্বাদের আইসক্রিম নিয়ে এসেছে এই কোম্পানি।

এই সামগ্রিক সিনেমা হল সংস্কৃতির মধ্যে উত্তর কলকাতার সিনেমা হলগুলো আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে। মিত্রা আর দর্পণা ছিল হাতিবাগানের মোড়ের আগে, ঠিক পাশাপাশি দুটো হল। উল্টোপারে রয়েছে মিনার। বছর কুড়ি আগে মূলধারার বাংলা ছবির পোস্টারে লেখা থাকত, 'মিনার, বিজলী, ছবিঘর'। এর মধ্যে বিজলী দক্ষিণে, মধ্য কলকাতায় ছবিঘর, আর উত্তরে মিনার। মিনার এখনও আছে, তবে খুবই সঙ্গিন অবস্থায়, ব্লু রে সিনেমা স্ক্রিনের বিজ্ঞাপন দিয়ে মাল্টিপ্লেক্সের কায়দাতেই লোক টানতে হচ্ছে তাদের। মিত্রা ভাঙা হচ্ছে শপিং মলের জন্য। তালা পড়ে গেছে দর্পণায়। রাধা, উত্তরা, শ্রী ইতিহাস। একসময় শিয়ালদার 'প্রাচী'-তে কেবল বাংলা সিনেমা দেখানো হয়, এই অহং বজায় ছিল। সেই 'প্রাচী'-তে এখন হিন্দি, দক্ষিণী, সব ধরনের ছবি চলে। তাতেও দর্শক টানতে বেশ বেগ পেতে হয় এই হলগুলোকে। কেবল পুজোর সময় বা এই ধরনের পার্বণে ভিড়ের প্রাবল্যে হয়তো কিঞ্চিৎ লক্ষ্মীলাভ হয় এই হলগুলোর।

সিনেমার টিকিট কাটার জন্য দীর্ঘ সময়ের লাইন থেকে ঘরে বসে ওয়েবসাইট মারফৎ টিকিট কেটে মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখতে যাওয়ার পথ পার করে এসে এখন ঘরে বসেই বিভিন্ন অ্যাপে সিনেমা দেখি আমরা। সিনেমা হলের বাইরের প্রায় লজঝরে কোল্যাপসিবল গেট টপকে মাল্টিপ্লেক্সের মেটাল ডিটেকটরের আওয়াজ পেরিয়ে আজ মোবাইলের লক স্ক্রিন সিনেমার দরজা খোলে। ছোটবেলায় সিনেমা দেখতে যাওয়ার জন্যে বাড়িতে সবাইকে একসঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হতো, তার মধ্যে ছিল এক ধরনের কৌম সংস্কৃতি। ব্যক্তিগতভাবে মনে পড়ে, বাবা ছুটির দিন সকালে বাজার করে বাড়ি এসেই সিনেমার টিকিট কাটতে যেত, কারণ সারাদিনে শুধু তিনটে শো চলত এবং তার মধ্যে নাইট শো আগেই বাদ পড়ত, কারণ মাকে বাড়ি ফিরে রান্না করতে হবে। বাবার থেকে শুনেছি যে, তাড়াতাড়ি না গেলে টিকিট শেষ হয়ে যাবে। তখন হয় পরের ছুটির দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে নাহলে বেশি টাকা দিয়ে ব্ল্যাকারদের থেকে টিকিট কাটতে হবে। সেই টিকিট ব্ল্যাকের সংস্কৃতিও উধাও হলো সিঙ্গল স্ক্রিন উঠে যাওয়ার দৌলতে। আমি ছোটবেলায় একবারই নাইট শো-তে বাবা, মায়ের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। তার জন্যে মা সন্ধে নাগাদ তাড়াতাড়ি করে রুটি, আলুর দম বানিয়ে রেখেছিল, যাতে বাড়ি ফিরে রান্না না করতে হয়। মাল্টিপ্লেক্সের যুগে সেইসব চিন্তা চলে গেল। কারণ একটা শো না দেখতে পেলেও তার আধঘণ্টার মধ্যেই আরেকটা শো থাকত। এখন তো সেই চিন্তাও নেই। ছুটির দিনে ঘণ্টা দুই-তিন হাতে থাকলেই সিনেমা দেখা যায়। সেই কারণেই হয়তো সবাইকে আর একসঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হয় না সিনেমা দেখার জন্য। নিজের ইচ্ছে এবং সময়মতো সবাই আলাদা ঘরে বসে নিজের নিজের মোবাইলে পছন্দমতো সিনেমা দেখি।

বেশি সময়ের সিনেমাকে ছোট ছোট ভাগে দেখি আমরা এখন। সিরিজের আতিশয্যে সিনেমা দেখার মনটাও পাল্টেছে আমাদের। মিত্রা সিনেমা হলের নায়কের ছবিতে মালা আর হলের ভেতরে নায়কের বলা ডায়লগে সিটি দেওয়া থেকে অ্যাপে সিনেমা দেখে ফেসবুকে নায়কের অভিনয় নিয়ে পোস্ট দেওয়া অবধি অনেকটা পথ আমরা পেরিয়ে এসেছি। সিনেমা হলে বিরতিতে খাওয়া চিপস, প্যাটিসের জায়গা কিছু দিনের জন্যে মাল্টিপ্লেক্সের দামি পপকর্ন নিলেও তারাও বেশি দিন নিজেদের জায়গা রাখতে পারল না। এখন বিভিন্ন অ্যাপে নানারকম খাবার অর্ডার দিয়ে সেই খাবার পাশে নিয়ে বাড়িতে বসে সিনেমা দেখা আমাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, আর সেই অভ্যেস বিজ্ঞাপিত হয় কখনও খাবার ডেলিভারির অ্যাপে, কখনও বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের অ্যাপে।

এর পরে কী আসতে চলেছে? এর পরে কি সিনেমা দেখতে দেখতে নিজের ইচ্ছেমতো গল্প পরিবর্তন করতে পারব? ইচ্ছে হলে নায়কের প্লেট থেকে খাবার তুলে নিয়ে খেতে পারব? সেই দিন হয়তো দূরে নেই, এই ভার্চুয়াল রিয়েলিটির যুগে। সিনেমা হল তো হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত লোকগুলোর কী হবে? সেই লোকগুলো কি ওই সিনেমা হলের জায়গায় তৈরি হওয়া শপিং মল অথবা রেস্টুরেন্টে চাকরি পেয়েছে? আমরা সিনেমা হলের জগৎ শেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে সিনেমা দেখি, কিন্তু তা দেখতেও সিনেমা হলে যাই না।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।