কেন শমীকের হাতে গুরুদায়িত্ব অর্পণ করল বিজেপি?

WB BJP: যখন তৃণমূল থেকে আগত শুভেন্দু অধিকারীকেও কট্টর হিন্দুত্বের লাইন ধরতে দেখা গেছে, শমীকের বক্তব্যে উঠে এসেছে সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের কথা। তাঁর কথায়, দল যত কট্টরপন্থী অবস্থান নেবে সংখ্যালঘুরা ততই একজোট হয়ে তৃনমূলকে ভোট দেবে।

Sangita Ghorai
৩ মিনিট
কেন শমীকের হাতে গুরুদায়িত্ব অর্পণ করল বিজেপি?

বঙ্গ বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি হয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলাতে কেন বিজেপির পছন্দের পাত্র শমীক? তাঁর কোন বৈশিষ্ট্য নজর কেড়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদে আসীন হয়েছেন সাধারণত সংঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠরাই। সেই ক্রাইটেরিয়া শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে মিলে যায়। রাজনীতিতে আসার আগে ১৯৭৪ সাল থেকেই হাওড়ার মন্দিরতলা এলাকায় আরএসএস-এর শাখায় যাতায়াত শমীকের। পরে রাজনীতিতে যোগদান।

২০০২ সালে তথাগত রায় বিজেপি রাজ্য সভাপতি হন। সেই সময় থেকেই বঙ্গ বিজেপিতে উত্থান শমীকের। তখনই রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। রাহুল সিনহা সভাপতি হওয়ার পরেও ওই পদে আসীন ছিলেন শমীক ভট্টাচার্য। ২০০৬ সালে প্রথম বিজেপির টিকিটে শ্যামপুকুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ভোটে লড়েন, কিন্তু হেরে যান। এরপর দিলীপ ঘোষ রাজ্য সভাপতি হলে দলের প্রধান মুখপাত্র হন শমীক ভট্টাচার্য। সেই সময়েই বাংলায় বিজেপির উত্থানের শুরু। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দিলীপের নেতৃত্বে ১৮টি আসন জিতে হেডলাইনে ছেয়ে যায় গেরুয়া শিবির। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে যদিও আশানুরূপ ফল করতে পারেনি তারা। এরপর ২০২৪-এর নির্বাচনে কট্টর হিন্দুত্বের লাইন ধরে সারা দেশের পাশাপাশি ভরাডুবি হয় বাংলাতেও। ৬ আসন কমে গিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের ১২টি সংসদ এলাকায় জয়লাভ করে বিজেপি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বঙ্গ বিজেপির কাহিল অবস্থা বেআব্রু সংঘের রিপোর্টে, বড় বিপদ অপেক্ষা করছে?

সংঘ পরিবারের এই সমীক্ষা রিপোর্টের মূল বক্তব্যে বিজেপির শীর্ষ স্তর নিশ্চিতভাবেই মুষড়ে পড়েছে। ১৬ সাংসদ, ৬৯ বিধায়ক থাকা দলের এই হাল দেখে আশ্চর্যই হয়েছেন বিজেপির শীর্ষ স্তরের পোড় খাওয়া নেতৃত্ব।

অনেকের মতে দলে একসময় কোণঠাসা করা হয়েছিল শমীককে। কিন্তু বরাবরই নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি। তার পুরস্কারও পেয়েছেন। গত বছরই বিজেপি শমীককে রাজ্যসভার সাংসদ করেছে। আর বছর ঘুরতেই, বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। মূলত শহরের হিন্দু ভোট, বুদ্ধিজীবী মহলে ভাঙন ধরানো এবং বহুত্ববাদী সেকুলার সমাজে প্রবেশের উদ্দেশ্যে রাজ্য সভাপতি পদে শমীক ভট্টাচার্যকে বিজেপি বেছে নিয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলেরে একাংশ। কারণ বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার সংঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ হলেও, তিনি ছিলেন দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের ভূমিপুত্র। অন্যদিকে যার আমলে বঙ্গ বিজেপির উত্থান, সেই দিলীপ ঘোষও ছিলেন ঝাড়গ্রামের ভূমিপুত্র। বিজেপির বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর শিকড়ও পূর্ব মেদিনীপুরে।

এদিকে শমীকের উত্থান শহরের রাজনীতি থেকেই। কলকাতা ও কলকাতার বাইরেও দলে গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে তাঁর। শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালির মন বুঝতে শমীকের জন্য সহজ হবে। তাছাড়া গত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালেই দেখা যাবে যে, কলকাতায় ভোট কমেছে তৃণমূলের। এই নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বেশ চিন্তিত। অন্যদিকে শহর কলকাতায় তুলনামূলক ভালো ফল করেছে বিজেপি। ফলে শহুরে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের সুযোগ আরও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিটাকে কাজে লাগাতে চায় বিজেপি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলায় আবার শূন্য থেকে শুরু! শাহি পরিকল্পনায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বঙ্গ বিজেপির দাপুটে নেতারাই

বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের এই অংশের বক্তব্য, ম্যাক্রো বা মাইক্রো বৈঠক করার যে পরিকল্পনা শীর্ষ নেতারা গ্রহণ করেছেন, আখেরে তাতে কোনও লাভই হবে না।

যখন তৃণমূল থেকে আগত শুভেন্দু অধিকারীকেও কট্টর হিন্দুত্বের লাইন ধরতে দেখা গেছে, শমীকের বক্তব্যে উঠে এসেছে সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের কথা। তাঁর কথায়, দল যত কট্টরপন্থী অবস্থান নেবে সংখ্যালঘুরা ততই একজোট হয়ে তৃনমূলকে ভোট দেবে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু নির্যাতন, মুর্শিদাবাদ, মালদা, মহেশতলার ঘটনা নিয়ে হিন্দুত্বাবাদী প্রচারে শান দিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু রাজ্য সভাপতি হয়েই শমীক ভট্টাচার্য তাঁর প্রথম ভাষণে বলেছেন, বিজেপি দেশ ও বাংলার সংখ্যালঘুদের 'প্রকৃত উন্নয়ন'-এর জন্য সক্রিয়। বিজেপি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। সূত্রের খবর, শমীকের বক্তব্যে একমত বিজেপিও। শমীক সপাপতি হওয়ার পর বিজেপির প্রথম সাংগঠনিক বৈঠকে দলের কৌশল সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যেখানে সুনীল বনশল, মঙ্গল পাণ্ডে-র মতো কেন্দ্রীয় নেতারা শমীকের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন।

কিন্তু সংখ্যালঘু প্রশ্নে কেন সুর বদলাচ্ছে বিজেপি? সাম্প্রতিক কালীগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালেই পাওয়া যাবে সেই উত্তর। কালীগঞ্জ বিধানসভার ১১০টি হিন্দু-প্রধান বুথ থেকে বিজেপি লিড পেয়েছে। কিন্তু সংখ্যালঘু-প্রধান ১৫৪টি বুথে প্রায় এককাট্টা ভোট পেয়েছে তৃণমূল, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী। আর পদ্ম শিবিরের প্রাপ্ত ভোট সেখানে ৫০-এর নীচে। সংখ্যালঘুদের প্রতি বিজেপির নরম মনোভাব তাদের ভোটবাক্সে মুসলিম ভোট না আনলেও, সেই ভোট ভাগ করে তৃণমূলের নিশ্চিত ভোটব্যাঙ্কে ভাঙন ধরানো যাবে।

এছাড়া হিন্দি বলয়ের বিজেপির প্রচারের কট্টর সুর পছন্দ নয় বাঙালির। তাই বাংলার বহুত্ববাদী সেকুলার সমাজের মন জয় করতে বঙ্গ বিজেপির কাছে শমীক আদর্শ মুখ। রাজ্য সভাপতি হয়েই শমীক তাঁর বক্তব্যে বহুত্ববাদ-এর বার্তায় দিয়েছেন। তারই সঙ্গে বাজিয়ে দিয়েছেন নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে নামার ঘন্টা। রাজ্য সভাপতি হয়েই বাংলার মানুষের উদ্দেশ্যে শমীকের আহ্বান, "আগামী নির্বাচন বাংলা থেকে লগ্নি বেরিয়ে যাওয়া আটকানোর নির্বাচন। বাংলায় উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি করে রাজ্য থেকে নিরন্তর মেধা বহির্গমন রোখার নির্বাচন। হিন্দু বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার্থে এই নির্বাচন শেষ সুযোগ। সেই কথাটা মাথায় রেখেই মানুষ নির্বাচনে যাবেন। অন্য সবকিছু গৌণ।" এখন দেখার আগামী দিনে নির্বাচনী প্রচারে এসে কী বার্তা দেন নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ-রা।

লিখেছেন
Sangita Ghorai
Sangita Ghorai
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?